আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সুবৰ্ণলতার চোখমুখ সর্বাবয়ব।
অম্বিকা সুবৰ্ণলতার মা সত্যবতীকে দেখে নি। দেখে নি, তাই সহসা অনুভব করতে পারে না। এই আলোর উৎস কোথায়!
অম্বিকা অবাক হয়।
অম্বিকা বোধ করি অপ্ৰতিভাও হয়।
যেন সুবৰ্ণলতা যে এতদিন টের পায় নি। অম্বিকার ঘরের সেলফে চারটি মলাট-ছেড়া সেলাইঢ়িলে পত্রিকা আছে, সেটা অম্বিকারই ক্রটি। সেই অপ্ৰতিভা অপ্ৰতিভা মুখে বলে, আমারই উচিত ছিল আপনাকে দিয়ে আসা-
সুবৰ্ণলতা সরল আনন্দে হেসে ওঠে।
ওমা! তুমি কী করে জানবে যে তোমাদের মেজবৌদি এমন বই-হ্যাংলা! কিন্তু তা তো হলো, যার জন্যে এলাম তার কি! তোমার পদ্যের খাতা কোথায়?
কী মুশকিল! বললাম তো, খাতাটাতা নেই, কদাচ কখনো প্ৰাণে জাগলো কিছু, হাতের কাছে যা পেলাম তাতেই লিখলাম, তারপর কোথায় হারিয়ে গেল!
কখনো না, তুমি ঠিকাচ্ছ।
আরে না, বিশ্বাস করুন।
অম্বিকা হাসে, এই যে তার সাক্ষী–
হঠাৎ বালিশের তলা থেকে টেনে বার করে কয়েক টুকরো বালির কাগজ।
হেসে হেসে বলে, কাল রাত্রে হচ্ছিল খানিকটা কবিত্ব।
কই দেখি দেখি–
সুবৰ্ণ পুলকিত মুখে হাত পাতে।
অম্বিকা চৌকির ওপর রাখে।
হেসে বলে, যা হস্তাক্ষর, তার ওপর আবার কাটাকুটি–
সুবৰ্ণ অবশ্য ততক্ষণে টেনে নিয়ে দেখেছে এবং হস্তাক্ষর সম্পর্কে যে অম্বিকা অতি বিনয় করে নি তা অনুভব করেছে। তাই কুণ্ঠিত হাস্যে বলে, বেশ, তবে তুমিই পড়া।
সুবৰ্ণলতা অবোধ বৈকি।
প্ৰস্তাবটা যে অশোভন, অসামাজিক, এ জ্ঞান হয় না কেন তার? হলেই বা পাঁচটা ছেলে-মেয়ের মা, তবু বয়েস যে তার আজো ত্রিশেও পৌঁছয় নি, এ খেয়াল নেই? একটা সম্পূর্ণ অনাত্মীয় যুবাপুরুযের একক গৃহে এসে বসে তার মুখে কবিতা শুনতে চাওয়ার কথা উচ্চারণ করলো সে কী বলে?
আর অম্বিকা?
সেও কি বাংলার গ্রামের ছেলে নয়?
হয়তো এ একটা নতুন উত্তেজনা বলেই লোভটা সামলাতে পারছে না। তা লোভই। লেখে সে ছেলেবেলা থেকেই, কিন্তু তার কবিতা সম্পর্কে কে কবে আগ্ৰহ দেখিয়েছে! কে কবে এমন আলোেভরা উৎসুক মুখ নিয়ে তাকিয়ে থেকেছে শোনোও বলে!
তাছাড়া আর পাঁচজনের থেকে তফাত বৈকি অম্বিকা। তার পরিমণ্ডলে একটা নির্মল পবিত্রতা, তার অন্তরে একটা অসঙ্কোচ সরলতা। তার কাছে সুবালা এবং সুবৰ্ণলতা একই পর্যায়ের গুরুজন। সুবালার প্রতিও তার যেমন একটি সশ্রদ্ধ ভালবাসা, সুবর্ণর প্রতিও তেমনি একটি সশ্রদ্ধ প্ৰীতি।
তাই সেই খুচরো কাগজ কটা গুছিয়ে নিতে নিতে হেসে বলে, শুনে বুঝবেন বৃথা সময় নষ্ট। এটা হচ্ছে দেশের এখনকার এই পরিস্থিতি নিয়ে—
মা! ভানু ডেকে ওঠে। আমি যাই!
সুবৰ্ণলতা চমকে ওঠে।
ভানু যে এখনো এখানেই ছিল তা খেয়ালই ছিল না। বই দেখেই পাগল হয়ে গিয়েছিল।
এখন ঈষৎ চঞ্চল হয়ে বলে, কেন, চলে যাবি কেন? অম্বিকাকার লেখা পদ্য শোন না!
