নিতাই এসেই যে পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল, তাতে তার কথা কওয়ার সাহস ছিল না, কিন্তু এখন চুপ করে থাকাও শক্ত। তাই সাবধানে নিজের নাম বলে।
নিতাই।
ও কি নাম বলার ছিরি রে নিতাই, জগু সদুপদেশ দেয়, ভদ্রলোকের মত বলবি, শ্ৰীনিতাই দাস। নেহাৎ চাকর-বাকরের মত থাকলে তো চলবে না! ভদর লোকের মতন থাকতে হবে।
শ্যামাসুন্দরী বোঝেন, এ হচ্ছে বিকে মেরে বৌকে শিক্ষা দেওয়া! পাছে তিনি ছেলেটাকে চাকরের পর্যায়ে ফেলেন, তাই জগার এই শাসনবাণী। তা তিনিও সোজা মেয়ে নন, তাই কড়া গলায় বলেন, চাকরের মত হবে না কি রাজার মত হবে? এই নিতাই, তোর বাপ কি করে রে?
নিতাইয়ের আগেই জণ্ড তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, বাপ ব্যাটা তো ছুতোর! কাঠ ঘষে আর কি করে? যাক গে, ওসব কথা মনে নিতে হবে না। তুই নিজে মানুষ হবি, বুঝলি? ঘর-সংসার দেখিয়ে দিই গে।
এই সময় বহুকাল পরে মুক্তকেশীর আবির্ভাব ঘটে এবং মুহূর্তেই ছেলেটার দিকে চোখ পড়ে তাঁর। সন্দেহের গলায় বলেন, এ ছোঁড়া কে? চাকর রাখলি বুঝি!
জগু আভূমি সেলাম করে বলে, কী যে বল পিসি! জগা রাখবে চাকর! ভারী তালেবর তোমার ভাইপো! কেষ্টর জীব, কেষ্ট যখন যেখানে রাখেন, থাকে।
শ্যামাসুন্দরী বিদ্রূপের গলায় বলেন, তা বটে! অন্তত যে কদিন পোরের ভাত আর রসগোল্লা ভিন্ন সইবে না, সে কদিন এখানেই থাকবে।
মুক্তকেশী খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে ব্যাপারটা জেনে নেন। মুক্তকেশী গালে হাত দেন। তারপর বলেন, জাতটা কি?
এবার জগু মারমুখী হয়।
জাত নিয়ে কী হবে পিসি? জাত নিয়ে কি হবে? নাতজামাই করবে?
শোনো কথা! মুক্তকেশী বলেন, এই তোকে আর আমার মেজবৌমাকে এক বিধাতায় গড়েছে দেখছি! কথা কয়েছ কি অগ্নিমূর্তিা! ঘরে-দোরে ঘুরে বেড়াবে, জাত দেখবি না?
না দেখবো না। ঘরে-দোরে মশা মাছি পিপড়েটাও বেড়ায়। নর্দমা থেকে উঠে এসে বেড়ায়। তখন তো তোমাদের জাতের বিচার দেখি না?… এই নিতাই, চল আমরা অন্যত্র যাই। দুটো বুড়ীতে মিলে কূটকচালে গপূপো করুক। ওঁরা আবার ধৰ্ম্মকথা কইতে আসেন! মানুষ কেষ্টর জীব! অতিথি! নারায়ণ! যত ফব্ধিকারি কথা! মুখের ওপর যে অপমানটা তোমরা ওই অভাগা নারায়ণটাকে করলে বসে বসে, নেহাৎ নারায়ণ বলেই সহ্য করলো! তই হোক বেটা ছেলে! এ লক্ষ্মীঠাকরুণ হলে মনের ঘেন্নায় পাতাল প্ৰবেশ করতো! মানুষের ছানা দুটো খাবে, সেই নিয়ে খোঁচা দেওয়া!
