হ্যাঁ গো। বলছেন এ গান সবাইয়ের শেখা দরকার। এর পরে বন্দেমাতরং শেখাবেন।
খবরদার! প্রভাস হঠাৎ গর্জন করে ওঠে, ভেবেছেন কি তোদের মেজখুড়ি? হাতে দড়ি পরাতে চান আমাদের? বলে দে, চলবে না ওসব। এ ভিটেয় বসে এত বাড়াবাড়ি চলবে না।
ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভিতর থেকে জবাব দেয়, মেজখুড়িমা বলছেন, বাড়িসুদ্ধ সকলের ওপর আপনার শাসনই চলবে? আর কারুর কোনো ইচ্ছে চলবে না?
ছেলেটা কথা শিখেছে তোতাপাখীর মত। কথার গুরুত্ব কি, ওজন কি, তা শেখে নি, তাই বলতে পারে এত কথা। আর সব কটা আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকে। সেজকাকার মুখের ওপর কথা! এ কি ভয়ঙ্কর অঘটন!
তা সেজকাকা নিজেও সেই বিস্ময়েই প্রথমটা স্তব্ধ হয়ে যান। তার মুখের ওপর কথা! অবশ্য স্তব্ধতাটা মুহূর্তের। পরীক্ষণেই মাটিতে পা ঠুকে চীৎকার করে ওঠেন। তিনি, বটে! বাড়িতে তা হলে এখন এইসব কুশিক্ষার চাষ চলছে? তা নিজের ছেলেদের মাথা খাচ্ছেন খান, পরের ছেলের মাথাটি চর্বণ করা হচ্ছে কেন?… খোকা, উঠে আয় বলছি! চলে আর ও ঘর থেকে. আর বলে আয় তোর মেজখুড়িকে, না, চলবে না। যার না পোষাবে, সে যেন পথ দেখে।
এরপরই বজ্রপতন হয়।
এবার আর খোকা নয় স্বয়ং মেজবৌ-ই দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। খোকাকে মাধ্যম মাত্র করে বলে, খোকা, জিজ্ঞেস কর তোর সেজকাকাকে, উনিই কি এ বাড়ির কর্তা? ইচ্ছেমত কাউকে রাখতে পারেন, কাউকে তাড়াতে পারেন? তা যদি হয়, বলুন পষ্ট করে, কালই পথ দেখবো। কিছু না জোটে, গাছতলা তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না!
তা অঘটনও ঘটে পৃথিবীতে।
নইলে এই দুঃসহ স্পর্ধা প্রকাশের পরও সুবৰ্ণ সোজা সতেজে দাঁড়িয়ে থাকতে পায়? আকাশের বাজ তো পড়েই না তার মাথায়, স্বয়ং সেজকর্তাও তেড়ে গিয়ে মেরে বসেন না। বরং হঠাৎ যেন লোকটা ভাষা হারিয়ে মূক হয়ে যায়।
তারপর কথা যখন কয়, যেন শিথিল সরল ভঙ্গীতে। চলে যেতে যেতে বলে, আমারই ঘাট হয়েছে, তাই শাসন করতে এসেছিলাম। পাশের ঘরে একটা কুটুমের ছেলে বসে, লজ্জা হল, তাই আস্পর্দা প্রকাশ করতে এসেছিলাম। যাক, তোদের খুড়ি চৈতন্য করিয়ে দিয়েছে। রাতদিন বই কাগজ নিয়ে পড়ে থাকা বিদূষী মেয়েমানুষ, হবেই তো এসব! তবে বলে দে খোকা তোর খুড়ীকে, এ বাড়িতে তার ভাগ রয়েছে বলেই যে যা খুশি করতে পারেন তা হয়, তা হলে তো বোমাও করতে পারেন। তিনি।
চলে যায় প্রভাস, তীব্র বিদ্বেষে মুখ কালি করে।
বলা বাহুল্য, পদ্য মুখস্থর পাঠশালা আর বসানো যায় না, সুর কেটে যায়।
কিন্তু শুধুই কি সেদিন?
নাকি শুধু পদ্যর ক্লাসের সুর?
কান্না! কান্না!
কটু কুৎসিত কদৰ্য কান্না!
