হুঁ, দেখুন! আমিও তো তাই বলি, অমৃততুল্য। আহা, যখন জেলের লিপসি খেয়ে দিন কাটবে, তখন আপনার ননদিনীর হাতের এই মৌরল মাছের ঝালের স্মৃতিতে মনটা কেঁদে কেঁদে উঠবে।
থামো তো! সুবালা বকে ওঠে, সব সময় জেল জেল করো না।
আহা, সইয়ে রাখছি। নচেৎ আচমকা ঘায়ে মুর্ছা-টুর্ছা যাবেন।
সুবালা বোঝে সব, তবু বলে, বলি তুমি কি চোর-ডাকাত, না খুনে গুণ্ডা যে জেলে যাবে?
তার থেকে কিছু কমও নয়।
অম্বিকা কড়াই ডাল মাখা ভাতটা শাপ শপ করে মুখে তুলতে তুলতে বলে, বরং বেশি মাতৃভূমিকে মা বলা তো গুণ্ডামির অধিক!
সুবালা বলে, এই হল শুরু। মেজবৌ, তুই শোন বসে বসে। তোর মনের মতন প্রসঙ্গ। আমি বরং ততক্ষণ ওই রাবণের গুষ্টির জলপানিগুলো গোছাই।
সুবৰ্ণ আহত গলায় বলে, ওকি মেজ ঠাকুরবি, নিজের ছেলেদের ওই সব বলতে আছে?
সুবালা হেসে হেসে বলে, সত্যি কথা বলতে দোষ কি? রাবণের গুষ্টি ছাড়া আর কি? ভগবান এক মনে দিয়েছে, আমি একমনে নিয়েছি, গোনাগুণতি করি নি। জ্ঞানচক্ষু হতে দেখি আধ কুড়ির কাছাকাছি!
উঠে চলে যায়।
সত্যিই কাজের তার অবধি নেই।
তাছাড়া সুবর্ণ বসে থাকে বলে স্বস্তি থাকে একটু। বেটা ছেলে একা বসে খাচ্ছে, এটা তো আর হতে পারে না।
সুবালা চলে যায়, অম্বিকা সুবৰ্ণর দিকে তাকিয়ে বলে, এই একটি মহিলা, একেবারে নিৰ্ভেজাল!
সুবৰ্ণ বলে, আপনার মত মানুষের ধারে কাছে থাকতে থাকতে আপনিই বিশুদ্ধ হয়ে যায় মানুষ।
হ্যাঁ, প্ৰবোধের সন্দেহকে করে। এইভাবেই একটা অপর পুরুষে বিমোহিত হচ্ছে সুবর্ণ।
রোদে পোড়া রুক্ষ কালো শীর্ণ একটা ছেলে, তবু তাকে দেখলে সুবর্ণর মনটা আহ্লাদে ভরে ওঠে। তাকে অনেক উঁচু স্তরের মানুষ মনে হয়। মনে হয় কী সুন্দর!
প্ৰশস্তি গাইতে ইচ্ছে করে তার।
অম্বিকা বলে, সেরেছে! পুলিসে ধরে নিয়ে যাবে আপনাকে।
একদিন হঠাৎ বলে বসলো, আচ্ছা, শুনেছি তো আপনার ন বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, আরমনে করবেন না কিছু দাদার শ্বশুর বাড়িটিই যখন আপনার শ্বশুরবাড়ি, তখন সেখানেই স্থিতি, তবে এত সুন্দুকুর কথা লুড়ে খেলুড়ো করে বলুন তো?
সুবৰ্ণ বিমূঢ়ভাবে বলে, সুন্দর করে?
হ্যাঁ, তাই তো দেখি। যা কিছুই বলেন, বেশ বিদুষী-বিদুষী লাগে।
সুবৰ্ণ হেসে উঠে বলে, ওঃ লাগে! যেমন পেতলকেও অনেক সময় সোনা-সোনা লাগে।
অম্বিকা বলে, আপনার মত পেতল যদি আমাদের এই সোনার বাংলার ঘরে ঘরে থাকতো, দেশ উদ্ধার হয়ে যেত, বুঝলেন উদ্ধার হয়ে যেত!
দেশ উদ্ধার!
ব্যস, এই খাতে এসে পড়ে আবেগের বন্যা।
সুবৰ্ণর চোখে এসে যায়। জল, মুখে ফুটে ওঠে। দীপ্তি।
সুবৰ্ণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতে বসে স্বদেশী ছেলেদের কথা। কী তাদের কার্যকলাপ, কী তাদের পদ্ধতি, কী বা তাদের সাফল্য!
