উঃ কী কষ্ট! কী কষ্ট!
জীবনে এই প্রথম বোধ করি মাকে বেচারী ভাবল চাঁপা।
তারপর আরো আতঙ্ক গ্ৰাস করতে বসলো চাঁপাকে। শুনেছে মার ঠাকুমা নাকি মার মাকে লুকিয়ে, আর মাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে ফেলেছিলেন!
সেই রাগে মার মা, যিনি নাকি চাঁপাদের দিদিমা, সংসার ত্যাগ করে কাশী চলে গেছেন। জীবনে আর মা তার মাকে দেখতে পেল না।
চাঁপার ঠাকুমাও যদি হঠাৎ এইখানে কারুদের বাড়িতে বিয়ে দিয়ে ফেলে তার!
ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে চাঁপার। বলা যায় না, বিশ্বাস নেই! মার ঠাকুমা তো চাঁপার ঠাকুমার সইমা! একই রকম বুদ্ধি হতে পারে।
হে ঠাকুর, তা হলে কি হবে?
লোকে চাঁপার দিদিমার গল্প শুনে বলে, বাবা, এত রাগ? বলে, অনাচ্ছিষ্ট। বলে, মাথার দোষ ছিল বোধ হয়।
কিন্তু চাঁপার তা মনে হয় না।–
চাঁপার ঠাকুমা যদি আমন কাণ্ড করে বসে, চাঁপার মাও নির্ঘাত চাঁপার দিদিমা সত্যবতী দেবীর মতনই করে বসবে।
করবেই! সন্দেহ নাস্তি!
অথচ চাঁপার মা সুবৰ্ণলতা পাগল-টাগল কিছুই নয়। তা পাগল না হোক, চাপা কিন্তু কিছুতেই তার মার মতন হবে না। বাপ, রাতদিন যেন মারমুখী! তার থেকে সেজ খুড়ি, ছোট খুড়ি, জেঠি, পিসি সবাই ভাল।
দিদিমা ওইভাবে মাকে বাঘের মুখে ফেলে দিয়ে চলে যাওয়াতেই বোধ হয় মার মেজাজ। অমন খাপ্পা। সত্যি মা হয়ে তুমি দেখলে না একবার! কী নিষ্ঠুর!! চাঁপার মাও ঠিক তাই হবে। তাছাড়া আর কি হবে?… হে ভগবান, ঠাকুমা যেন চাঁপার বিয়ে দিয়ে না বসে!
আগে আগে, যখন চাপা ছোট ছিল, মাঝে মাঝে মাকে বলতে শুনেছে, সেই ন বছর বয়সে এদের সংসারে এসে পড়েছি, মা বস্তু কী তা ভুলেছি!
এখন আর বলে না।
সুবৰ্ণলতার যে কখনো কেউ ছিল, তা আর বোঝা যায় না।
ঠাকুমা যদি লুকিয়ে লুকিয়ে চাঁপার বিয়ে দিয়ে ফেলেন? তখনও তাহলে বোঝা যাবে না, সুবৰ্ণলতার একটা চাপা নামের মেয়ে ছিল।
আর বাঁধা মানে না।
উথলে উথলে কান্না আসে।
তাড়াতাড়ি পুতুল বাক্সটা টেনে বার করে খেলতে বসে!
কিন্তু খেলতেও তো সেই পুতুল-বৌয়ের শ্বশুরবাড়ির জ্বালা আর খাটুনি। তাছাড়া আর কী ভাবেই বা খেলা যায়? কিন্তু এখন যেন সব কিছুই মধ্যেই চাপা নিজের ছায়া দেখছে।
পুতুলও আকর্ষণ হারালো!
মুক্তকেশীর কাছে ড়ুকরে গিয়ে পড়লো, ঠাকুমা, আমরা আর এখানে থাকব না, বাড়ি চল।
১.১৯ অন্য ভুবন
অন্য ভুবন।
সুবৰ্ণলতার কাছে এ এক আশ্চর্য নতুন ভুবন! অন্য ভুবন! এ ভুবনে শুধু আকাশেই উদার উন্মুক্ত আলো নেই, মানুষগুলোর মধ্যেও রয়েছে সেই আলো, উদার, উন্মুক্ত, উজ্জ্বল!
