সুবৰ্ণলতা বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, খেলবো তোদের সঙ্গে। কিন্তু একটা শর্তে!
সুবৰ্ণলতার মুখটা আলো-আলো দেখায়।
তারপর মাটি মাখতে মাখতে আসল কথাটি বলে সুবৰ্ণলতা, আমায় তোদের অম্বিকাকাকুর বাড়িতে একবার নিয়ে যাবি?
অম্বিকাকাকুর বাড়ি!
পরস্পর দৃষ্টি-বিনিময় করে হেসে ওঠে।
অম্বিকাকাকুর বাড়ি! সে তো ওই-ওইটা। ওখানে আবার নিয়ে যাওয়া কি?
অর্থাৎ ওটা আবার একটা নিয়ে যাবার জায়গা নাকি!
সুবৰ্ণলতাও কি তা জানে না?
তবু সুবৰ্ণলতা তার ছেলের সাহায্য প্রার্থনা করে।
একা ফট্ করে যেতে পারে না তো, শুধু একটা পুরুষ ছেলের নির্জন ঘরে যাওয়া!
ছেলে একটা সঙ্গে থাকাই ভাল।
তাই কৌতুক-কৌতুক মুখ করে নিয়ে বলে, তা জানি রে বাপু, তবু চল না। মানে খেলার শেষে!
আজকের খেলা একটা সত্যিকার বাড়ি তৈরি। গতকাল অনেক মাটি মেখে ছোট ছোট চৌকো। চৌকো ইট তৈরি করে রেখেছিল, আজ সেইগুলো জুড়ে জুড়ে সত্যিকারী পাকা বাড়ি করা হবে।
প্ল্যান!
সে তো মাথাতেই আছে।
ছোট ছোট সেই ইটগুলো রোদে ভাজা ভাজা হয়ে শক্ত হয়ে গেছে। সুবৰ্ণলতা সেগুলি নাড়তে নাড়তে বলে, এই ঠিক কাজ করছিস। ইট তৈরি করে নিয়ে তবে বাড়ি বানানো খুব ভাল। মজবুত হয়। কারণ শুধু কাদার দেওয়াল নেতিয়ে পড়ে!
তারপর ইটের পর ইট সাজিয়ে দেওয়াল তুলে দেয় সুবর্ণ ওদের। তৈরি হয় শোবার ঘর, খাবার ঘর, রান্নাঘর, ভাড়ারঘর, ঠাকুরঘর।
ভানু পুলকিত গলায় বলে, মা!
কী রে?
তুমি আর-জন্মে বোধ হয় মিস্ত্রি ছিলে!
সুবৰ্ণ হেসে ওঠে, তা ছিলাম হয়তো।
তারপর সুবৰ্ণ কাদামাটির হাত ধুতে ধুতে বলে, এইবার তবে চল!
চলো।
অকৃতজ্ঞ ভানু অনিচ্ছা-মন্থর গতিতে চলে। এইমাত্র মা তাদের বাক্যদত্ত করিয়ে নিয়েছে তাই, নিচেৎ কে চায় এই খেলা ফেলে অম্বিকাকাকার বাড়ি যেতে?
যে অম্বিকাকাকাকে নিত্য দেখতে পাওয়া যায়!
তবু চলে।
সুবৰ্ণলতাও যায়।
সুবৰ্ণলতার বুকটা দুরদুর করে, মনটা ভয়-ভয়, উত্তেজিত-উত্তেজিত।
যেন বিরাট এক অভিযানে বেরিয়েছে সে।
কবিতার সন্ধানে অম্বিকার বাড়িতে এসে হাজির সুবৰ্ণলতা।
সংসারজ্ঞানহীন অম্বিকাও কিঞ্চিৎ বিপন্ন না হয়ে পারে না। এতটা সেও আশা করে নি। বারেবারেই তাই বলতে থাকে, কী মুশকিল, বলুন তো! আপনি নিজে এলেন, হুকুম হলে গন্ধমাদন পর্বতটাই বয়ে নিয়ে যেতম!
