ফুলেশ্বরী আস্তে বলেন, সংসারে এই পাগলদেরই সবচেয়ে বিপদ বৌমা। সুবর্ণর মতন মেয়ে সংসারে দুর্লভ। কিন্তু সবাই তো ওকে বুঝবে না। একা বেটাছেলের বাড়িতে যেতে নিন্দে, এ বোধই নেই। ওর, গঙ্গাজলে ধোওয়া মন ওর।
তা তো ধোওয়া! এখন জানি না কি খোয়ার হয়। যা আগুন হয়ে গেল মেজদা!
তাতেই বলছিলাম, তুমি সঙ্গে গেলে পারতে!
তাই দেখছি। কিন্তু এখন আবার গেলে—
তা হোক বৌমা, তুমিও যাও। রাগের মাথায় যদি ছেলে সুবৰ্ণকে একটা চড়া কথা বলে বসেন, ভারী লজ্জার কথা হবে। অম্বু আমাদের আপনি, ওদের তো কুটুম!
তবে যাই। উনুনে যে আবার দুধ বসানো।
দুধ আমি দেখছি। তুমিও যাও। আমার মন নিচ্ছে দাদা তোমার বকাবিকি করবে।
সুবালা অতএব দাওয়া থেকে নামে।
আর মনে মনে ভাবে, মেজদার এই দুম করে আসাটাই ফন্দির। জানি তো সন্দেহবাতিক মানুষ। আর মজা দেখ, কোনোদিন মেজবৌয়ের এ খেয়াল হয় না, মরতে ছাই আজই! মেজদাকে বলিহারি! আমন পরিবার, মর্ম বুঝল না। বুঝবে কি, মৰ্ম বস্তু নিজের থাকলে তো!
দ্রুত এগোতে থাকে সুবালা।
হয়তো সুবালা ঠিক সময় পৌঁছতে পারলে ব্যাপার সমে আসতো। হয়তো সুবালাই গিয়ে বলে উঠতো— কী জ্বালা! মেজবৌ, তুই এখানে বসে বসে পদ্য শুনছিস? আর মেজদা যে ইদিকে মনকেমনের জ্বালায় ছুটেপুটে চলে এসে তোকে না দেখে বিশ্বভুবন অন্ধকার দেখছে!
হয়তো যা হোক করে কেটে যেত ফাঁড়া।
কিন্তু কাটবার নয়, তাই কাটল না।
সুবালা বেরিয়ে দুপা যেতেই গরুর রাখালটা কাঁদো কাঁদো হয়ে ধরলো, অ মা, মুংলির বাছুরটা পেলে গেছে—
পালিয়ে গেছে!
হিঁ গো মা! ক্যাতো খুঁজানু—, বরে বিবরণ দিতে বসে তার খোঁজা পর্বের।
আচ্ছা তুই দাঁড়া, আমি আসছি—, বলে সুবালা এগিয়ে যায়, কিন্তু যখন পৌঁছায়, তখন তার মেজদা শেষ বাণী উচ্চারণ করছে।
জুতিয়ে মুখ ছিঁড়ে না দিলে যে মেয়েমানুষ শায়েস্তা হয় না, সেই অভিমত ব্যক্ত করছে।
সুবালার মরমে মরে যায়।
অম্বিকা ঠাকুরপোর সামনে এইসব কথা! তা-ও সুবালারই দাদার মুখ থেকে! নিরুপায় একটা আক্ষেপে হঠাৎ চোখে জল আসে তার। যেমন এসেছিল তেমনি দ্রুতপায়ে ফিরে যায়।
সুবৰ্ণলতা টের পায় না, তার এই অপমানের আরো একজন সাক্ষী রয়ে গেল।
কিন্তু অত অপমানের পর আবার সুবৰ্ণ সেই স্বামীর পিছু পিছু সেই স্বামীর ঘরে ফিরে গেল? সুবৰ্ণলতা না। সত্যবতীর মেয়ে?
১.২২ সুবৰ্ণলতা না সত্যবতীর মেয়ে
তাই তো! সুবৰ্ণলতা না সত্যবতীর মেয়ে! যে সত্যবতী স্বামীর কাছ থেকে আঘাত পেয়ে এক কথায় স্বামী-সংসার ত্যাগ করে গিয়েছিল, আর ফেরে নি!