পাড়ার লোকের কথা জানে না। সুবৰ্ণলতা, জানে না সেখানে আলো না অন্ধকার, সে শুধু এই সংসারটাকেই জানছে। দেখছে আর জানছে।
ভেবে অবাক হয় সুবৰ্ণ, সুবালাকে বরাবর সবাই গরীব বলে এসেছে। এই সেদিনও ভাসুর গিয়ে বললেন, গরীবের সংসার বটে, তবে অমূল্যাটা পরিশ্রমী আছে তো? খেটেঁপিটে সংসার করে। গোয়ালে গরু, পুকুরে মাছ, বাগানে ফল-তরকারী, গায়ে-গন্তরে খেটে সব বজায় রেখেছে। তাতেই চলে যায় একরকম করে।
চলে যায় একরকম করে!
গরীব!
কিন্তু সুবালা যদি গরীব, তো ঐশ্বর্যবতী কে? হোক আড়ম্বরহীন টানাটানির সংসার, তবু এই সংসারখানির সম্রাজ্ঞী। তো ওই সুবালা। এ সংসার পরিচালিত হচ্ছে সুবালার ইচ্ছানুসারে, সুবালার নির্দেশে। শাশুড়ী নির্লিপ্ত কিন্তু নির্মায়িক নয়। যথাসাধ্য খাটেন। তিনি, কিন্তু সে খাটুনির বেশির ভাগ ছেলে-বৌ নাতি-নাতনীদের যত্ব পরিচর্যা বাবদ।
সুবালা যদি বলে, খাক গে বাবা ঠাণ্ডা দুধ—, ফুলেশ্বরী ব্যস্ত হয়ে বলেন, ওমা কেন? জ্বালানির ঘরে অত নারকেল পাতা, আমি একটা বুড়ী বসে রয়েছি ঠাণ্ডা খাবে কেন? ঠাণ্ডা খেলে শ্লেষ্মা বৃদ্ধি হয় বৌমা।
সুবালা দিব্যি উত্তর দেয়, শ্লেষ্মা বৃদ্ধি হয় না হাতী বৃদ্ধি হয়! ও কেবল আপনার নাতিনাতনীদের সোহাগ করা।
ফুলেশ্বরী রেগে উঠে যাচ্ছেতাই করেন না, হেসে উঠে বলেন, তো তাই! তোমার নাতিপুতিকেও তুমি করবে সোহাগ!
আমার বয়ে গেছে—
হুঁ, দেখবো!
সুবালা স্বচ্ছন্দ গলায় বলে, দেখবেন তো সেই স্বর্গে বসে! কী দেখলেন তা নিয়ে কে তর্ক করতে যাবে?
রাগারগি নয়, কড়া কথা নয়, সহজ হাস্য-পরিহাস। আশ্চর্য! সুবালার কী সাহস! সুবৰ্ণলতা তো দুঃসাহসের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু এ সাহসের সঙ্গে তুলনা হয়? সুবৰ্ণলতার সাহস হচ্ছে-তিক্ততার শেষ সীমানায় পৌঁছে তীব্ৰতায় ফেটে পড়া।
আর সুবালার?
সুবালার সাহস আদরিণীর সাহস, বিজয়িনীর সাহস, প্রশ্রয়ের সাহস।
সুবালার শাশুড়ী সুবালার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছেন, কারণ তার বৌমা বোঝে বেশি, জানে বেশি, বৌমার বিবেচনা ভালো।
এ কথা স্বীকার করা মানেই তো তাকে অর্ঘ্য দেওয়া।
সুবালার সংসার সুবালাকে সে অর্ঘ্য দিয়েছে। কারণ শুধু ফুলেশ্বরীই নয়, ফুলেশ্বরীর ছেলেও সেই সমৰ্পিত-প্ৰাণ! ফুলেশ্বরীর ছেলে খাটো ধুতি পরে, খালি পায়ে মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়, কাঁধে করে ধামা বয়ে আনে, আর কথায় কথায় বলে, অত সব বুঝি না বাপু, মুখ্যু চাষা বৈ তো নাই।
তবু সে শহুরে চাষার মত ভাবে না, মেয়েমানুষকে শাসনে না রাখলেই সে মাথায় ওঠে! মেয়েমানুষের জায়গা হচ্ছে জুতোর নিচেয়! ভাবে না, তাই সে প্রতি পদে বলে, মহারাণীর যা ইচ্ছে… তুমি যা বলবে,… যা বোঝো করো।
পূজার মন্ত্রের চাইতে কি কিছু কম এটা?
