যে বাড়ির দেওয়াল চারখানা চাঁপার মার কাছে জেলখানার দেওয়ালের মত লাগে, সে বাড়ির ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায় চাঁপার মন।… আর সকাল থেকে রাত অবধি যেখানে যা কিছু হয় সব মনে পড়ে যায়। বাবা জ্যাঠা কাকারা কে কি করেন, কখন খাওয়া হয়, কখন শোওয়া হয়। তাছাড়া সক্কালবেলায় মাথায় বড় একটা হাঁড়ি নিয়ে যে লোকটা গলির মধ্যে এসে হেকে যায়-মুড়ির চাকতি, ছোলার চা-কতি-সে লোকটার গলার আওয়াজ যেন এখান থেকেই কানে এসে বাজে।… কাজন বাজে চাই কুলপী।… মা—লাই কুলপী! কানো বাজে চুড়িউলির চুড়ি চা-ই চুড়ি! আতা চাই আতা, টেঁপারি, টোপাকুল, নারকুলে কু-ল?
চলছেই তো সারাদিন।
এখানেও শব্দের অবধি নেই। সে কেবল ঘণ্টা-কাঁসরের শব্দ।
ঠাকুর জাগছেন, ঠাকুর খাচ্ছেন, ঠাকুর ঘুমোচ্ছেন, ঠাকুর সাজছেন, সব কাঁসর পিটিয়ে পিটিয়ে জানানো! বাবাঃ! এই ঠাকুরের দেশে আর থাকতে সাধ নেই।.. ঢের ভালো ওই বহুবিধ শব্দতরঙ্গে তরঙ্গায়িত কলকাতা!… এখানে একটা গাড়ির শব্দ শুনতে পাওয়া যায় না—আশ্চৰ্য্য!…
এখানে পয়সা হাতে দিয়েই কী বলবেন ঠাকুমা?
পেন্নাম কর! পয়সাটা ওই থালায় ছুঁড়ে দে!
দূর!
অথচ ওখানে একটা পয়সা পেলে কত কী করা যায়! ডবল পয়সা পেলে তো কথাই নেই। আধলা একটা ঘরের মেঝোয় কুড়িয়ে পেলেও তা দিয়ে দুখানা মুড়ির চাকতি কিনে ফেলা যায়।
মা মোটেই পয়সা হাতে দিতে চায় না। আঁচলে পয়সার পুটলি নিয়ে বেড়ায়, তবু একটা পয়সা চাইলে দেবে না। চাইলেই বলবে, কী চাই শুনি? কি কিনতে হবে?
কি কিনতে হবে তা কি ঠিক থাকে? পয়সাটাই আসল। ওটা পেলেই কত কীই কেনা চলে। কিন্তু তা হবে না। বলতে হবে। অগত্যাই যা হোক একটা কিছু বলে ফেলতে হয়। পেয়ারা কি আতা, ঝালবিস্কুট কি তিলকুট!
ব্যস, গুষ্টির যে যেখানে আছে, মা সবাইয়ের জন্যে কিনতে বসবেন। এতে কি রোজ রোজ আবদার করা যায়? চাঁপার বাবার যে বেশী পয়সা, তার জন্যে আলাদা কোন সুখ নেই চাঁপার! অথচ বাবাদের ওই হেমা মাসী? তাদের বাড়িতে নাকি তাঁর বড় ছেলের ছেলেমেয়েরা মুড়ি খায়, আর ছোট ছেলের ছেলেমেয়েরা পরোটা খায়!
কেন?
ওই পয়সা কম বেশি বলেই।
মার সামনে বল দেখি ওসব কথা, খুন করবে!
চুড়িউলি এলে সবাই চুড়ি পরবে, মা দাম দেবে। কিন্তু চাঁপা একটু বেশি পরতে যাক দিকি? নয়তো রেশমী চুড়ি পরতে যাক? হবে না! পারলে সবাই পরবে।… তা এখন তো চুড়ি পরাও ঘুচেছে। চুড়ি নাকি বিলিতি! কে জানে বাবা!
তা বাবা দেয় পয়সা। লুকিয়ে দিয়ে বলে, খবরদার, তোদের মাকে দেখাস নে।
কিন্তু লুকিয়ে কিনে লুকিয়ে খাওয়া কী কম গেরো?
তবু আঁচলে দু-একটা পয়সা থাকলেই মনটা কি ভরাট থাকে! আর রাস্তা দিয়ে যখন ওলারা হেঁকে যায়, কী আহ্লাদ হয়!… আর হাকছেই তো চব্বিশ ঘণ্টা!.. সেই কলকাতাকে কিনা বলে খারাপ?
