এও এক মনস্তত্ব।
নচেৎ টাকার সচ্ছলতা যদি কেউ তাকে দেয়, সে তো মেজছেলে। তবু সেজবৌকে ভয় করেন, তোয়াজ করেন।
ছোঁয়াচ লাগার মত উমাশশীও করে। তাই ভয়ে ভয়ে বলে, মেজবৌয়ের মেয়ে আজ যা কাণ্ড করছে, ও আর পেরেছে!
না পারেন, যে পারে করুক! আমি বাবা উনুনের ছায়াও মাড়াচ্ছি না। আমার পালার দিনে কি কেউ হাঁড়ি ধরতে আসবে? বলে দুম দুম করে চলে যায় গিরিবালা।
সুবৰ্ণ নামে না।
খবরটা দোতলায় ছড়িয়ে পড়ে। অসন্তোষ আর সমালোচনার কলগুঞ্জন প্ৰবল হয়ে ওঠে। এবং সব ছাপিয়ে প্রবলতর হয়ে ওঠে কান্না।
কান্না, কান্না, কুৎসিত কান্না!
ওই আর্তনাদ যেন এই অন্ধকূপ থেকে আকাশে উঠতে চায়।
বাড়িতে কি হচ্ছে কি? তীব্ৰ চীৎকার শোনা যায় প্রভাসচন্দ্রের। তাসের আড্ডা থেকে উঠে এসেছে লজায় আর বিরক্তিতে। মেজাজ। তাই সপ্তমে।
বুলি, কাঁদছে কোনটা মেজবৌয়ের শেষ নম্বরেরটা না? মেজবৌ বাড়ি নেই নাকি?
বাড়ি!
থাকবেন না। আবার কেন?
বাড়ি ছেড়ে আবার যাবেন কোথায়?
মেয়ে কোলে নিয়েই বসে আছেন।
কোলে নিয়ে বসে আছেন? প্রভাস বিরক্তির সব বিষটা উপুড় করে দিয়ে চলে যায়, তবু গলা বন্ধ করতে পারছে না? মেয়ের গলায় এমন শাখের বান্দ্যি? মুখে একমুঠো নুন দিতে বল, বন্ধ হয়ে যাবে!
চলে যায়।
ঈশ্বরের দয়া, সুবৰ্ণলতার কানে পৌঁছয় না। এই হিত পরামর্শটুকু। সুবৰ্ণলতার কানের পর্দা কান্নার শব্দে ফেটে যাচ্ছে তখন।
ওদিকে রান্নাঘরে ঝড় উঠেছে।
উমাশশীই হাঁড়ি চড়াবার ভার নিচ্ছিল, প্রবল প্রতিবাদ উঠেছে। সেজবৌ আর ছোটবৌয়ের পক্ষ থেকে। সুবৰ্ণকেই বা এত আস্কারা দেবে কেন উমাশশী? যার পাঁচ-সাতটা ছেলেমেয়ে তার ঘরে তো নিত্যি রোগ লেগে থাকবেই, তাই বলে ওই ছুতোয় সে দিব্যি পার পেয়ে যাবে?
কই বলুক দিকি কেউ, সেজবৌ ছোটবৌ কোনোদিন পালা ফাঁকি দিয়েছে! তাদের নিজেদের ঘর হেজে যাক মজে যাক, তবু সংসারের কাজ বাজিয়ে দিয়ে চলে গেছে। মেজগিনীই বা কী এমন সাপের পাঁচ পা দেখেছে যে ইচ্ছামত চলবে?
উমাশশী যদি এইভাবে একচোখোমি করে, তারাও ছেলের সর্দিটি হলেই কাজে কামাই দেবে, এই হচ্ছে শেষ কথা!
উমা ভয়ে ভয়ে হাঁড়িখানাকে তাক থেকে নামিয়ে, চালের গামলা হাতে নিয়ে কিংকৰ্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। জোর করে কর্তব্য করবার সাহসও তার নেই।
একথা বলবার সাহস নেই, তোমাদের তো কর্তে হচ্ছে না বাপু, তবে অত গায়ের জ্বালা কেন?
কিন্তু কেন যে গায়ের জ্বালা, সে কথার উত্তর কি নিজেরাই জানে ওর?
যেখানে ছোট কথা ছাড়া আর কোনো কথার চাষ হয় না, সেখানে বড় কথা, মহৎ কথা। তারা পাবে কোথায়? ছোট কথাই জ্বালার জনক।
মেয়ে নিয়ে ঘরে বসে সোহাগ হচ্ছে? তোমার না। আজ রান্নার পালা?
