আমি সব কবিতা দেখবো। ঠাকুরপো, তোমার কবিতার খাতা দেখাতে হবে।
খাতা!
অম্বিকা হেসে ওঠে।
খাতা কোথায় পাবো? ছেঁড়া কাগজের ফালি হচ্ছে আমার ভাবের বাহন। হাতের কাছে যখন যা পেলাম!
তা তাই দেখবো।
কে তুলে রেখেছে!
দেখো, তুমি আমায় ঠকাচ্ছে। বেশ তো, নতুন একটা লেখো।
এই সেরেছে। দাদা, বুঝতে পারছে? বিশ্বাস করছেন না। আমার বিদ্যে। হাতে হাতে প্ৰমাণ চান।
মোটেই না। আমি শুধু দেখতে চাই।
তবে তো লিখতেই হয়—, অম্বিকা হেসে ওঠে, দাদা আবার মাতালকে মদের বোতলের কথা মনে পড়িয়ে দিলেন!
অমূল্য বলে, তবে যা, ঘরে বসে মাতাল হগে যা। চললাম। আমি। ভীষণ কাজ।
দুজনকে বিভোর হয়ে গল্প করতে দিতে অস্বস্তি বোধ করে অমূল্য পাড়ার লোকের চোখের জন্যে। চোখগুলি তো ভাল নয়। সুবালার মত সরল আর কজন আছে?
ভাইকে এই ইঙ্গিতটা দিয়ে কাজে চলে যায় অমূল্য।
অনুমান করতে পারে না, খাল কেটে কুমীর এনে গেল।
অনুমান করতে পারল না, ইঙ্গিতের মর্ম বুঝবে না। এরা। তার পাগলী শালাজ অম্বিকার সেই কোটরে গিয়ে উঠবে কবিতা হাতড়াতে।
১.২০ চাঁপার ধারণা ভুল ছিল না
চাঁপার ধারণা ভুল ছিল না।
বড় মেয়ে মল্লিকাকে স্রেফ ঘুষ দিয়েই নিজের দিকে টেনে এনেছিল–উমাশশী। পুরো আস্ত একটা টাকাই ঘুষ দিয়ে বসেছিল। ঝাঁটি-বাঁধা মহারাণী মার্কা এই টাকাটি কবে থেকে যেন তোলা ছবি লুকানো একটি কোটায়, সেটি দেখিয়েছিল মেয়েকে।
ভীরু ভীরু গোপন অনুরোধ।
চল না। আমার সঙ্গে, দিয়ে দেব এটা।
মল্লিকার লুব্ধ দৃষ্টি জ্বলে উঠেছিল বটে, তবু সে বোজার মুখে বলেছিল, আহা, তোমার সঙ্গে যাই আর তোমার ছেলে বইতে বইতে প্ৰাণ যাক আমার!
বলেছিল।
বলে দিব্যি পার পেয়েও ছিল।
সাধে কি আর চাঁপা আড়ালে বলে, আমি যদি জেঠিমার মেয়ে হতাম, হাজারগুণ ভালো হত আমার।
চাঁপার জেঠিমা এ-হেন অপমানেও জ্বলে ওঠে না, বরং আরো মিনতির গলায় বলে, ওখানে গিয়ে ছেলে বইতে হবে কেন রে? ওখানে কি আমাকে হেঁসেল সামলাতে হবে? শরৎ দির বাড়িতে কত ঠাকুর চাকর লোকজন!
ঠাকুর চাকর লোকজন সমৃদ্ধ সেই বড়লোক মাসতুতো মাসীর বাড়ির লোভনীয় আকর্ষণে আর একবার মনটা টলে মল্লিকার, তবু অটল ভাব দেখায়, লোকজন তো লোকজন, তুমি তোমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইলে ঠাকুমা তোমার গলা টিপে দেবে না?
নিয়ে যেতে চাইলে!
উমাশশী শিউরে বলে, আমি চাইবো কি বল? তুই বলবি যে মন-কেমন করছে!
আহা রে! লোকে যেন বিশ্বাস করবে!
এবার উমাশশীর চোখের কোণে জলের আভাস দেখা দেয়, লোকে বিশ্বাস করবে না? মাভাই-বোনদের জন্যে মন কেমন করাটা অবিশ্বাসের?
মল্লিকা ঈষৎ অপ্রতিভ হয়।
বলে, আর চাঁপি? চাঁপিকে যে তাহলে একলা যেতে হবে! চাঁপি আমার গায়ে ধুলো দেবে না?