মায়ের সেই তেজের কণিকামাত্ৰ পায় নি। সুবৰ্ণলতা? সত্যবতী তার মেয়ের এই অধোগতি দেখে ধিক্কার দেবে না? বলবে না, ছিছি সুবর্ণ তুই এই!
সে ধিক্কারের সামনে তো চুপ করে থাকতে হবে সুবৰ্ণকে মাথা হোঁট করে!
নাকি করবে না মাথা হেঁট?
মুখ তুলেই তাকাবে মায়ের দিকে?
বলবে, মা, তোমার অবস্থায় আর আমার অবস্থায়? সেখানে যে আকাশ-পাতাল তফাৎ!
তা বলতে যদি পারে সুবর্ণ, বলতে যদি পায়, মিথ্যা বলা হবে না। আকাশ-পাতালই। সুবর্ণর মার র পৃষ্ঠাপটে ছিল এক অত্যুজ্জ্বল সূৰ্যজোতি, সত্যবতীর বাবা সত্যবতীর জীবনের ধ্রুবতারা, সত্যবতীর জীবনের বনেদ, সত্যবতীর মেরুদণ্ডের শক্তি
সুবৰ্ণর পৃষ্টপটে শুধু এক টুকরো বিবর্ণ ধূসরতা! সুবর্ণর কাছে বাবার স্মৃতি-বাবা, প্রতারণা করে তার বিয়ে ঘটিয়ে জীবনটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে।
সুবৰ্ণর বাবা সুবর্ণর ভাগ্যের শনি!
আর স্বামীভাগ্য?
সেও কি কম তফাৎ? সত্যবতীর স্বামী অসার অপদার্ধ ছিল। কিন্তু অসভ্য অশ্লীল ছিল না। সত্যবতীর অযোগ্য হতে পারে, তবে সে অত্যাচারী নয়। কিন্তু সুবৰ্ণলতার ভাগ্যে তো মাত্র ওই দ্বিতীয় বিশেষণগুলোই। আজীবন সুবৰ্ণকে একটা অসভ্য, অশ্লীল আর অত্যাচারীর ঘর করতে হচ্ছে!
ত্যাগ করে চলে যাবে কখন?
সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখাবার আগেই তো ঘাড়ে পিঠে পাহাড়ের বোঝা উঠছে জমে। ওই বোঝার ভার নামিয়ে রেখে চলে যাবে সুবৰ্ণ তার সন্তানদের মধ্যেও নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে? হয়তো আরো কালিমাখা হবে সে ছবি।
সুবৰ্ণ তাই তার মার সামনে মুখ তুলে বলতে পারবে মা, তোমার মেয়ে তোমার মত নিষ্ঠুর হতে পারে নি, এই তার ক্রটি! তোমার মত হাল্কা ছোট্ট সংসার পায় নি, এই তার দুর্ভাগ্য!
তোমার মেয়ে মায়ে-তাড়ানো বাপে-খেদানো তেজটা ফলাবে তবে কোন পতাকাতলে দাঁড়িয়ে? ধিক্কার তুমি দিতে এসো না মা, শুধু এইটুকু ভেবো, সকলের জীবন সমান নয়, সবাইকে একই মাপকাঠিতে মেপে বিচার করা যায় না! যাকে বিচার করতে বসবে, আগে তার পরিবেশের দিকে তাকিও!
সুবৰ্ণর পরিবেশ সুবৰ্ণকে অসম্মানের পাকেই রেখেছে, সুবৰ্ণ আবার এইটুকু অসম্মানে করবে কি? আর সুবর্ণর দেহকোটরে এখনো না শক্রির বাসা! তাকে বহন করে নিয়ে যাবে কোন মুক্তির মন্দিরপথে?
সুবৰ্ণকে অতএব সেই পথেই নেমে যেতে হবে, যে পথের শেষে কি আছে সুবৰ্ণ জানে না, পথটা অন্ধকারে ভরা এই জানে শুধু।
কিন্তু সুবর্ণ হয়তো একদিন তার সন্তানের মধ্যে সার্থক হবে। মাথা তুলে দাঁড়াবে পৃথিবীর সামনে। সেই স্বপ্নই দেখে সুবর্ণ। সেই ভবিষ্যতের ছবিতেই রং দেয়।.
এখন অতএব আর কিছু করার নেই সুবর্ণর, তাই স্বামীর পিছু পিছু চলে যাওয়া ছাড়া!
