কিন্তু সুবৰ্ণলতা তার এতখানি বয়সে যা দেখেছে তা হচ্ছে এই— তোমার বুদ্ধি আছে স্বীকার করবো। এ কথা? হুঁ! গায়ের জোরে প্রতিপন্ন করে ছাড়বো না তুমি নির্বোধ, তুমি মুখ্যু? … তোমার বিবেচনা আছে, মানবো এ কথা? বরং ভুল পথে গিয়ে লোকসান খাবো, তবু তোমার কথা শুনবো না।… তোমার ইচ্ছানুসারে চলবো? গলায় দিতে দড়ি নেই। আমার? তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণই ব্ৰত হোক…ভারী তুমি আত্মসম্মানী, তোমায় পেড়ে ফেলে তবে কাজ আমার!
কারণ?
কারণ তুমি মেয়েমানুষ!
তুমি বৌ মানুষ!
তোমার যে এ হেন বাড়িতে বিয়ে হয়েছে, এই তোমার ভাগ্য!
এই দেখেছে সুবৰ্ণলতা।
কারণ জীবনে একটা বৈ দুটো সংসার দেখে নি সে।
পিতৃগৃহের ছবি তার কাছে অস্পষ্ট। তাছাড়া তার মা ভিন্ন আর কোনো মেয়েমানুষ ছিল না সে বাড়িতে, তার বাবা ভিন্ন আর কোনো পুরুষ। সে সংসারে অন্যকে টেক্কা দিয়ে পৌরুষ দেখানোর চেষ্টা ছিল না, চেষ্টা ছিল না। অন্যকে খেলো করবার জন্যে বাহাদুরি দেখানোর।
সুবৰ্ণলতাদের সংসারে ভাইয়ে ভাইয়ে চলে সেই বাহাদুরির প্রতিযোগিতা।
সেই প্রতিযোগিতার বলি মেয়েমানুষেরা।
যথেচ্ছ অবজ্ঞা করো তাদের, পৌরুষের প্রশংসাপত্ৰ পাবে। নিষ্ঠুর হতে পারলে আরো ভালো, অত্যাচারী হতে পারলে কথাই নেই। ভাইরা বুকুক আমি পুরুষ, আমি স্ত্রী-বশ নই।
মা-বাবার সংসারে এটা ছিল না।
তবু–
মায়ের সেই একলার সংসারেই বালিকা সুবৰ্ণলতার চোখেও ধরা পড়তো, তার মায়ের মধ্যে কোথায় যেন একটা তীব্ৰ জ্বালা, মানে বুঝতে পারত না। হয়তো এখনো সঠিক বোঝে না। মাঝে মাঝেই ভাবে, কেন বাবা অত ভালমানুষ—
আবার ভাবে, হয়তো শুধুই ভালমানুষ। কিন্তু তাকে দিয়ে কি একটা মানুষের হৃদয় ভরাট হয়?
সুবৰ্ণলতার স্বামীও তো এক এক সময় বশ্যতা স্বীকার করে, সুবৰ্ণলতা যদি তার মনের মত হতে পারতো, যদি সুবৰ্ণলতা কৃপণ হত, যদি সংকীর্ণচিত্ত হত, যদি স্বার্থপর হত, যদি স্বামীর কাছে মধুময়ী এবং অন্যের সম্পর্কে মুখরা হত, হয়তো সে বশ্যতা স্থায়ী হত।
যাকে আর পাঁচজন আখ্যা দিত স্ত্ৰৈণ!
কিন্তু অমূল্য কি স্ত্ৰৈণ!
না।
স্ত্রীর প্রতি অমূল্যর যে মনোভাব, তাকে বলা যায় সম্ভ্রম ভাব।
এ কথাটা শুনলে দর্জিপাড়ার গলি হয়তো হাসিতে ফেটে পড়বে! বলবে, আহা তাই তো, জগতে ভক্তি-সম্ভ্রমের যুগ্য আর কে আছে? গুরু-গোসাঁই তুচ্ছ করে পাদ্য-অর্ঘ্য দাও গিন্নীকে।
বলবে, নিশ্চিত এই কথাই বলবে।
কারণ দর্জিপাড়ার সেই গলি সন্ধু কথাটার অর্থ জানে না। কারণ নিজেকে কোনোদিন সম্ভ্রম করে নি সে।
এ সংসার সম্ভ্রম শব্দটার অর্থ জানে।
এ সংসারে কোথাও কোনো জ্বালা নেই।
যদিও সুবালা প্রতি পদে বলে, কী জ্বালা!