তারপর হেসে ফেলে বলে, অবশ্য তারপর নিশ্চয়ই হতাশ হতেন। বিশল্যকরণীর চিহ্ন খুঁজে পেতেন না।
কিন্তু কি পেত। আর না পেত। সেকথা ভাবতে বসছে না সুবৰ্ণলতা। সুবৰ্ণলতা রুদ্ধনিঃশ্বাসে আর দুরন্ত আবেগে একটা ধূলিধূসরিত সেলফের মধ্যে রাখা প্রায় জঞ্জালসদৃশ্য কাগজের স্তূপ হাতড়াচ্ছে।
প্ৰকাণ্ড সেলফটার তাকে তাকে নেই। হেন জিনিস নেই। খবরের কাগজের কাটিঙের ফাইল, ইংরেজি-বাংলা নানা পত্রিকার সম্ভার, গোছাগোছা প্রবন্ধের পাণ্ড়ুলিপি, ক্যালেণ্ডার, হ্যাণ্ডবিল, চিঠিপত্রের রাশি, কী নয়! এর মধ্যে থেকে কবিতা উদ্ধার করতে হবে। তাও খাতায় নয়, খুচরো কাগজে লেখা।
সুবৰ্ণলতা সব উল্টোতে থাকে।
অম্বিকা ব্যস্ত হয়ে বলে, দেখছেন তো কী অবস্থা! সৃষ্টির আদি থেকে ধুলো জমে চলেছে। পর পর কেবল চাপানেই হয়, নামানো তো হয় না কোনদিন!
পদ্য-টদ্য এই জঙ্গলের মধ্যে রাখো কেন? ক্ষুব্ধ আবেগে বলে সুবৰ্ণলতা।
পদ্যই বলে। কবিতা বলতে হয়, বললে ভাল শোনায়, অত খেয়াল করে না!
অম্বিকা হেসে বলে, রাখি না। তো, ফেলি। কোনো কিছু ফেলার পক্ষে জঙ্গলই শ্রেষ্ঠ জায়গা।
অম্বিকাদের এই বাড়িটা জ্ঞাতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বড় বাড়ির ভগ্নাংশ নয়, ছোট্ট একটু একতলা, সম্পূর্ণ আলাদা। অম্বিকার বাবা জ্ঞাতিদের থেকে পৃথক হয়ে আম-জাম-কাঁঠালের বাগানের ধারে এই ছোট বাড়িখানা করিয়েছিলেন। অম্বিকার মা বেঁচে থাকতে ছবির মত রাখতেন বাড়িটিকে, রাখতেন ধূলিমালিন্য শূন্য করে। কিন্তু ছেলের ঘরের এই সেলফটিতে হাত দেওয়ার জো ছিল না। তাঁর। হাত দিলেই নাকি অম্বিকার রাজ্য রসাতলে যেত।
এখন সারা বাড়িতেই ধুলো।
সুবালা অথবা তার মেয়েরা এক-আধাদিন এসে ঝাড়ামোছা করে দিয়ে যায়, অম্বিকা বিকাব্যকি এবং ঝাটা কড়াকড়ি করে, ব্যস!
কিন্তু সুবর্ণর তো ধুলোর দিকে দৃষ্টি নেই। সে ধুলোর আড়াল থেকে মাণিক খুঁজছে।
আরো সেই খোঁজার সূতের পেয়ে যাচ্ছে অনেক মণিরত্ন। কত বই, কত পত্রিকা! ইস, ভাগ্যিাস এল সুবর্ণ এখানে!
ঠাকুরপো, এত বই তোমার? কই বল নি তো?
অম্বিকা অপ্ৰতিভ হাস্যে বলে, বই দেখে এত খুশী হবেন, জানি না তো।
জানো না, বাঃ। সুবর্ণ বলে ওঠে, আমি কিন্তু এগুলো সব পড়বো। রয়েছি তো এখনো, পড়ে নেব তার মধ্যে। w
অম্বিকা হাসে, পড়লে তো বেঁচে যায় ওরা। ধুলোর কবরের মধ্যে পড়ে আছে, উদ্ধার হয় তার থেকে।
সুবৰ্ণ দীপ্ত প্ৰসন্নমুখে বই বাছতে থাকে, এবং বেছে বেছে প্ৰায় গন্ধমাদনই করে তোলে। আলো-জুলা মুখে বলে, এই আলাদা করা থাকলো, কিছু কিছু করে নিয়ে যাব, আবার পড়ে পড়ে রেখে যাবো।
অম্বিকা বলে, জিনিসগুলো এত অকিঞ্চিৎকর যে বলতে লজ্জা করছে, রেখে না গেলেও ক্ষতি নেই, নিয়েই রাখতে পারেন। রাখলে ওই মলাট-ছেড়া ধুলোমাখা কাগজপত্রগুলো কৃতাৰ্থ হয়ে যায়।
সুবৰ্ণ এবার হাসিমুখে বলে, অত্যয় কাজ নেই, একবার পড়তে পেলেই বর্তে যাই। এতদিন রয়েছি, জানি কি ছাই! জানলে তো রোজ এসে হানা দিতাম। উঃ, আজও যাই ভাগ্যিস এসেছিলাম!
