কোঁচার তলা থেকে বার করে ছেঁড়া খবরের কাগজ আর শালপাতায় মোড়া তরকারির ঝোলমাখা একটা চেণ্টে যাওয়া হাঁসের ডিম, আর একখানা ভেঙে টুকরো হওয়া ইলিশ মাছ!
সুবৰ্ণ রাগ করতে ভুলে যায়।
সুবৰ্ণ স্তম্ভিত গলায় বলে, এর মানে?
আরে বাবা, মানে পরে শুনো, করবো গল্প। আগে খেয়ে তো নাও। ছেলে।পুলে কে হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়বে। জিনিস দুটো তোমার প্রিয় বলেই অনেক কৌশলে সরিয়ে নিয়ে এলাম।
আমার প্ৰিয় বলে! আমার প্ৰিয়া!
সুবৰ্ণ সেই হাসির মধ্যে থেকে যেন স্বপ্নাচ্ছিনের গলায় বলে, কে বললো জিনিস দুটো আমার প্রিয়?
কে বললে?
তা রহস্যের হাসি প্ৰবোধের মুখেও ফুটে ওঠে। সেও বেশ একটু কৌতুকের গলায় বলে, না বললে বোঝা যায় না? আমিই না হয় তোমার দু-চক্ষের বিষ, তুমি তো আমার— ধর ধর, গোল আমার কোঁচা ফেচা! তোলে বোলে একসা!
সুবৰ্ণ কিন্তু স্বামীর এই বিব্রত ভাবকে উপেক্ষা করেই বসে থাকে, এবং স্থির গলায় বলে, কিন্তু বাহাদুরি নেওয়াটা আর হল না তোমার! দুটোর একটাও খাই না। আমি।
খাও না তুমি! দুটোর একটাও? প্ৰবোধের গলায় ক্রুদ্ধ অবিশ্বাসের সুর ফুটে ওঠে।
বাস্তবিকই অনেক কসরত করে আনতে হয়েছে তাকে অকিঞ্চিৎকর জিনিস দুটো। এনেছে নেহাতই প্ৰাণের টানে। সাধ জেগেছিল, এনেই সুবর্ণর মুখে পুরে দিয়ে হাসোহাসি করে পূর্ব অপরাধের পাযাণভারটাকে সরিয়ে ফেলবে। কিন্তু মেয়েমানুষটি নিজেই যেন কাঠ-পাথর। এগিয়ে এলো না, দেখলো না, আবার মিছে করে বলছে খাই না!… আর কিছু নয়, পোষা রাগা! আচমকা নিয়ে চলে আসার রাগটি পুযে রেখেছেন! তাই স্বামীর এই বেপোট অবস্থা দেখেও মমতা নেই একটু।
তাই তারও গলায় ভালবাসার সুর মুছে গিয়ে ক্রুদ্ধ সুর ফোটে।
খাও না? ডাহা একটা মিথ্যে কথা বললে?
সুবৰ্ণ খুব শান্ত গলায় বলে, মিথ্যে কথা বলতে যাব কেন শুধু শুধু? আর মিথ্যে কথা বলা আমার স্বভাব কি না ভালই জানো তুমি। ইলিশ মাছে আমার কাটার ভয় সেকথা বাড়ির সবাই জানে।
ওঃ, সবাই জানে! শুধু আমি শালা–তা এটাতে তো আর কাটা নেই, এটা কি দোষ করলো?
ওতে আমার কেমন গন্ধ লাগে। তাছাড়া— যে জিনিস রান্নাঘরে ঢোকে না, তা খেতে আমার রুচি হয় না।
তথাপি প্ৰবোধের এসব কথা বিশ্বাস হয় না। নিত্য এসব এত উৎসাহ করে আনায় সুবৰ্ণ অমনি নাকি?
