আর একজন চিন্তিতভাবে বলে, তা বললে কি হবে, মেজখুড়ির রাগ জানিস তো। তার ওপর আবার শুধু পুলিস নয়, স্বদেশী মারা পুলিস!
মেজখুড়ি রাগ করলো তো বয়ে গেল, এ কথা ওরা ভাবতেই পারে না। মেজখুড়ির অপ্ৰসন্নতা, সে বড় ভয়ঙ্কর দুঃখবহ।
অবশেষে ওরা ঠিক করে, বলা চলবে না। দরকার কি রাগিয়ে মেজখুড়ীকে!
মল্লিকা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, মার জন্যেই এইটি হল আমার। চাপির সঙ্গে ঠাকুমার সঙ্গে চলে যেতাম চুকে যেত। তখন বললো, ছেলে সামলাতে হবে না রে— মাির ভঙ্গীর অনুকরণ করে মল্লিকা, আমাকে তো আর হোসেল সামলাতে হবে না। ওখানে—, এখন দেখছিস তো? রাতদিন কথা বদলা, ন্যাতা কেচে আনি, দুধ খাইয়ে দে! কেনই যে এতগুলো ছেলে-মেয়ে হয় মানুষের? ছোট খুড়ির বেশ! শুধু বুদো—ব্যস!
হঠাৎ মল্লিকার ভাই গৌর হেসে বলে ওঠে, তাহলে তো তোকে আর জন্মাতেই হোত না। শুধু আমি ব্যস! তুই নিতাই, রামু, টেঁপি, টগর, ফুটি, পুঁচকে খোকা, খুকী, সব্বাই পড়ে থাকতো ভগবানের ঘরে।
এটা অবশ্য খুব একটা মনঃপূত হল না মল্লিকার। মল্লিকা জন্মায় নি, সেটা আবার কেমন পৃথিবী!
অনেক আলোচনান্তে অবশেষে কিন্তু স্থির হয় মেজখুড়ির কাছে কিছুই গোপন করা চলবে না, কারণ মেজখুড়ি পেটের ভেতরকার কথা টের পায়। স্পষ্টই তো বলে, আমার একটা দিব্যচক্ষু আছে, বুঝলি! তোরা কে কি লুকোচ্ছিস সব বুঝতে পারি। মিথ্যে কথায় বড় ঘেন্না মেজখুড়ির, অতএব বলা হবে। তবে এটাও জোর করে বোঝাতে হবে, তাদের কী দোষ? তারা তো ইচ্ছে করে মাসীর বাড়ি বেড়াতে আসে নি?
হঠাৎ একসময় শরৎশশীর নজরে পড়ে, সব কটায় মিলে কি যেন গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এসে ভুরু কুঁচকে বলে, কি করছিস রে তোরা?
ওরা অবশ্য চুপ।
শরৎশশী বিস্মিত হয়, বার বার প্রশ্ন করে এবং সহসাই বিশ্বাসঘাতক টেঁপি বলে ওঠে, মেসোমশাই পুলিস তো, সেই কথাই হচ্ছে—
দাদা-দিদিদের সব ইশারা ব্যর্থ হয়।
চিমটি কাটা বিফলে যায়।
শরৎশশী। যখন কঠিন গলায় বলে, পুলিস তো কি হয়েছে! তখন টেঁপি বলে ওঠে, স্বদেশীমারা পুলিস খুব বিচ্ছিরি তো। মেজখুড়ি যদি শোনে আমরা এ বাড়িতে আছি, তাহলে আর ঘেন্নায় ছোঁবে না। আমাদের, তাই মেজখুড়িকে বলা হবে না—
মেজখুড়ি!
শরৎশশী। শুধু এইটুকুই বলতে পারে।
টেঁপি মহোৎসাহে বলে, হ্যাঁ, মেজখুড়ি যে স্বদেশীভক্ত! জানো না? পুলিসকে ঘেন্না করে, সাহেবকে ঘেন্না করে।
শরৎশশী মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর সহসাই কঠোর গলায় বলে ওঠে, বেশ, তবে থাকতে হবে না পুলিসের বাড়ি, চলে যা নিজেদের ভাল বাড়িতে। আজই যা!