অম্বিকা হাসে।
গলা নামিয়ে বলে, এই মেজবৌদি, টিকটিকি পুলিসের মত অত জেরা করবেন না, সব কথার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। দেওয়ালের কান আছে।
সুবৰ্ণ লজ্জিত হয়।
বলে, বড্ড ইচ্ছে করে সব জানি।
তার মানে আপনি অনুভব করেন জিনিসটা। অম্বিকা বলে, বুঝতে পারেন। পরাধীনতার গ্লানি কি! সেটাই আশ্চর্য করে আমাকে।
সুবৰ্ণ উদ্দীপ্ত হয়, বলে, আশ্চর্যের কি আছে? পিরাধীনতার যন্ত্রণা আমরা মেয়েমানুষরা বুঝবো না তো আর কে বুঝবে? আমরা যে চাকরেরও চাকরানী।
রাণী হতে হবে। অম্বিকা জোর দিয়ে বলে, মেয়েদেরও এসে হাত মেলাতে হবে!
নেবেন? নেবেন আপনারা? সুবৰ্ণ আরো উদ্দীপ্ত হয়, মেয়েমানুষকে নিতে রাজী আছেন আপনাদের দলে?
দলে!
অম্বিকা ধীর গলায় বলে, বলে কয়ে টিকিট কেটে দলে নেওয়া তো নয়। মেজবৌদি, যে আসতে পারবে সে এসেই যাবে। বৃষ্টি যখন পড়ে, হাজার হাজার গাছের একটা পাতাও শুকনো থাকে না, কিন্তু পাতা ধরে ধরে ভেজাতে গেলে?… দেশ জাগবে, মেয়েদের মধ্যে আসবে সেই প্ৰবল প্রেরণা, আপনিই দলে এসে পড়বে। করছে বৈকি, অনেক মেয়েই দেশের কাজ করছে—কিন্তু থাক। এ আলোচনা।
সুবৰ্ণ হতাশ গলায় বলে, আলোচনাটুকুও যদি করতে নেই তো কি করে এগিয়ে যাবে মেয়েরা? আমি যদি আজ বলি সে প্রেরণা আছে আমার-
অম্বিকা আরো আস্তে বলে, বুঝতে পারছি। অনুভব করছি আছে, কিন্তু আপনার পক্ষে অসম্ভব। আপনার ছেলেমেয়ে রয়েছে-
সুবৰ্ণ হতাশ গলায় বলে, জানি, জানতাম! আমার যে সব দিক থেকে হাত-পা বাধা তা জানি!
অম্বিকা ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকায়।
তারপর সহসাই হেসে উঠে বলে, আপনাকে দলে নিই, আর আমাদের মেজদা পুলিস লেলিয়ে দিয়ে আমাদের জন্যে ফাঁসির ব্যবস্থা করুন। ওনাকে তো দেখেই ভয় করছিল।
সুবৰ্ণ ব্যঙ্গ হাসি হাসে।
বলে, কেন? খুব তো সুকান্তি সুপুরুষ!
সে কথা কোনো কাজের কথা নয়, অম্বিকা বলে, বাইরে ভেতরে এক, এ আর কজনের হয়? আমাদের সঙ্গে একটা ছেলে আছে, তাকে দেখলে মনে হবে দাঁড়কাক, কিন্তু তার ভিতরটা চাঁদের মত সাদা সুন্দর!
সুবৰ্ণ খপ করে বলে বসে, আচ্ছা, আমাকে দেখলে আপনার কী মনে হয়? বাইরে ভিতরে দুরকম?
অম্বিকা মাথা নিচু করে বলে, আপনার মত মেয়ে আমি আর দেখি নি মেজবৌদি। শুধু এই ভেবে দুঃখ হয়, আমাদের দেশের কত সম্পদের অপচয় হচ্ছে সর্বদা। আপনি যদি দেশের কাজে আসতে পারতেন–
সুবৰ্ণ অভিমানে ফেটে পড়া মুখে বলে, ওসব আপনার মৌখিক কথা। এক কথায় তো নাকচ করে দিলাম। যার ছেলেমেয়ে ঘরসংসার আছে, সে একেবারে পতিত হয়ে গেছে, এই তো কথা!
এভাবে সাড়া দিতে হলে যে সর্বস্ব পণ করতে হয়। মেজবৌদি, সর্বস্ব ত্যাগ করতে হয়।