জণ্ড গট গট করে বেরিয়ে যায় নিতাইয়ের হাত ধরে।
মুক্তকেশী পিছন থেকে সাবধান করেন, কাজটা কিন্তু ভাল করলি না জগু! কে বলতে পারে ছোঁড়া স্বদেশী কিনা! শুনি পুলিসের ভয়ে নাকি আমন কত ছোঁড়া ন্যাকা। সেজে-
কথা থামান।
জগুর কানে প্ৰবেশ করাবার আশা আর থাকে না।
শ্যামাসুন্দরীর কানে যেটুকু গেছে তাতেই যথেষ্ট! তাচ্ছিল্যাভরে বলেন, তোমার ভাইপোর জন্যে ভেবো না ঠাকুরঝি! পুলিসই ওর ভয়ে দুগগা নাম জপবে!… এই বুড়ো বয়সে একটা কচি খোকা এনে আমার গলায় চাপালো, আপত্তি দেখিয়েছি তাতে রাগ দেখছো তো? যাক গে, তোমার খবর কি? অনেকদিন তো আর আসো না!
মুক্তকেশী বলেন, আর আসবো কি! কোমরটা যে দিন দিন শতুরতাই সাধছে। বেশী হাঁটতে পারছি না। আর। ওই যো-সো করে গঙ্গাচ্ছানটুকু বজায় রাখা! এসেছি একটা খবর দিতে। মেয়ে দুটোর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি, তাই তোমায় বলতে আসা! একদিন যাবে, ছেলেদের সঙ্গে একত্র বসে পরামর্শ হবে!
শ্যামাসুন্দরী বোঝেন কোন মেয়ে দুটো।
মল্লিকা আর চাপা, আর কে!
বলেন, তা বেশ! কোথায় সম্বন্ধ হলো?
বিরাজের শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কে। ঘর-বর ভালো, দুই জ্যাঠতুতো খুড়তুতো ভাই—
শ্যামাসুন্দরী সকৌতুকে বলেন, তা তোমার মেজবৌ তো ছোটকালে বিয়ে পছন্দ করে না, রাজী হয়েছে?
ছোটকালে? মুক্তকেশী একটু চাপা ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন। ছোট আবার কোথায় বৌ? তোমার কাছে তো আর কিছু আছাপা নেই? এগারো বলে চালাচ্ছি, তেরো ভরে গেল না? তা মেজবৌমা আমার মুখে চুনকালি নেপেছে! বিরাজের সেই সম্পৰ্কে ননন্দ কুটুম্ব-সূত্র ধরে এসেছিল। কনে দেখতে। তুই বৌমানুষ, চুপ করে থাক, বড়বৌমা তো মুখে রা কাড়ে নি। মেজবৌমা তাদের সঙ্গে গলাগলিয়ে গপপো করে করে বলে বসেছিল, ওমা, এগারো আবার কি? সে তো দু বছর আগে ছিল! দুজনই ওরা তেরো পুরে গেছে! মা বোধ হয়। ভুলে গেছেন। নাতি-নাতনীর সংখ্যা তো কম নয়! ছেলের ঘর মেয়ের ঘর মিলিয়ে কোন না পঞ্চাশ!… সেই নিয়ে কি হাসাহাসি! বোঝো আমার বৌয়ের গুণ!
শ্যামাসুন্দরী বলেন, একটু সত্যিবাদী আছে কিনা—
ওগো সত্যিবাদী আমরাও। তবে অত সত্যিবাদী হলে তো আর সংসার চালানো যায় না! সব দিক বজায় রাখবে তুমি কিসের জোরে? মানমর্যাদা রক্ষে রাখবে কিসের জোরে! মিথ্যেই ঘরের আচ্ছাদন, মিথ্যে ই চালের খুঁটি! সংসার তো করলে না কখনো—
শ্যামাসুন্দরীর এই মুক্ত জীবনের প্রতি মুক্তকেশীর বরাবরের ঈর্ষা!
শ্যামাসুন্দরী বোঝেন, এখন প্রসঙ্গ পরিবর্তনের প্রয়োজন। বলেন, বোসো ঠাকুরবি, ডাব কেটে আনি। তা বিয়েটা কবে নাগাদ হবে?
হবে, এই শ্রাবণের মধ্যেই দিতে হবে। নচেৎ তিন মাস হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। যেও তা হলে।
যাক। তুমি বোসো। ডাব কাটতে চলে যান শ্যামা।
১.২৬ ভাগ্নেদের মেয়ের বিয়ের পরামর্শ
কিন্তু ভাগ্নেদের মেয়ের বিয়ের পরামর্শ দিতে এসে যে এমন দিশেহারা দৃশ্যের সামনে পড়তে হবে, এমন ধারণা কি ছিল শ্যামাসুন্দরীর?
