ভীতু উমাশশী ভয়ে কাটা হয়ে যায়, শিউরে উঠে বলে, তা বলি নি দিদি। বলছি জামাইবাবুর পক্ষে ভাল নয়। সময়ে নাওয়া-খাওয়া নেই, দিনে রাতে জিরেন নেই, সদাই ভয়-ভয়—
হঠাৎ নিজেকে সংবরণ করে নেয়। উমা, অলক্ষ্যে মার কাছে চিমটি খেয়ে।
চিমটির সাহায্যে সতর্ক করে দিয়ে সুখদা নিজেই হাল ধরেন।
না ধরে করবেন কি?
বলতে গেলে শরৎশশীর সাহায্যেই মোটামুটি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, বছরে দু-চার মাস তো থাকেনই তার কাছে, তাছাড়া বাকী সময়টা যেখানেই থাকুন, হাতখরচটা এখান থেকেই যায়!
নেহাৎ নাকি বদলির চাকরি করালীকান্তর, তাই এক নাগাড়ে থাকা হয় না। ব্যাণ্ডেলে বদলি হয়ে এসে পর্যন্ত আছেন। এখানে যত বড় কোয়াটার, তত বড় বাগান, তত লোকজনের সুবিধে, এলাহি কাণ্ড! এর অধিকারিণীকে চটাবেন? হাল অতএব ধরতেই হয়।
ধরেন, বলে ওঠেন, আগে কি এমন ভয়তরাস ছিল? না এত খাটুনীই ছিল? সোজাসুজি চুরিডাকাতি খুনখারাপি হতো, সোজাসুজি ব্যবস্থা ছিল। পোড়ার মুখো স্বদেশী ছোঁড়াগুলো যে উৎপাত করে মারছে। গুলি বারুদ তৈরি করে ব্রিটিশ রাজত্ব উড়িয়ে দেবে! ভাদ্দরঘরের ছেলে হয়ে ডাকাতি করবে! এইসব জ্বালাতেই বাছার নাওয়া-খাওয়া নেই। লক্ষ্মীছাড়া ছোঁড়াদের না হয় মা-বাপ নেই, পুলিস বেচারাদের তো ঘরে বৌ ছেলে আছে!
স্বদেশী স্বদেশী, এই শব্দটা অনবরতই কানে আসে বটে। উমাশশীর, কিন্তু স্বদেশী ছোঁড়াদের গুণাগুণ কি, তাদের কার্যকলাপ কি, তা নিয়ে মাথা ঘামাতে যায় নি কোনদিন, তাই আজ একটু থতমত খায়।
ভয়ে ভয়ে বলে, রাগ কোর না। শরৎদি, এত কথা তো জানি না। তাই বলছিলাম—
না, রাগের কি আছে? শরৎশশী উদাস গলায় বলে, আগেকার আমলে চোরের পরিবার ভয়ে কাটা হয়ে থাকতো বর কখন ধরা পড়ে, আর এখন পুলিসের পরিবারকে সশঙ্কিত হয়ে থাকতে হয়, বর। কখন মারা পড়ে, এই আর কি! কাজটা ভাল নয়, একপক্ষে বলেছিসই ঠিক। নিঃশ্বাস ফেলে শরৎশশী। হয়তো উমার কুণ্ঠা লজ্জা ভয় দেখে মায়া হয়, তাই আগুনটা সামলে নেয়, বলে, প্ৰাণ হাতে করে থাকা! এই যে রাত-বিরেতে বেরিয়ে যাচ্ছে মানুষ, যাচ্ছে তো সাপের গর্তে হাত দিতে, বাঘের গুহা খোঁচাতে! ফিরবে তার নিশ্চয়তা আছে? তবু বুক বেঁধে থাকতেই হবে, কতৰ্য্য করতেই হবে। ইংরেজের রাজত্বটা তো লোপাট হতে দেওয়া চলে না!
সুখদা ফোঁড়ন কেটে ওঠেন, কার অন্ন খাচ্ছিস? কার হাতে ধনপ্ৰাণ? তা ছোঁড়ারা ভাবছে না গো। কই, পারছিস গোরাদের সঙ্গে? শয়ে শয়ে তো জেলে যাচ্ছিাস, পুলিসের লাঠিতে মুখে রক্ত উঠে মরছিস, তবু হায়া নেই!
