তাছাড়া অস্বস্তি যেমন ওদিকে, তেমনি এদিকেও। অম্বিকার অস্বস্তি ভাবটা যদি মেজবৌন্দির মুখ ধরা পড়ে যায়। তাতেও লজ্জার সীমা নেই। উনি স্ত্রীলোক হয়ে সাহস করে বসে রইলেন, আর অম্বিকা–
দূর, উনি কত বড় গুরুজন, ওঁর কাছে আবার—
অতএব আবার গলা ঝেড়ে শুরু করে দেয় অম্বিকা,
এখনো না। যদি ভাঙিতে পারিস,
কখনো কি হবে আর?
লৌহনিগড় গড়িবে আবার
প্ৰবলের অনাচার।
মরণকুণ্ডে ঝাঁপ দিতে এসে,
নতশিরে কি করে ফিরে যাবি শেষে?
মস্তকে বহি কাঁটার মুকুট
ললাটে অন্ধকার!
বিশ্বজগৎ টিটকারি দেবে
ধিকৃত উপহাসে,
ষষ্টি-আহত পশুর সমান
কাপুরুষ ক্রীতদাসে। ভা
বী তনয়ের ললাটে কি ফেরা
দিয়ে যাবি এই কলঙ্ক-জের—
এই সেরেছে!
অম্বিকা হাতের কাগজগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে থাকে। বিপন্নমুখে বলে, এর পরের পৃষ্ঠােটা আবার কোথায় গেল?
নেই!
সুবৰ্ণ চমকে ওঠে।
আশা ভঙ্গের উত্তেজনায় বলে, কি করে রাখো কাগজপত্ৰ! কি করলে ছাই! রয়েছে তো কাগজ তোমার হাতে-
অম্বিকা অপ্রতিভা মুখে বলে এটা শেষ পৃষ্ঠা। মাঝখানটা একটা টুকরো কাগজে ছিল—
আশ্চর্য! সুবৰ্ণর মনে আসে না, সুবর্ণ অম্বিকার অভিভাবক নয়। মনে আসে না, ওকে তিরস্কার করবার তার অধিকার আছে কিনা। প্রায় অভিভাবকের ভঙ্গীতেই ক্রুদ্ধ তিরস্কার করে ওঠে, ধন্যি ছেলে! আমন-ভাল জিনিসটা হারিয়ে ফেললে?
অম্বিকা অপরাধী-অপরাধী ভাবে বালিশের তলায় হাত বুলোয়, তোষক উল্টে দেখে। সুবৰ্ণও চৌকির তলায় উঁকি মারে হেট হয়ে, তারপর বিফলমনোরথ হয়ে বলে, নাঃ! সে নির্ঘাত হাওয়ায় উড়ে বনেজঙ্গলে চলে গেছে। মুখস্থ নেই?
অম্বিকা কুণ্ঠিত হাসি হাসে, নাঃ! এই তো মাত্ৰ কাল রাত্রে লিখেছি—
যাক গে, শেষটাই পড়। এত ভাল লাগছিল!
অম্বিকা আবার পরের পাতাটায় চোখ ফেলে। বোধ করি নিজের ওই মুখস্ত না থাকার জন্যে মরমে মারে। সেই কুণ্ঠিত গলাতেই পড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই—
কালিমাখা মুখে পৃথিবীর বুকে
টিকে থেকে কিবা ফল,
অকারণ শুধু ধ্বংস করিতে
ধরার অন্নজল?
যে মাটি আগুলি রহিবি বসিয়া–
দাবিদাওয়াহীন সে মাটির ঋণ
শোধ দিবি কিসে বল?
নাড়া দিয়ে ভোঙ। পুরনো দেওয়াল,
কতকাল রবে খাঁড়া?
মাথা তুলে আজ দাঁড়া!
বীরদাপে যারা করে অন্যায়,
তারা যেন আজ ভাল জেনে যায়,
বিষবৃক্ষের উচ্ছেদ লাগি,
মাটিতেও জাগে সাড়া!
অম্বিকা ঠাকুরপো!
সহসা যেন একটা আৰ্তধ্বনি করে ওঠে সুবৰ্ণলতা। কী ভাগ্যি অম্বিকার হাতটাই চেপে ধরে নি!
অম্বিকা ঠাকুরপো, ওইখানটা আর একবার পড়ো তো—
অম্বিকা বিস্মিত হয়।
অম্বিকা বিচলিত হয়।
তাকিয়ে দেখে সুবর্ণর মুখে আগুনের আভা, সুবৰ্ণর চোখে জল।
আশ্চর্য তো!
মানুষটা এত আবেগপ্রবণ?
একটু যেন ভয়-ভয় করছে।
কই পড়ো?
