এত বড় বেহায়া মেয়েমানুষ, তবু মুক্তকেশী। আশা করেছিলেন, আজ হয়তো সকালবেলার রান্নার ভারটা মেজগিনী নেবে। কিন্তু সে আশা ফলবতী হল না।
সকালবেলায় দেখা গেল মেয়েটার গায়ে হাম বেরিয়েছে।
কান্নার হদিস পাওয়া গেল।
এবং রান্নার ভরসাও গেল।
একদিন আধাদিন নয়। এখন অনেক দিন।.
বলবার কিছু নেই। এ রোগ। কারো হাতধারা নয়!
কিছু নেই।
তবু বলাবলি হয়। সকলের মধ্যেই হয়।
কিন্তু সেই বলার মুখে এক প্রকাণ্ড পাথর পড়লো। বেলা বারোটা নাগাদ জণ্ড এসে হাজির হলো, একটা আধাবয়সী বিধবা বামনী সঙ্গে নিয়ে।
কই গো পিসি, এই নাও তোমার রাধুনী। কি করতে-টারতে হবে দেখিয়ে শুনিয়ে দাও। মা বলেছে কাজকর্ম ভাল হবে।
মুক্তকেশী অবাক গলায় বলেন, রাধুনী আনতে হুকুম করলো কে তোকে?
জগু মেয়েলী ভঙ্গীতে বলে ওঠে, শোন কথা! তোমার নিজের ব্যাটাই তো বলে এলো গো! মেজ পুত্তুর! বললো, মেজবৌমার খুকীর হাম বেরিয়েছে, ওদিকে বড়বৌমার খেটে খেটে জানি নিকলোচ্ছে, সংসারের অচল অবস্থা, রান্নাবান্নার জন্যে একটি বামুনের মেয়ে চাই। তোমার দেখি সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা কার পিতা!
মুক্তকেশী একবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে মেজবৌয়ের ঘরের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলেন, বুঝেছি! কামরূপ কামিখ্যের ভেড়াটা ছাড়া এ কাজ আর কার হবে! তবে এখনো মারি নি জগা, আমার জীবদ্দশায় রাধুনী ঢুকতে দেব না বাড়িতে!
জগা বীরদৰ্পে বলে, দেবে না? বললেই হল? তুমি ওদের আঁশ-হাঁড়ি নাড়বে?
আমি? আমার মরণ নেই?
তবে?
যারা করবার তারাই করবে! লোকের দরকার নেই জগা! মিথ্যে বামুনের মেয়েকে আশা দিয়ে নিয়ে এসে নিরাশা করা!
জগু যে জগু, সেও এ পরিস্থিতিতে থাতমত খায়।
অনুরোধ মাত্র লোক জুটিয়ে আনার মহিমায় উৎফুল্ল হচ্ছিল, কিন্তু এ কী?
বোকার মত বলে, তাহলে বলছো দরকার নেই?
মুক্তকেশী সেই কথাই বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বলা হয় না। সহসা সেই ভরদুপুরে শুকনো আকাশ থেকে বজ্রাপাত হয়।
সেই বজ্রে ধ্বংস হয়ে যায় সভ্যতা, ভব্যতা, সামাজিক নিয়মনীতি।
আর ধ্বংস হয়ে যায় মুক্তকেশীর পদমর্যাদার মহিমা।
হঠাৎ দরজার ওদিক থেকে সুবর্ণর পরিষ্কার গলার দ্বিধাহীন ভাষা উচ্চারিত হয়, আছে দরকার! মা, ভাসুর ঠাকুরকে বলে দিন যে রেখে যান ওঁকে!
মুক্তকেশী স্তম্ভিত বিস্ময়ে বলেন, আছে দরকার! রেখে যাবে! আমি মানা করছি, তার ওপর তুমি এলে হুকুম চালাতে!
স্তম্ভিত বিস্ময়ে বলেন, আছে দরকার! রেখে যাবে! আমি মানা করছি, তার ওপর তুমি এলে হুকুম চালাতে!
হুকুম চালাচালির কথা নয় মা! অবুঝের মতন রাগ করলে তো চলবে না। দিদি একা আর কত দিক দেখবেন? বামুনের মেয়ের কথা আমিই বলে পাঠিয়েছি।… বামুনদি, তুমি এসো তো এদিকে-
জীত রহো। চেঁচিয়ে ওঠে মুখ্যু জগু, এই তো চাই! আমার পিসিটির এই রকম শিক্ষারই দরকার ছিল।
মুক্তকেশীর সংসারে যুগ-প্ৰলয় ঘটে।
মুক্তকেশীর কলমের উপর নতুন কলম চলে।… মুক্তকেশীর সংসারে মাইনে করা রাঁধুনী ঢোকে! এ যেন অনিবাৰ্য অমোঘের একটা চিহ্ন!