বলে। ওটাই ওর মুদ্রাদোষ। সবাইকে বলে। সুবৰ্ণকে বলে, কী জ্বালা, মাত্তর ওই কটা মুড়ি খাবে তুমি? ওই আধ-ছটাকী বাটিতে?
ভাইপো-ভাইঝিকে বলে, কী জ্বালা, চাষাভুষোর মত রোদে বেড়াতে শিখলি যে!
শাশুড়ীকে বলে, কী জ্বালা, আবার আপনি এখন কাঁথা পেড়ে বসলেন? খাওয়া-দাওয়া হবে না?
বরকে বলে, কী জ্বালা! তোমার জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরলাম যে! এই ভরসন্ধ্যোয় আবার বেরোচ্ছে তুমি?
অমূল্যর বেরোনো অবশ্য বন্ধ হয় না। তাতে, হাসতে হাসতে বলে যায়, তা আমার জ্বালায় জুলবে না তো কি পাড়ার গয়লা বুড়োর জ্বালায় জুলবে? একজন আমার জ্বালায় আজন্ম জুলবে বলেই তো বিয়ে করে ঘরে পরিবার আনা।
সুবালা হাড় বার করা মুখে হেসে ওঠে।
এই ভয়ঙ্কর সত্যটা নিয়ে কৌতুক ওর। এইভাবে ওদের জ্বালায় গল্প।
সুবৰ্ণ কি তবে ঈর্ষায় জ্বলবো?
না না, সুবর্ণ এত নীচ নয়। সুবর্ণ এদের সুখ দেখে সুখী। তবু বুকের মধ্যে কোথায় যেন চিনচিন করে ওঠে।
আবার আহ্লাদও হয়। সুবালা যখন তার বাউণ্ডুলে দ্যাওরটাকে বলে ওঠে, কী জ্বালা, এই এতখানি বেলায় এলে তুমি? ভাত যে পান্তো হয়ে উঠলো!
আর অম্বিকাও ওর সুরাটা নকল করে বলে ওঠে, কী জ্বালা! ভাত পান্তো হয়ে উঠলো বলে দুঃখ? ঘরে ভাত থাকলে তবে তো সে পান্তো হবার অবকাশ পাবে?
তখন ভারী একটা আহ্লাদে মনটা খুশি-খুশি হয়ে ওঠে সুবর্ণর।
অথচ এতেও ঈর্ষার কারণ ছিল।
দ্যাওর-ভাজের মধ্যে যে অনাবিল প্ৰীতির সম্বন্ধ, সেটাই বা কবে দেখলো সুবৰ্ণ? দেবীররা ভ্ৰাতৃজায়াদের ব্যাখ্যানা করবে, এটাই তো মুক্তকেশীর বাড়ির নীতি। তারা ব্যঙ্গ করবে, হুল ফোঁটাবে, নিন্দে করবে, এই তো নিয়ম। কে জানে এ নিয়ম শুধুই মুক্তকেশীর বাড়ির, না। আরো অনেক অনেক বাড়ির!
কিন্তু এদের বাড়িতে—?
হ্যাঁ, সুবালার বাড়িতে অন্য নিয়ম।
আই না। অন্য ভুবন!
এই অন্য ভুবনে অম্বিকা তার বৌদির কথায় বলে ওঠে, নাও কোথায় তোমার পান্তো-টান্তো আছে বার করো দেখি, পেটকে শান্ত করি। খাণ্ডবদাহন হচ্ছে সেখানে।
বসে পড়ে নিজেই পিঁড়ি পেতে।
সুবালা পরম যত্নে ভাত বেড়ে দিয়ে বলে, ভারী তো ছিরির রান্না, ভাতটা গরম থাকতে খেলে তবু-
অথচ এ ছাড়া আর কিছু ব্যবস্থা হয়ও না।
ঝি-চাকরের তো পাট নেই, সুবালাকেই বাসন মাজতে হয়, রান্নাঘর নিকোতে হয়, এতক্ষণ অবধি আলাদা গরম ভাতের তদ্বির নিয়ে থাকলে সময়ে কুলোয় না।
অম্বিকা বলে, ছিরির মানে?… আচ্ছা মেজবৌদি, আপনার কি আপনার ননদের রান্না বিচ্ছিরি লাগে?
সুবৰ্ণর হঠাৎ খুব ভালো কোনো কথা যোগায় না, তাই তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, কী যে বলেন! আমার তো অমৃত মনে হয়।
