তা হোক, পারবো না মা। গোরস্ত ছেলে, গোরস্ত হয়েই থাক।
ভগ্নদূতের বার্তা সুখদাকেই বহন করতে হয়েছিল এবং মেয়ের দুর্মতিতে পঞ্চমুখ হয়েছিলেন তিনি বোনঝির কাছে। তদবধি শরৎশশী উমাশশীর প্রতি ক্ষুন্ন। অথচ মা ছেলে ছাড়ল না এটাকে ঠিক অপরাধ বলেও ভাবতে পারে নি। তবে যোগাযোগও রাখে নি। এবারে যখন মান খুইয়ে নিজেই এল উমাশশী, খুশিই হল শরৎশশী।
বললো, তবু ভালো যে দিদি বলে মনে পড়লো।
তারপর খাওয়ামাখা আদরযত্বের স্রোত বহালো। … সুখদা আড়ালে মেয়েকে বলেন, দেখছিস তো সংসার! তখন বুঝলি না, আখের খোয়ালি। এখন ওর মন বদলে গেছে। বলে, ভগবান না দিলে কার সাধ্যি পায়!। তবে— ফিসফিস করেন সুখদা, নজরে ধরাতে পারলে, মেয়ের বিয়োতেও কিছু সুরাহা হতে পারে।
এসব প্রসঙ্গ অস্বস্তিকর।
কিন্তু তদপেক্ষা অস্বস্তিকর জামাইবাবু করালীকান্তর পেশাটা।
পুরুষমানুষ সকালবেলা তাড়াহুড়ো করে মানাহার সেরে আপিস কাছারী যায়, সন্ধ্যের মধ্যে বাড়ি ফেরে এই উমাশশীর জানা, মেজ দ্যাওর ব্যবসা না কি করে বটে, তবু তারও আসা-যাওয়া সুনিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এ কী?
না আছে আসা-যাওয়ার ঠিক, না আছে নাওয়া-খাওয়ার ঠিক। অর্ধেক দিন তো বাড়াভাত পড়েই থাকতে দেখা যায়, খাওয়াই হয় না। এসে বলে, অসময়ে আর ভাত খাব না, দুখানা লুচি দাও বরং।
তখন আবার তাড়াহুড়ো পড়ে যায় লুচি রে আলুর দম রে করতে।
আর শুধুই কি দিনের বেলা?
হঠাৎ হঠাৎ রাতদুপুরে ঘুম ভেঙে দেখে আলো জ্বলছে, চাকর-বাকর ছুটোছুটি করছে, শরৎদি হতে হাতে জিনিস নিয়ে ঘুরছে, আর জামাইবাবু পুলিসী ধড়াচুড়ো আঁটছেন।
চুপিচুপি দেখে, জামাইবাবু বেরিয়ে যাচ্ছেন, একটা লালমুখো ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে উঠছেন, হারিয়ে যাচ্ছেন বিমঝিম করা নিকষ অন্ধকারের মধ্যে।
দেখেশুনে উমাশশীর হাত-পা ঝিমঝিম করে আসে। খামোকা উঠে নিজের ঘুমন্ত ছেলেমেয়েগুলোর গায়ে হাত দিয়ে দেখে, হয়তো বা গোনে। যেন হঠাৎ দেখবে একটা কম।
বুকটা ছমছম করতে থাকে কি এক আশঙ্কায়।
কেন যে এমন হয়!
এমনিতে তো জামাইবাবু দিব্যি রসিক পুরুষ। শালী শালী করে ঠাট্টােতামাশাও করেন। মন ভাল থাকলে ডাক-হাঁক করেন, ওহে বিরহিণী, গেলে কোথায়? একলা বসে শ্ৰীমুখচন্দ্ৰ ধ্যান করছে। বুঝি?
কথা শুনে লজায় মরতে হয়।
ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে।
কিন্তু মন যখন ভাল থাকে না জামাইবাবুর?
তখন কী রুক্ষী! মুখে কী কটু কুৎসিত ভাষা! চাকরদের গালাগাল দেওয়া শুনলে তো কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করে। শরৎশশীও বাদ যায় না, তাকেও কাঁদিয়ে ছাড়েন। তাছাড়া এক এক সময়, বিশেষ করে রাতের দিকে সহসাই যেন বাড়ির হাওয়া বদলে যায়, বাইরে বৈঠকখানায় নানারকম সব লোক আসে, দরজা বন্ধ করে কথাবার্তা হয়, কী যেন গোপন ষড়যন্ত্র চলতে থাকে, জামাইবাবু বাড়ির মধ্যে আসেন যান, স্ত্রীর সঙ্গে চাপা গলায় কী যেন কথা বলেন, হয়তো সেই লোকগুলোর সঙ্গেই বেরিয়ে যান, কোন রাত্তিরে যে ফেরেন, টেরই পায় না। উমাশশী।
দিদি না খেয়ে বসে থাকলো, না খেলো কে জানে!