উমাশশী অতঃপর চাপির সম্পর্কে ঠাকুমার একদেশদর্শিতার উল্লেখ করতে বাধ্য হয়। বলে, চাঁপাকে তো মা বুকে করে রাখবেন। যত টান তো ওর ওপরেই, দেখিস না? তোর অভাব ও টেরই পাবে না।
চাঁপা সম্পর্কে যে মুক্তকেশীর কিঞ্চিৎ দুর্বলতা আছে, সে কথা এরা সকলেই জানে, কিন্তু এমন স্পষ্টাম্পষ্টি আলোচনা হয় না কোনো দিন। উমাশশী নিরুপায় হয়েই আজ সে আলোচনা করে। একএকটা দিনের উদাহরণ দেখায়, যে উদাহরণে চাঁপা-মল্লিকার ঝগড়া মেটাতে মুক্তকেশী মল্লিকাকে ধমক এবং চাঁপাকে পয়সা দিয়েছেন, এমন বৰ্ণনা আছে।
ঝগড়া?
তা হয় বৈকি দুজনের।
ভাবও যত, ঝগড়াও তত।
তা সে যাই হোক, শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রাজী করাতে সক্ষম হয়েছিল উমাশশী এবং একপাল ছেলেমেয়ে নিয়ে রওনা দিয়েছিল।
ব্যাণ্ডেলে মাসতুতো দিদি শরৎশশীর বাড়িতে। যে সে দিদি নয়, দারোগাগিন্নী।
কিন্তু দশটা ছেলেমেয়েকে নিয়ে প্রায় অপরিচিত মাসতুতো ভগ্নীপতির সংসারে এল কি বলে উমাশশী? সুবোধই বা পাঠালো কোন লজ্জায়?
তা জীবনমরণের কাছে আবার লজা!
তাছাড়া—আপাতত উমাশশীর মা সুখদা বোনঝির বাড়িতেই বাস করছিলেন। অতএব মা যেখানে ছা সেখানে।
শরৎশশী। অবশ্য হৃষ্টচিত্তেই গ্ৰহণ করেছে মাসীর মেয়েকে এবং তার বাহিনীকে। কারণ নিজের তার ষষ্ঠীর কৃপা নেই। অথচ ঘরে মা-লক্ষ্মী উথলে পড়ছেন। এই উথলে ওঠা চেহারা আত্মজনকে দেখাতে পারাও তো একটা পরম সুখ।
অবশ্য উমাশশীর ওপর একটু অভিমান তার ছিল, কারণ উমাশশীর যখন এ বছর আর বছর হচ্ছে, আর নিজে সে বন্ধ্যাই এ সত্য স্থিরীকৃত হয়ে গেছে, তখন ও মাসীর মারফৎ প্রস্তাব করেছিল, উমির একটা ছেলেকে দত্তক দিতে।
উমাশশী রাজী হয় নি।
উমাশশী বলেছিল, এ প্রস্তাব শুনলে আমার শাশুড়ী আমায় বঁটি দিয়ে দুখানা করবেন।
সুখদা বার বার বলেছেন, তা ভাবছিস কেন? লক্ষ্মীর ঘরে ছেলেটা সুখে থাকবে, রাজার হালে কাটাবে–
তুমি বল তধ্যে শাশুড়ীকে।
আমি কেন বলে দোষের ভাগী হতে যাব বাবা! তোর শাউড়ী বলবে, দুঃখী মাগী হয়তো বোনঝির কাছে ঘুষ খেয়ে বলছে!
অতএব প্ৰস্তাবটা হয় নি।
শরৎশশী তখন চিঠি লিখেছিল।
বলেছিল, পাকাঁপাকি দত্তক না দিস, মানুষ করতে দে আমায় একটিকে। তোর পাঁচটি আছে, আমার ঘর শূন্য।
উমাশশী শিউরে উঠে ষাট ষাট করেছিল এবং মার কাছে কেঁদে ফেলে বলেছিল, শাশুড়ী হয়তো রাজী হবেন, আমিই পারবো না মা। যার কথা ভাবছি, তার জন্যেই বুক ফেটে যাচ্ছে।
সুখদা বিরক্ত হয়েছিলেন।
বলেছিলেন, বুক তো ফাটছে, কিন্তু কি সুখেই বা রাখতে পেরেছ ছেলেপেলেকে? নেহাৎ মোটা চালের মধ্যেই আছে। অথচ শরতের পুষ্যি হলে—