সুবৰ্ণর কণ্ঠে অসহিষ্ণুতা, এ তো শুধু এই পরাধীন দেশের কথাই নয়। এ যে আমাদের মতন চিরপরাধীন মেয়েদের কথাও। কী করে লিখলে তুমি? পড়ো, পড়ো আর একবার—
অম্বিকা যেন বিপন্ন গলায় আর একবার পড়ে—
নাড়া দিয়ে ভোঙ পুরোনো দেওয়াল–
কতকাল রবে খাঁড়া?
মাথা তুলে আজ দাঁড়া!
বীরদাপে যারা করে অন্যায়,
তারা যেন আজ–
নাঃ, সুবৰ্ণলতার আজকের দিনটা বুঝি একটা অদ্ভুত উল্টোপাল্টা দিয়ে গড়া!
ভালো আর মন্দা!
আলো আর ছায়া!
পদ্ম আর পঙ্ক!
তা নইলে এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটে?
যখন সুবৰ্ণলতা মুগ্ধ বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটা পরপুরুষের মুখের দিকে, যখন সুবর্ণর মুখে আলোর আভাস আর চোখে জল এবং যখন এই অনাসৃষ্টি দৃশ্যের ধারে-কাছে কেউ নেই, তখন কিনা সে দৃশ্যের দর্শক হবার জন্যে দরজায় এসে দাঁড়ায় সুবৰ্ণলতার চিরবাতিকগ্ৰস্ত স্বামী! যে নাকি এযাবৎকালে আপন চিত্তের আগুনেই জ্বলে-পুড়ে খাক হলো!
সেই জ্বলে-পুড়ে মরা মানুষের সামনে জ্বলন্ত দৃশ্য!
দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
থিয়েটারি ঢঙে বলে উঠেছে, বাঃ বাঃ—কেয়াবাৎ! এই তো চাই!
পুরনো দেওয়াল অটুট রইল, বিষবৃক্ষেত্র পাতাটি মাত্র খসলো না, মাটির সাড়া মাটির মধ্যেই স্থির হয়ে রইল, সুবৰ্ণ তাড়াতাড়ি মাথার কাপড়টা একটু টেনে দিয়ে বলে উঠলো, তুমি হঠাৎ? চাঁপা ভালো আছে তো?
হ্যাঁ, যে মুহূর্তে আচমকা দরজায় প্ৰবোধের মূর্তিটা ফুটে উঠেছিল, সেই চকিত মুহূর্তটুকুতে চাঁপার কথাটাই মনে এসেছিল সুবৰ্ণলতার।
হঠাৎ ও কেন এমন বিনা খবরে? চাঁপার কোনো রোগবালাই হয় নি তো?
কিন্তু সেই চকিত চিন্তার পরমুহূর্তেই দূর হয়ে গেল সে আশঙ্কা! তেমন হলে ঐ থিয়েটারি ঢঙে কোয়াবাৎটা হতো না নিশ্চয়। এ আর কিছু নয়, গোয়েন্দাগিরি!
ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠলো মাথা, সারা শরীরের মধ্যে বয়ে গেল বিদ্যুৎপ্রবাহ, তবু ফেটে পড়তে পারা গেল না। সামলে নিতে হলো নিজেকে। মাথায় কাপড় টেনে উদ্বিগ্ন গলায় বলতে হলো, তুমি যে হঠাৎ? চাপা ভালো আছে তো?
বিদ্যুৎপ্রবাহকে সংহত করতে শক্তিক্ষয় হচ্ছে বৈকি, তবু উপায় কি? ঐ সভ্য ভদ্র উদার ছেলেটার সামনে তো আর সুবর্ণ তার স্বামীর স্বরূপটা উদঘাটিত করতে পারে না, তাদের ভিতরের দাম্পত্য সম্পর্কের স্বরূপ!
কিন্তু সুবর্ণর শক্তিক্ষয়ে কি রক্ষা হলো কিছু?
সুবৰ্ণর স্বামী কি মহোল্লাসে নিজের গায়ে কাদা মাখল না? নিজের মুখে চুন-কালি?
মাটিতে মিশিয়ে দিল না। সুবর্ণর সমস্ত সম্ভ্রম? দিল। সুবর্ণর জীবনের সমস্ত দৈন্য উদঘাটিত করে দিল সুবর্ণর স্বামী। বলে উঠলো, চাপা? ওসব নাম মনে আছে তোমার এখনো? আশ্চয্যি তো!-চাঁপার খবর জানি না, তবে চাঁপার মা যে খুব ভালো আছে, তা প্রত্যক্ষ করছি। বাঃ! চমৎকার! সাধে কি আর শাস্ত্ৰে বলেছে, সাপ আর স্ত্রীলোক এই দুইকে কখনো বিশ্বাস করতে নেই।