রক্ত ওঠায় কথায় শিউরে ওঠে উমা। আস্তে বলে, জামাইবাবুর হাতে ধরা পড়েছে। কেউ?
পড়ে নি? শরৎশশী দৃপ্ত গলায় বলে, গাদা-গাদা! তোর জামাইবাবু বলে, আমি গন্ধ পাই। সুমুদুরের তলায় লুকিয়ে থাকলেও টেনে বার করতে পারি।
উমা একটা নিঃশ্বাস ফেলে।
জামাইবাবুর কর্মদক্ষতায় খুব বেশি উৎসাহ বোধ করে না। হলেই বা স্বদেশী ছোঁড়া, মা-বাপের ছেলে তো বটে। আর এই সূত্রে তার মেজ জায়ের কথা মনে পড়ে যায়।
স্বদেশী শব্দটার ওপর যার প্রাণভরা ভক্তি।
অথচ আসলে ওই শব্দটা যে ঠিক কি তাই ভাল করে জানে না। উমা।
মানুষ?
না জিনিস?
নাকি কোনো কাজ?
কে জানে! ঠিক ধরা যায় না!
মেজ বৌকে জিজ্ঞেস করতেও ভয় করেছে। ওসব কথায় এমন চড়ে ওঠে, এমন বিচলিত হয়, দেখলে ভয় করে। উমা ভাবে, থাক গে, জেনেই বা কি হবে? আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরে দরকার কি?
কিন্তু এখানে এসে জামাইবাবুর কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, একটু বুঝি জানা-বোঝা ভালো। তাহলে এমন অন্ধকারে থাকতে হয় না। বুঝতে পারা যায়, কোনটা পাপ কোনটা পুণ্যি!
সুখদা সগৌরবে বলেন, শুনিলি তো?
সুখদার কথায় শরৎশশী সচেতন হয়। বলে, থাক মাসী ওসব কথা। দেশের সর্বনাশ যে আসন্ন তা বোঝাই যাচ্ছে। গোরারা একবার ক্ষেপলে কি আর রক্ষে থাকবে! তবে যারা কর্তব্যনিষ্ঠ, যারা বৃটিশের নেমক খাচ্ছে, তারা মরবে। তবু নেমকহারামী করবে না, এই হচ্ছে সার কথা। তাতে প্ৰাণ চলে যায় যাক।
কিন্তু এইটাই কি শরৎশশীর প্রাণের কথা? নাকি সে শাক দিয়ে মাছ ঢাকে? কথা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখে! ওই নির্বোধ উমাটা একেই দশমাতা হয়ে অহঙ্কারে মরছে, তার পর যদি টের পায়, পুরষ্কাশীর যা কিছু চাকচিকা সবই ভুয়ো, যা কিছু আলো জােনাকির আলো, তা হলে আর রইলো কি?
তা যতই শরৎশশী তার ভাগ্যকে আড়াল করুক, ছোট ছেলেমেয়েগুলোর চোখ এড়ায় না। তারা মহোৎসাহে খবর সন্ধান করতে থাকে।
তারা টের পেয়ে যায় মেসোমশাই যাদের সঙ্গে চুপি চুপি কথা কন, তারা হচ্ছে গোয়েন্দা, যেখানে ওই স্বদেশী গুণ্ডারা লুকিয়ে আছে সেখানের সন্ধান এনে দেয় ওরা। মেসোমশাই তখন ছোটেন সেখানে। সেই ছেলেদের চাবুক মারতে মারতে পিঠের ছাল তোলেন, লাথি মারতে মারতে পেট ফাটান, ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে পোরেন।
ভীষণ একটা উত্তেজনা অনুভব করে ওরা। নেহাৎ ছোট পাঁচটাকে বাদ দিলেও, বাকি কজন আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারে। আর সেই সূত্রে পাকা মেয়ে টেঁপি একটা প্রখর সত্য দাদা-? দিদিদের সামনে ধরে দেয়।
মেজখুড়ি যদি টের পায় আমরা পুলিসের বাড়িতে আছি, মেজখুড়ি আর ছোঁবে না। আমাদের। কথাই কইবে না।
চমকে যায়। তার দাদা-দিদিরা।
বলে, তাই তো রে, টেঁপি তো ঠিক বলেছে!
বাঃ, আমরা বুঝি ইচ্ছে করে পুলিসের বাড়িতে আছি? বললো একজন।