তা বোধ করি এই প্রথম বিন্দু আর আর গিরিবালা সুবৰ্ণলতার তেজ আসপর্দার সমালোচনা না করে তার উপর প্রসন্ন হয়।
বাঁচা গেল বাবা!
শুধু উমাশশীরই মনে হয় সে যেন সর্বহারা হয়ে গেছে!
দুগ্ধ থেকে ছাত হলে কিসের দামে বিকাবে উমাশশী। মূলহাৱা এই দিনগুলোকে নিয়ে করবে কি?
যখন তখন চোখে জল আসে তার।
আর বামুনব্দির পায়ে পায়ে ঘোরে তার সাহায্যার্থে।
তবু তো বোঝা যাবে, কিছুটা প্রয়োজন আছে উমাশশীর!
সুবৰ্ণলতার মত সে নিজের উপস্থিতির জোরেই নিজেকে মূল্যবান ভাবতে পারে না।
১.২৫ কালো শুঁটকো পেটে-পীলে ছেলেটা
কালো শুঁটকো পেটে-পীলে ছেলেটার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে শ্যামাসুন্দরী বলেন, ওকে বাড়িতে জায়গা দিতে হবে? কী করবো। ওকে নিয়ে?
জগু তার বাইরের বাবু সাজ আধময়লা। ফতুয়াটা খুলে উঠোনের তারে ছড়িয়ে দিতে দিতে অগ্রাহ্যের গলায় বলে, করবে আবার কি, সময়ে দুটো ভাত-জল দেবে, খানিক পাঁচন সেদ্ধ করে দেবে, আর কি! মাথায় করে নাচতে বলি নি।
শ্যামাসুন্দরী ক্রুদ্ধ গলায় বলেন, মাথায় করে নাচার আবার হাত-পা কি আছে? সময়ে দুটো ভাত-জল দেব, পীলে পেটের জন্যে পাঁচন সেদ্ধ করে দেব, কেন কি জন্যে?
কি জন্যে, সেকথা তো রাজকন্যেকে বলা হলো আগেই। মা নেই, দিদিমা পুষতো, সেটাও পটল তুলেছে, কে দুটো ভাত দেয় তার ঠিক নেই।
ওঃ, আমাকেই তাহলে ওর দিদিমা হতে হবে? শ্যামাসুন্দরী মানবিকতার ধার ধারেন না, বলেন, তুই আর আমার সঙ্গে জ্ঞাতশত্ত্বরতা করিস না জগা, চিরটা কাল জ্বলে পুড়ে মরলাম। জগতে অমন ঢের মাতৃহারা আছে, সবাইকে দয়া করতে পারবি তুই?
সবাইকে পারবার বায়না নেবে জগা, এমন মুখ্যু বামুন নয় মা, জগু দৃপ্তম্বরে বলে, একটার কথাই হচ্ছে।
না হবে না—, শ্যামাসুন্দরী আরো দৃপ্ত হন, বলে আমার কে ভাত-জল করে তার ঠিক নেই, হিতৈষী ছেলে এলেন আমার ঘাড়ে একটা রুগী চাপাতে। রাগ বাড়াস নে জগা, যেখানকার নিধি, সেখানে রেখে আয়।
জগা অবশ্য মায়ের এই শাসনবাক্যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না, বলে, রেখে আসবার জন্যে নিয়ে এলাম যে! এই ছোঁড়া, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস যে! নতুন দিদিমাকে পেন্নাম করা! দেখছিসকেমন ভগবতীর মতন চেহারা!…এই এই খবরদার, পায়ে হাত নয়, দূরে থেকে আলগোছে। তুই বেটা এমন কি পুণ্যি করেছিস যে আমার মায়ের চরণস্পর্শ করবি! পেন্নাম করে বোস ওখানে।… মা. ছোঁড়াকে দুটো জলপানি দাও দিকি, খিদেয়-তেষ্টায়। টা-টা করছে। দেখো আবার দুঃখীর ছেলে বলে খানিক আকোচ-খাকোচ ধরে দিও না! দেখছো তো পেটের অবস্থা? এক-আধটা রসগোল্লাফোল্লা আছে। ঘরে?