ঘরের মধ্যে যেন হাতুড়ির ঘায়ের মত একটা হুমকি এসে পড়ে।
নিরবচ্ছিন্ন ক্ৰন্দনে শক্ত হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে চুপ করাবার বৃথা চেষ্টায় নিজেই কেঁদো-কাঁদো। হচ্ছিল সুবর্ণ, এই শব্দে চমকে পিছন ফিরে তাকায়। তার পরই অগ্রাহ্যাভরে মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে বলে, পালা বজায় রাখতে যাবার মত অবস্থা দেখছো যে!
এইমাত্র নীচে বহুবিধ বিরুদ্ধ সমালোচনা শুনে এসে প্ৰবোধচন্দ্রের মেজাজ খাপ্পা, তাই ক্রুদ্ধস্বরে বলে, তোমার অবস্থা অপারে শুনবে কেন শুনি? ফেলে রেখে দিয়ে চলে যাও। মেয়ে নিয়ে এত আদিখ্যেতা!
সুবৰ্ণলতা তেমনি আগ্রহের গলায় বলে, কার কাছে ফেলে যাবো শুনি? তুমি সামলাবে?
আমি? আমি সামলাতে বসবো তোমার ওই গুণধারী মেয়েকে? আমায় তো ভূতে পায় নি?
আমার মেয়ে! একা আমার মেয়ে! সামলাতে ভূতে পায় তোমায়? বলতে লজ্জা করল না? উগ্ৰমূর্তি সুবৰ্ণলতা উঠে বসে, আর যদি এ ধরনের কথা বল, মান-মর্যাদা রাখবো না বলে দিচ্ছি!
প্ৰবোধ এ মূর্তিকে ভয় পায়।
তত্ৰাচ ভয় পাওয়াটা প্ৰকাশ করে না। বলে, ওঃ, মান-মৰ্যাদা রেখে তো উল্টে যোচ্ছ! এখন যাও নিজের মান রাখো তো, পালাটা সেরে দিয়ে এসো!
আমার মান এমন ঠনকো নয় যে তাও বজায় রাখতে পিশাচী হতে হবে!
মেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে সুবৰ্ণ।
ভঙ্গীতে অবহেলা অবজ্ঞা।
প্ৰবোধচন্দ্রের গায়ের রক্ত ফুটে ওঠে, তীব্ৰস্বরে বলে, শুলে যে? ইয়ার্কি পেয়েছ নাকি? রোজ রোজ তোমার ভাগের কাজই বা অন্যে করে দেবে কেন শুনি? যাও উঠে যাও। একটু কাঁদলে মেয়ে মরে যাবে না।
সুবৰ্ণলতা তথাপি ওঠে না।
শুয়ে শুয়েই বলে, একটা রাতে না খেলেও কেউ মরে যাবে না।
না থেয়ে!
এ কি সাংঘাতিক শব্দ!
তার মানে উঠবে না! শক্ত পাথর মেয়েমানুষ!
অতএব অন্য সুর ধরতে হয় প্রবোধকে। নরম সুর।
পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে, গায়ে পেতে নেবেই বা কেন? এতে তোমার লজ্জা হয় না?
সুবৰ্ণ আবার উঠে বসে।
উঠে দৃঢ়কণ্ঠে বলে, না হয় না! আমার লজ্জা-সরমের জ্ঞানটা তোমাদের সঙ্গে মেলে না। আমার কাছে তার চাইতে অনেক বেশি লজ্জার, নিন্দুকের মুখের দুটো কথা শোনার ভয়ে রুগ্ন সন্তানের দুর্দশা করা! যারা আমন করে তা মা নয়, শয়তান, মা নয়, পিশাচী।
তারা শয়তান? তারা পিশাচী!
নিশ্চয়! শয়তান, স্বার্থপর, মহাপাতকী!
তোমার সবই সৃষ্টিছাড়া!
হ্যাঁ, আমার সবই সৃষ্টিছাড়া। কী করবে? ফাঁসি দেবে?
আমি বলছি তুমি যাও, মেয়ে আমি দেখছি—
ন!
না, সুবৰ্ণ সেদিন রাঁধতে নামে নি।
উমাশশীই বেধেছিল শেষ পর্যন্ত।
আর আশ্চৰ্য, বাড়িসুদ্ধ সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে নেমে এসে অম্লান বদনে সেই ভাত খেয়ে গিয়েছিল সুবর্ণ! ডাকতে পর্যন্ত হয় নি, হঠাৎ এক সময় রান্নাঘরে এসে জল-কাদার উপর মাটিতেই ধপাস করে বসে পড়ে বলেছে, এইবেলা আমায় চারটি দিয়ে দাও তো দিদি। অনেক কষ্টে ঘুম পাডিয়েছি।