সন্ধ্যে হয়ে আসছিল।
নারকেলপাতায় ঝিরঝিরিনিটা যেন জমাট জমাট দেখাচ্ছে। নিচে নামবার জন্যে উঠে পড়ে চাঁপা…মনে পড়ে যায় কলকাতায় এ সময় রাস্তার গ্যাসবাতি জ্বালনেওয়ালারা মই ঘাড়ে করে বেরিয়ে পড়ে।
চাঁপাদের গলির বাঁকে একটা গ্যাস আছে, লোকটাকে চাঁপাদের মুখস্থ হয়ে গেছে। বাতিওলা চলে যেতে না যেতেই ফুলওলার আওয়াজ পাওয়া যায়। গলিতে ঢোকে না, বড় রাস্তা থেকেই আওয়াজ আসে, চাই বেলফুল।… চাই কে—য়া ফুল!
ছোট খুড়ি কেয়াফুলের ধুলোগুলো দিয়ে কেয়া খয়ের বানায়। বাবাদের তাশের আডার লোকেরা বলে, আপনাদের বাড়ির পানটি ভালো!
যে কথাটাই মনে পড়ে যায়, প্ৰাণটা হু-হু করে ওঠে।
কলকাতা আর কলকাতার ওই বাড়িটা যেন চাঁপাকে লক্ষ বাহু দিয়ে টানতে থাকে।
আর এই আশঙ্কাটা এযাবৎ যেন চোখের সামনে একটি রঙিন ফুলের মত দুলছিল।
ইদানীং ঠাকুমাকে প্রায়ই লোকে বলতে শুরু করেছে, আর কি, চাঁপা-মল্লিকা তো দিব্যি বিয়ের যুগ্য হল, এবার নাতজামাই খোজো?
ঠাকুমাও অনুকূল একটা জবাব দিচ্ছেন। কাজেই অদূর ভবিষ্যতেই যে সেই দিনটি আসছে তা বুঝতে পারছে চাপা। আর সেই বুঝতে পারার আশেপাশে ঝলসে উঠছে নতুন গহনা, জরির শাড়ি, মালচন্দন, লোকজন, ডাক-হাঁকি, ঘটপটা।
টোপর পরা একটা ছেলেও আছে বৈকি এই সমারোহের কোনো একখানে।… কাজেই সবটা মিলিয়ে ওই একটি রঙিন ফুলই।
কিন্তু আজ, ঠিক এই মুহূর্তে ফুল উধাও হল। একটা বুনো জন্তু যেন হাঁ করে এল।
বিয়ে হওয়া মানেই তো ওই বাড়ি থেকে চলে যাওয়া। হয়তো বা কলকাতা থেকেও? কত মেয়েরই তো বিয়ে দেখছে চাঁপা, কই, কলকাতায় কোথা? অতএব চাঁপার ধরে নিতে হবে, কলকাতা থেকে বিতাড়ন!
হঠাৎ যেন ড়ুকরে। কান্না পায় চাঁপার।
যেন এখনই কলকাতা থেকে নির্বাসন ঘটে গেছে তার।
তা যাওয়াই।
আর বড় জোর ছ মাস এক বছর।
তার বয়সী কত মেয়েরই তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।
হায় হায়, কেনই বা বিয়েটাকে ভাল মনে হত তার!
আচ্ছা, যদিই বা কলকাতাতেই বিয়ে হয় তার ছোট পিসির মত, কিন্তু পড়তে তো হবে একটি দজ্জাল শাশুড়ীর হাতে, তার ঠাকুমার মত। পিসির শাশুড়ী কেমন চাপা জানে না, মা খুড়ির শাশুড়ীকেই দেখে আসছে জীবনভর। কাজেই শাশুড়ী শব্দটার সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তকেশীর মুখটাই ভেসে ওঠে। বলা বাহুল্য, তাতে বুকে খুব একটা বল আসে না।
সন্ধ্যার ছায়া মনে নিয়ে নিচে নেমে আসতে আসতে আরো একটা কথা মনটাকে তোলপাড় করে তোলে চাঁপার।
চাঁপার মার নাকি ন বছরে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তার মানে চাঁপার বয়েস থেকে দু বছর আগে। আর মা বেচারীকে এসে পড়তে হয়েছিল। ঠাকুমার মত শাশুড়ীর হাতে!