১.২১ স্বাধীনতা পরাধীনতা নিয়ে
স্বাধীনতা পরাধীনতা নিয়ে যে যেখানে মাথা ঘামাক, সত্যিকার স্বাধীনতা যদি কেউ পেয়ে থাকে তো পেয়েছে সুবৰ্ণলতার ছেলেমেয়েরা পিসির বাড়ি এসে।
রাতদিন অনেকগুলো রক্তচক্ষুর তলায় থাকতে থাকতে ওরা জানতো না মুক্তির স্বাদ কি, স্বচ্ছন্দচারণের সুখ কি? কারণে-অকারণে হঠাৎ আচমকা কেউ ধমকে উঠবে, এমন আশঙ্কা নিয়েই তাদের জীবন।
বিশেষ করে সেজকাকা!
ছেলেপুলেকে একবার একটু হুড়োহুড়ি করতে দেখলেই বা একবার তাদের একটু হেসে উঠতে শুনলেই তিনি সেই ছেলেপুলের পেটের পিলে চমকে দিয়ে হাঁক দেবেন, কে ওখানে? শুনে যা এদিকে!
ব্যস, তাতেই এমন কাপুনি ধরে যায় যে এদিকে আসবার ক্ষমতা আর থাকে না। অতএব সেই না আসার অপরাধেই বিরাশী সিক্কা, মোগলাই গাট্টা, রামচিমটি, শ্যামচিমটি ইত্যাদি করে অনেক কিছুরই স্বাদ পেতে হয়।
সুবৰ্ণলতা তার ছেলেদের মারে না বলেই বোধ করি সুবৰ্ণলতার ছেলেদের মারবার জন্যে এত হাত নিসপিস করে সেজকাকার।
মা ঠেঙায় না ছেলেদের, এমন মেমসাহেবীয়ানা অসহ্য বলেই হয়তো সেজকাকা মায়ের সেই মেমসাহেবীয়ানার শোধ নেন।
ভাগ্নের গায়ে হাত তুলতে না হয়। হাত কাপে, ভাইপোর গায়ে হাত তোলায় তো সে আশঙ্কা নেই!
সেই আবহাওয়া থেকে এসে মাঠে-মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। কাদা, মাটি, খড়, বাশ, পাতা লতা নিয়ে যতরকম খেলা তা সব খেলছে। পিসতুতো ভাইবোনেরা সঙ্গী।
কিন্তু আসল মজা হচ্ছে, এখানে এসে অবধি শুধু পিসতুতো দাদা-দিদিরাই নয়, আরো একজন তাদের খেলার মহোৎসাহী সঙ্গী। তিনি হচ্ছেন মা।
হ্যাঁ, মা!
সুবৰ্ণলতা তার বয়েস এবং পদমর্যাদার ভার ফেলে সমবয়সীত্বে নেমে আসে, রীতিমত যোগ দেয় খেলায়। যেমন ছেলেরা উঠোনে মাঝখানে দুদিকে দুটো পুকুর কেটে মাঝখানে একটা সঁকো বানাবে, অথচ জুৎ করতে পারছে না, কঞ্চি আর বাঁখারি নিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে, সুবৰ্ণলতা এসে পড়ে এবং বসে পড়ে একগাল হেসে বলে ওঠে, আমায় যদি তোদের খেলায় নিস তো আমি করে দিতে পারি।
মাকে নেওয়া না-নেওয়া আবার একটা কথা নাকি? ছেলেরা কৃতাৰ্থমন্য হয়ে বলে ওঠে, তুমি আসবে?
বললাম তো, যদি নিস!
নেবো নেবো, এসো তুমি খেলতে।
অতঃপর নেমেই আসে সুবৰ্ণলতা, নেমে আসে শিশুর খেলাঘরে। তোড়জোড় দেখে কে।
এই, একটা বাঁশ নিয়ে আয় দিকিন!.এই, একটা বড় দেখে গাছের ডাল নিয়ে আয় দিকি!… ওই চারটি বুনো ফুলের চারা আনতে পারিস? আলাদা একটু বাগান করবো!
এমন সব ফরমাশ করে সুবৰ্ণলতা, আর সেই আদেশ পালন করে। ধন্য হয় ছেলেরা।
মা একমুখ হাসছেন।
মা সহজ হালকা সোতে গা ভাসাচ্ছেন। এর থেকে আনন্দের আর কি আছে!
তা আজও সেই আনন্দ দিতে এল সুবৰ্ণলতা।
ওরা কৃতাৰ্থমন্য হয়ে এগিয়ে আসে।