বলেও বসে সেকথা।
রুচি নেই বললেই হল! বাঙালিকে আর হাইকোর্ট দেখিও না মেজবৌ! বারো মাস এত আহ্লাদ করে আনোচ্ছ, রাধছ, আর নিজে খাও না! তা তো নয়, আমার আনা জিনিস খাবে না–তাই বল।
সুবৰ্ণ ওর অভিমানক্রুদ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে।
সুবর্ণ ওর স্বামীর অভিমানের কারণটার দিকে তাকিয়ে দেখে। চেপ্টে যাওয়ার আর ভেঙে যাওয়া খাদ্যবস্তু দুটো যেন সুবর্ণর দিকে ব্যঙ্গদৃষ্টিতে তাকায়।
তবু সুবৰ্ণ নরম গলায় বলে, ওকথা বলছে কেন? তোমার আনা জিনিস খাব না! এমন অহঙ্কারের কথা বলবোই বা কি করে? আমিতো পাগল নই! সত্যিই আমি ওসব খাই না। ইচ্ছে হয় তা জিজ্ঞেস করে দেখো দিদিকে।
এবার হয়তো বিশ্বাস হয় প্ৰবোধের।
আর হয়তো এই আশাভঙ্গেই হঠাৎ তার চোখে জল এসে যায়। নিজেকে ভারী অপমানিত লাগে। অতএব আক্রোশটা গিয়ে পড়ে হাতের জিনিস দুটোর ওপর।
চুলোয় যাক তবে! ফেলে দি গে। রাস্তায়!— বলে দ্রুত পদে চলে যায় ঘর থেকে।
বইয়ের পাতা ওল্টাতেও ইচ্ছে হয় না আর।
বইপত্তরগুলো সাবধানে চৌকির তলায় ঠেলে দিয়ে, হাঁটুর ওপর মুখ রেখে বসে থাকে সুবর্ণ। আর মনে মনে তার বিধাতাকে প্রশ্ন করে, আমার দাম কাষতে একটা কানাকড়ি ছাড়া কি আর কিছুই জোটে নি তোমার ঠাকুর?
১.২৪ সিঁড়িতে উঠতে উঠতে থমকে দাঁড়ালো প্ৰভাস
সিঁড়িতে উঠতে উঠতে থমকে দাঁড়ালো প্ৰভাস।
ওটা কি হচ্ছে?
একটা মেয়েলী গলায় স্পষ্ট উচ্চারণে কী শোনা যাচ্ছে ওসব মেজদার ঘরের ওদিক থেকে?
পদ্য।
পদ্য আওড়ানো হচ্ছে!
কিন্তু এ তো ছোট ছেলেমেয়ের পড়া মুখস্থ নয়! এ যে নাটক!
বল বল বল সবে,
শত বীণা বেণু রবে,
ভারত আবার জগৎসভায়
শ্ৰেষ্ঠ আসন লবে।
সিঁড়ি থেকে নয়, পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেজদার দরজার কাছেই এসে পৌঁছায় প্রভাস, আর দুটোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার কাছে। শোনা এবং দেখা।
মেজাগিনী ইস্কুলই খুলেছেন।
তিনি একখানা বই খুলে ধরে খানিকটা আওড়াচ্ছেন, আর তার পর কটা ছোট ছেলেমেয়ে তার দোয়ার দিচ্ছে। সুবর্ণর ছেলেমেয়ে আছে, উমাশশীর আছে।
ইস্কুলই বা কেন, কের্তনের দল বললেও তো হয়।
তাই পরবর্তী ঝঙ্কারে যখন ছোটরা ভুল-ভাল উচ্চারণে বলে ওঠে–
ধর্মে মহান হবে, কর্মে মহান হবে।
নব দিনমণি উদিবে আবার–
পুরাতন এ পূরবে—
তখন চৌকাঠে পা রেখে চেঁচিয়ে ওঠে। প্ৰভাস, বাঃ বাঃ! কেয়াবাৎ! এ যে একেবারে পুরোপুরি কোত্তনের দল! মূল গায়েন সুর দিচ্ছেন, চেলাচামুণ্ডারা দোয়ার দিচ্ছেন, শুধু তবলার বোলটাই বাকি! তবে তোদের মাকে বলে দে চন্নন, পাশের ঘরে তোদের সেজখুড়ির ভাই এসেছে। শুনে শুনে তাজ্জব হচ্ছে বোধ হয়। ভদ্রলোকের ছেলেটা!
বলা বাহুল্য চুপ হয়ে গিয়েছিল সকলেই।
প্রভাসও এতেই যথেষ্ট হয়েছে ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যাচ্ছিল, সহসা শুনতে পেল বড়দার একটা নিতান্ত ছোট ছেলে বলে উঠলো, সেজকাকা, মেজখুড়িমা আমাদের আবার গাইতে বলছেন। বলছেন, এটা কোত্তন নয়।
প্রভাস শেষ কথাটা শোনে না, প্রথমটাই শোনে।
অসহ্য বিস্ময়ে বলে, আবার গাইতে বললেন!