এমন গোলমেলে সংসার ভাল লাগে না উমাশশীর। মনেই যদি স্বস্তি না থাকলো তো কী লাভ রাশি রাশি টাকায়, ভাল ভাল খাওয়া-পরায়!
সেই কথাই একদিন বলে বসে উমা।
আর বলে মল্লিকার মুখে একটা কথা শুনে। মল্লিকা নাকি দেখেছে মেসোমশাই বাগানের ওধারে একটা লোককে মুখ বেঁধে চাবুক মেরে মেরে অজ্ঞান করে দিয়েছেন। আর সে নাকি চোর-ডাকাতের মতন মোটেই নয়, ভদ্রলোকের ছেলের মতন দেখতে।
উমাশশী বলে বসে, যাই বল দিদি, ও তোমার গোরস্তাবলী চাকরিবাকরিই ভাল। টাকা গয়না কম থাকলেই বা কি, মনে শান্তি থাকে। জামাইবাবুর কাজটা বাপু ভাল নয়।
সুখদা চমকে যান।
আড়চোখে বোনঝির মুখের দিকে তাকান, দেখেন সেখানে দৰ্প করে আগুন উঠেছে জ্বলে।
হয়তো কথাটা বড় আতৌ-ঘা-লাগা বলেই।
হয়তো নিজেও শরৎশশী অহরহ ওই কথাই ভাবে। ধু-ধু মরুভূমির মত জীবনের স্তব্ধ বালুভূমিতে যখন টাকার স্তূপ এসে পড়ে, তখন সে টাকাকে যে বিষের মতই লাগে তার।
বাড়িতে গোয়ালভর্তি গরু, রাশি রাশি দুধের ক্ষীর ছানা মিষ্টি খাবার তৈরি করে শরৎশশী, যদি তার দুটো খায় তো দশটা বিলোয়। কোথা থেকে কে জানে বড় বড় মাছ এসে পড়ে উঠোনে, কাটলে যজ্ঞি হয়, সেই মাছ চাকর-বাকরে খায় তিন ভাগ। কারণ পাড়ার লোককেও সর্বদা দিতে অস্বস্তি বোধ হয়।
বাগানের ফল আসে বুড়ি ঝুড়ি, আম কাঁঠাল কলা পেঁপে, এটা সেটা। এখন উমাশশী রয়েছে তাই আদর হচ্ছে সেই ফলোদের, নচেৎ তো ফেলাফেলিশ
শরৎশশীর গায়ে এবং বাক্সে গহনার পাহাড়। কিন্তু সুখ কোথায় তার? বরের মাইনে জানতে না পারলেও, উমাশশীর বরের মাইনের চেয়ে কম বৈ বেশি নয়, এ জ্ঞান শরতের আছে। তবে? কিসের টাকায় এত লিপচপানি করালীকান্তর?
উপরি আয়েই তো!
আর দারোগার উপরি আয় কোন ধর্মপথ ধরে আসে?
ভিতরে জ্বালা আছে শরৎশশীর।
তদুপরি জ্বালা আছে স্বামীর চরিত্র নিয়ে। কিন্তু সেসব তো প্রকাশের বস্তু নয়। উমাকে আর তার ছেলেমেয়েকে খাইয়ে-মাখিয়ে দিয়েথুয়ে চোখ ধাঁধিয়ে রেখে নিশ্চিত ছিল, হঠাৎ দেখতে পেল নির্বোধ উমারও চোখ ফুটেছে। কিসে শান্তি, কিসে সুখ, সেটা ধরে ফেলেছে।
অতএব শরৎশশীর চোখে দৰ্প করে আগুন জ্বলে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক।
শরৎশশী সে আগুন চাপা দিতেও চেষ্টা করে না। বলে ওঠে, জামাইবাবুর কাজটা ভাল নয়? ও! তবে ভালটা কার? চোর ডাকাত খুনে গুণ্ডাদের? ওলো, এই খারাপ কাজ করা লোকগুলো আছে বলেই এখনো রাজ্য চলছে, বুঝলি? নচেৎ অরাজক হয়ে উঠতো।