শুনলে করুণা আসে না, মায়া আসে না, আসে বিতৃষ্ণা।
গিরিবালা পোস্ত বাটতে বাটতে বলে, মেজদির এই শেষ নম্বরেরটি যা হয়েছে—উঃ! গলা বটে একখানি। মানুষের ছা কাঁদছে। কিন্তু জন্তু জানোয়ার চেঁচাচ্ছে—বোঝবার জো নেই।
জন্মাবধি রুগ্ন যে–, বলে উমাশশী।
তুমি আর জগৎসুদ্ধ সবাইয়ের দোষ ঢেকে বেড়িও না দিদি, গিরিবালা ঠেস দিয়ে বলে, কে যে তোমায় কি দিয়ে রাজা করে দিচ্ছে, তুমিই জানো!
দোষ ঢাকা আবার কি! উমা অপ্ৰতিভ হয়, রুগ্ন তাই বলছি।
গিরিবালা কাজ সেরে শিল তুলে রাখতে রাখতে বলে, আমার এই হয়ে গেল বাবা, চললাম এবার। উনুন দুটো তো জ্বলে-পুড়ে খাকি হয়ে গেল, যার পালা তার হঁশ নেই!
উমার ধারণা ছিল এবেলার পালাটা আজ ছোটবৌয়ের, তাই বলে, কোথায় ছোটবৌ?
ছোটবৌ? কেন ছোটবোঁ কি করবে? পালা তো মেজদির!
ওমা সে কি! আজি বুধবার না?
বুধবারই! কিন্তু গেল হস্তায় ছোটবৌয়ের বাপের বাড়ি যাবার গোলমালে পালা বদলে গেল না?
উমাশশী বড়ো, উমাশশী নির্বোধ, উমাশশী গরীবের মেয়ে। আবার উমাশশী কিছুটা প্ৰশংসার কাঙালীও। তাই উমাশশী একাই সংসারের অর্ধেক কাজ করে।
প্রতিদিন সকালে এই রাবণের গোষ্ঠীর রান্না সে একাই চালায়। আর তিনজনে পালা করে বিকেলে।
সুবৰ্ণ অনেকবার প্রস্তাব করেছে একটা রাধুনী রাখবার। মাইনে সে একলাই দেবে। একটা ভদ্র বামুনের ঘরের আধাবয়সী বিধবা খুঁজে না মেলে তা নয়। কি উমাশশী শাশুড়ীর সুয়ো হতে সে প্রস্তাব নাকচ করেছে। বলেছে, ওমা, আমরা হাত পা নিয়ে বসে থাকবো, আর বামনীতে রাধবে, ছিঃ!
সুবৰ্ণ বলেছে, তবে মরো রোধে রোধে! আমার দ্বারা তো একদিনও সকালে সম্ভব নয়। ওদের লেখাপড়া তাহলে শিকেয় উঠবে।
উন্নবিপুলত গ্রেহে বলেছে, ওমা, আমি থাকতে সকালবেলা আবার তোরা কেন? সকালবেলা তো আমিই–
জানি, তুমিই চালাচ্ছে! হাড়-মাস পিষছো! কিন্তু সেটা বারো মাস দেখতেও ভাল লাগে না। তোমার মেজদ্যাওর তো করছে বেশি বেশি রোজগার, দেবে অখন মাইনেটা—
উমাশশীই না না করেছে।
অতএব সুবর্ণর আর বিবেকের দংশন নেই। কিন্তু কে বলবে কেন উমাশশীর এমন বোকামী! কেন সে অবিরত সংসারে সকলের মন রাখার চেষ্টা করে মরে? মন কি সত্যিই কারো রাখতে পেরেছে?
মন রেখে রেখে কি কখনো কারো মন রাখা যায়?
যায় না।
শুধু সেই মনের দাবি আর প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেওয়া হয় মাত্র। আর সেই ব্যর্থ চেষ্টা অবিরতই তাকে অবজ্ঞেয় করে তোলে।
উমাশশী বৃথা চেষ্টার বোঝা চাপিয়ে চাপিয়ে জীবনটাকে শুধু ভারাক্রান্তই করে তুলেছে, মন কারো রাখতে পারে নি। মুক্তকেশী সর্বদাই তার উপর ব্যাজার! মুক্তকেশী তোয়াজ করেন উকিল ছেলের বৌকে!
কেন করেন সেটাই আশ্চর্য!
