সুবৰ্ণ হঠাৎ অদ্ভুত রকমের শান্ত হয়ে যায়।
শান্ত-শান্ত ভাবেই হেসে ওঠে। হেসে উঠে বলে, শাস্ত্ৰে বলে বুঝি? দেখছো অম্বিকা ঠাকুরপো, আমার স্বামীর কী শাস্ত্ৰজ্ঞান! তা বলেছ ঠিকই, ভালই আছি। খুব ভাল আছি। তোমার এই বোনের দেশ থেকে যেতেই ইচ্ছে হচ্ছে না-
যেতেই ইচ্ছে হচ্ছে না! প্ৰবোধ নিমপাতা গেলা গলায় বলে, তা অনিচ্ছে তো হবেই, এখানে যখন এত মধু!… কী মশাই, আপনিই না। আমার বোনাইয়ের সেই দেশোদ্ধারী ভাই? তা দেশোদ্ধারের পথটা দেখছি ভালই বেছে নিয়েছেন! নির্জনে পরস্ত্রীর সঙ্গে রসালাপ—
আঃ মেজদা, কী বলছেন যা তা—, অম্বিকা যেন ধমক দিয়ে ওঠে, ছোট কথা বলবেন না। ছোট কথা আর কারো ক্ষতি করে না, নিজেকেই ছোট করে!
মেজদা! ধমক!
প্ৰবোধ একটু থিতামত খায়, কারণ প্ৰবোধ এই উল্টো ধমকের জন্যে প্ৰস্তৃত ছিল না। তবে থতমত খাওয়াটা তো প্ৰকাশ করা চলে না, তাই সামলে নেয়। তবে গলায় আগের জোর ফোটে না।
ফিকে ফিকে গলায় বলে, ছোট! ই, আমরা ক্ষুদ্র মনিষ্যি, আমাদের আবার ছোট হওয়া!
ক্ষুদ্ৰই বা ভাববেন কেন নিজেকে? অম্বিকা ধীর গলায় বলে, নিজেকে ক্ষুদ্রও ভাবতে নেই, অধমও ভাবতে নেই। মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বিকাশ!
ওঃ, লম্বাচওড়া কথা! উপদেশ! শুরু এসেছেন! প্ৰবোধ এবার নিজ মূর্তিতে ফেরে। বলে, ওঃ, নিরালায় ঈশ্বরসাধনাই হচ্ছিল তা হলে? আমি এসে ব্যাঘাত ঘটালাম! কী আর বলবো, আপনি কুটুমের ছেলে, বোনাইয়ের ভাই, আপনার অপমান তার অপমান। তাই পার পেয়ে গেলেন। এ অন্য কেউ হলে তাকে জুতিয়ে পিঠের ছাল তুলতাম। আর এই যে বড়সাধের মেজবৌদি! চল তুমি, তোমাকে আমি দেখে নিচ্ছি গিয়ে। অবাক কাণ্ড! একঘর ছেলেপিলে, বয়সের গাছপাথর নেই, তবু কুবাসনা ঘোচে না? তবু ইচ্ছে করে পরপুরুষের দিকে তাকাই? যাক, তার জন্যে ভাবি না। মেয়েমানুষকে কি করে শায়েস্তা করতে হয় তা আমার জানা আছে।
অবাক কথা বৈকি, তবু সুবর্ণ ফেটে পড়ে না। বরং প্রায় হেসেই বলে, জানো নাকি? তা তবু তো শায়েস্তা করে উঠতে পারলে না। আজ অবধি।… নাও চলো, এখন দেখ শায়েস্তা করে শূলে দেবে কি ফাঁসি দেবে! এই ভালমানুষ ছেলেটাকে আর ভয় পাইয়ে দেব না বাপু, পালাই। … অম্বিকা ঠাকুরপো, ওই পদ্যটা কিন্তু আমার চাই ভাই। একটু কষ্ট করে ওর একটা নকল করে দিও আমায়।
তা প্ৰবোধ দেবতা নয়!
রক্তমাংসের মানুষ সে।
অতএব গোড়ার জিনিস ঐ রক্তটাই তার টগবগিয়ে ফুটে ওঠে স্ত্রীর ঐ প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গের দাহে। সুবৰ্ণ যদি ভয় পেত, যদি গুটিয়েসুটিয়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতো, আর ঐ পাজী লক্কা ছেলেটা যদি প্ৰবোধকে দেখে বেত-খাওয়া-কুকুরের মত ঘাড় নিচু করে পালিয়ে প্ৰাণ বাঁচাতো, তা হলে হয়তো প্ৰবোধ এত ফেটে পড়তো না।
কিন্তু সেই স্বাভাবিক হলো না।
হলো একটা অভাবিত বিপরীত।
ছোঁড়াটা এলো বড় বড় কথা কয়ে উপদেশ দিতে, আর সুবর্ণ কিনা স্বামীকেই ব্যঙ্গ করলো!