পদ্য সম্বন্ধে ভানু যে বিশেষ উৎসাহী, ভানুর মুখ দেখে তা মনে হল না। বললো, আমাকে ওরা দেরি করতে বারণ করেছে।
কেন, তুই আবার কী রাজকাৰ্য করে দিবি ওদের?
এমনি।
হঠাৎ সুবৰ্ণলতা ছেলের ভবিষ্যৎ-চিন্তায় তৎপর। হয়। লেখাপড়া তো সব শিকেয় উঠেছে, কর এবার! এরপর যেতে হবে না ইস্কুলে?
অম্বিকা হেসে ওঠে, না, আপনি বড় সাংঘাতিক! একে বেচারাকে জোর করে কবিতা গোলাবার প্ৰস্তাব, তার উপর আবার পড়ার কথা মনে পড়িয়ে দেওয়া। যেতে দিন ওকে। চলুন, বরং ও-বাড়ি গিয়েই পড়া যাক। আমার লাজলজ্জার বালাই নেই। দিব্যি ছাত ফাটাবো!
অম্বিকা স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই সুবৰ্ণলতার সঙ্কোচ বোঝে, তাই ও-বাড়ির কথা তোলে।
কিন্তু সুবর্ণ সহসা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে।
ছি ছি, কী মনে করলো অম্বিকা ঠাকুরপো!
মনে করলো তো, সুবর্ণ একা তার ঘরে বসতে ভয় পাচ্ছে, অস্বস্তি পাচ্ছে।
ছি ছি!
সুবৰ্ণলতা সেই অস্বস্তিকে কাটালো।
সুবৰ্ণলতা দৃঢ় হলো।
বলে উঠল, না না, আবার এখন এ-বাড়ি ও-বাড়ি। পড় তুমি।… এই মুখুটা, যা তুই, পিসি জিজ্ঞেস করলে বলিস, আমি এখানে আছি।
সুবৰ্ণ বলেছিল, বলিস। আমি এখানেই আছি। কিন্তু সত্যিই কি তা ছিল সে?
না, আর এক জগতে এসে পড়েছিল!
তা মুখ দেখে তাই মনে হচ্ছিল বটে।
আর এক জগতের-!
অম্বিকা পড়ছিল।
ওই শোনো শোনো সাড়া জাগিয়েছে
কালের ঘূর্ণিপথে—
ভাঙনের গান গেয়ে ছুটে আয়
মরণের জয় রথে।
ওই দেখ, কারা আসে দলে দলে,
দেশজননীর পূজাবেদীতলে,
অক্লেশে প্ৰাণ করে বলিদান
হোমের আহুতি হতে।
তাই দ্বারে দ্বারে ডাক দিয়ে যাই
চল চল ছুটে চল—
কে ওরা ভাঙিছে বন্দিনী মা’র
চরণের শৃঙ্খল।
ওদের সঙ্গে দে মিলায়ে হাত,
বৃথা পশ্চাতে কর আঁখিপাত,
বাঁধিবে কি তোরে শিশুর হাস্য,
প্রিয়ার অশ্রু জল?
এখনো না। যদি ভাঙিতে পারিস-
পড়তে পড়তে থেমে যায় অম্বিকা। কুণ্ঠা-কুষ্ঠা হাসি হেসে বলে, দূর, নিশ্চয় আপনার ভাল লাগছে না।–
ভাল লাগছে না!
সুবৰ্ণ উত্তেজিত গলায় বলে, ভাল লাগছে না। মানে? কে বলেছে ভাল লাগছে না? পড়ো— পড়ে যাও। যে লাইনটা পড়লে, আবার ওইট থেকে পড়ে যাও।
অম্বিকার অস্বস্তি হচ্ছিল।
অম্বিকার নিজের মন যতই উদার আর নির্মল হোক, পাড়াগায়ের ছেলে সে। অনাত্মীয় তো দুরের কথা, নিকট-আত্মীয় পুরুষের ঘরেও এমন একা বসে গল্প করলে যে মেয়ের ভাগ্যে ভর্ৎসনা জোটে, তার নামে নিন্দে রটে, তা তার জানা।
তার ওপর আবার কবিতা শোনা!
তবু সুবর্ণর ঐ আবেগ-আবিষ্ট ভাল লাগার মুখটা বেশ একটা নতুন আনন্দের স্বাদ এনে দিচ্ছে। সত্যি এমন করে এমন একটা আগ্রহ-উৎসুক। মনের সামনে কবে অম্বিকা নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করতে পেরেছে?