অতএব প্ৰবোধও ফেটে পড়লো।
উগ্ৰমূর্তিতে বলে উঠলো, শূল কেন, ফাঁসি কেন? পায়ে জুতো নেই। আমার? জুতিয়ে মুখ ছিঁড়ে না দেওয়া পর্যন্ত তোমার মতন বেহায়া মেয়েমানুষের মুখ বন্ধ করা যাবে না! বেরিয়ে এসো! বেরিয়ে এসো বলছি! এতদিন পরে স্বামী এলো, ধড়ফড়িয়ে উঠে আসবে, তা না, পরপুরুষের বিছানায় বসে বসে স্বামীকে মস্করা! আর তুমি শালা-
তা অনেক সামলেছে নিজেকে প্ৰবোধ। স্ত্রীর চুলের মুঠি ধরে নি, এবং শালা শব্দটা উচ্চারণ করেই থেমে গেছে।
সুবৰ্ণ এবার উঠে আসে।
কেমন একটা অবিচলিত ভাবেই আসে।
আর সব চেয়ে আশ্চর্য, এর পরেও সেই পরপুরুষের সঙ্গে কথা কয়। বলে, মিথ্যে তোমরা দেশ উদ্ধারের স্বপ্ন দেখছো অম্বিকা ঠাকুরপো। দেশকে আগে পাপমুক্ত করবার চেষ্টা করো। …এই মেয়েমানুষ জাতটাকে যতদিন না। এই অপমানের নরককুণ্ডু থেকে উদ্ধার করতে পারবে, ততদিন সব চেষ্টাই ভস্মে ঘি ঢালা হবে।
প্ৰবোধের সঙ্গে এসেছিল সুবালার ছোট ছেলেটা। তাকেই বলেছিল সুবালা, এই যা। যা, ছুটে যা, তোর মেজমামীকে ডেকে নিয়ে আয়, অম্বিকা কাকার বাড়িতে আছে বোধ হয়।
প্ৰবোধ সেই মাত্র খুলে রাখা জুতোটা আবার পায়ে গলিয়ে বলেছিল, চল, আমিও যাচ্ছি!
সুবালা প্ৰমাদ গনেছিল।
সুবালা তার মেজদাকে অনেকদিন না দেখলেও একেবারে চেনে না তা তো নয়! তাই বলে উঠেছিল, তুমি আবার কি করতে যাবে গো! এই তেন্তেপুড়ে এলে, তুমি বোসো, হাতমুখ ধোও, ও যাবে আর আসবে! তুমি ততক্ষণ একটু মিছরির পানা খাও—
প্ৰবোধ বোনের এই সহৃদয় আতিথ্যের আহবানে কর্ণপাত করে নি। গাঁট গট করে এগিয়ে গিয়েছিল ছেলেটাকে চল বলে একটা হুমকি দিয়ে।
সুবালা কিংকৰ্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, মেজদার পিছু পিছু গেলে যে ভাল হতো, সেটা তখন মনে পড়ে নি। তার।
মনে পড়িয়ে দিলেন ফুলেশ্বরী। বললেন, তুমিও গেলে পারতে বৌমা, মনে হচ্ছে মেজ ছেলে একটু রাগী মানুষ-
একটু রাগী? সুবালাও রেগে ওঠে, বলে, আজন্মের গোয়ার! বেঁটাকে কি তিলার্ধ স্বস্তি দেয়! রাতদিন সন্দেহ, ওই বুঝি বৌ মন্দ হলো! তার ওপর আবার—মেজবৌই বা মরতে একা মেয়েমানুষ পদ্য শুনতে ওর ঘরে গেল কোন ছাই, তাও জানি না।
পদ্য শুনতে!
হ্যাগো, বললো তো তাই কানু। মা অম্বিকা কাকার বাড়ি আছে পিসি, পদ্য শুনবে! পদ্যটদ্য লেখে তো ঠাকুরপো, আর মেজবৌও তেমনি পাগলী! জানিস যখন বর ওইরকম—
