মনটা সর্বদাই দুঃখু-দুঃখু লাগে।
তাছাড়া শুধু কলকাতার জন্যেও যেন মন-কেমন করে। কলকাতার বাড়ি, কলকাতার রাস্তা, মামীঠাকুমার বাড়ি, গঙ্গার ঘাট, যা মনে করে তাতেই প্ৰাণ হুঁ-হুঁ করে ওঠে!
কলকাতায় যে কী আছে তা বলতে পারবে না চাপা, তবু যেন মনে হয় কত কী আছে!
আরো কষ্ট হয়েছে চাঁপার-ওই নতুন আসা লোকগুলোর মধ্যে একটা যে ছেলে এসেছে তার ব্যবহারে। গুরুর শ্বশুরবাড়ির কে যেন। শ্ৰীীরামপুর থেকে এসেছে। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ আছে খুব, কিন্তু কলকাতার নিন্দে ছাড়া কথা নেই মুখে!
কতই বা বয়েস?
চাঁপার থেকে ছোট হবে তো বড় হবে না, কিন্তু কী পাকা পাকা কথা! চাঁপা-মল্লিকাকে সবাই পাকা মেয়ে বলে, আর এই ছেলেটা কী?
মুখে মুখে আবার ছড়া বলে!
আর চেনা নেই জানা নেই, তুই!
খোঁচা খোঁচা চুল, মোটা মোটা পা, বেঁটে বেঁটে গড়ন—দেখলে গা জ্বলে যায়! আর সেইটা বুঝতে পারে বলেই উৎখাত করে চাঁপাকে, তোমাদের কলকাতায় আছে কি? কিছু না। খালি কায়দা আর কল! কাল আর কেতা, এই দুই নিয়ে কলকেতা! কেতা মানে জানিস? কেতা মানে কায়দা। কলকোত্তাই বাবুদের আছে শুধু কায়দা!
চাঁপাও অবশ্য নীরব থাকে না, রেগে উঠে বলে, থাকবেই তো কায়দা। যত সায়েবদের আপিস কলকাতায় না? লাটসায়েবের বাড়ি কলকাতায় না?
হি-হি করে হাসে ঘণ্টু।
বলে, তবে তো সবাই লাট, কি বলিস? তোর বাবা লাট, তোর কাকা লাট।
চাপা ক্রুদ্ধ গলায় বলে, এই, তুই আমার বাবা তুলে কথা বলছিস? বলে দেব?
ঘণ্টু কিন্তু রাগের ধার দিয়ে যায় না; বলে, দে না বলে! আমি বলবো, বাবার নাম করলেই বুঝি বাবা তোলা হয়? তাহলে তো ওকে ওর বাবার নাম জিজ্ঞেস করাও চলবে না।
মুখরা চাঁপা নিষ্প্রভ হয়ে যায়।
এবং বোকার মতই রাগে, তা কালকেতাকেই বা নিন্দে করবি কেন?
করবো! নিন্দের যুগ্যি তাই নিন্দে করবো!
নিন্দের যুগ্যি?
নিশ—চয়।
তা হলে তোদের শ্রীরামপুরও খুব বিচ্ছিরী! যত ইচ্ছে নিন্দে করবো!
ঘণ্টু চোখ পিটপিটয়ে হাসে। বলে, কর। দেখি কি নিন্দের কথা বার করতে পারিস!
চাপা অবশ্য পারে না।
কারণ শ্রীরামপুর নামটা শুনেছে সে এই ঘণ্টুদের দৌলতেই। কোথায় সেই পরমধাম, কী তার গুণাগুণ কিছুই জানে না। তাই বিপন্ন হয় চাপা।
ঘণ্টু পরিতুষ্ট মুখে বলে, পারলি না তো? পারবি কোথা থেকে? দোষ থাকলে তো? কলকেতা? হিহিহি!
কলকোত্তাই বাবু
এক ছটাকে কাবু!
কোঁচার বুলি লম্বমান,
উদর ফাঁকা মুখে পান।
আশ্চর্য, ওইটুকু ছেলে, মুখস্থও করেছে এত!
নিৰ্ঘাত ওদের বাড়িটা ঘোরতর কলকাতা-বিদ্বেষী, রাতদিন এরই চাষ চলে। চাঁপার এত হাতিয়ার নেই, ওর সম্বল শুধু রাগ। সেই সম্বলেই লড়তে আসে সে, আর তোদের শ্রীরামপুরে বুঝি কেউ পান খায় না?
খাবে না কেন? ভরা পেটে খায়।
কলকাতার লোক ভাত খায় না?
ঘণ্টু গম্ভীরভাবে বলে, সে গরীব-দুঃখীরা খায়। বাবুরা খায় শুধু চপ কাটলেট আর মদ!
মদ!
চাঁপার চোখ গোল হয়ে যায়।
চাঁপার মুখ লাল হয়ে ওঠে, মদ খায়! তার মানে আমরা মদ খাই?
তোরা? হি হি হি, তোরা কি বাবু? তোরা তো মেয়েমানুষ। হচ্ছে বাবুদের কথা। শুনবি আরো? চড়েন। বাবু জুড়ি গাড়ি, চেনেন খালি শুড়ির বাড়ি! শুড়ির বাড়ি মানে জানিস?
জানবে না কেন, কী না জানে চাপা? রাতদিন তো শুনছে। এসব। নিজেরাই ঝগড়ার সময় বলে, শুড়ির সাক্ষী মাতালা! কিন্তু সত্যি মানে ভেবে বলে নাকি? অথচ এই পাজী ঘণ্টুটা!
কক্ষণো তুই কলকাতার নিন্দে করবি না বলছি, চাপা অগ্নিমূর্তি হয়।
ঘণ্টু নির্বিকার।
ঘণ্টু নিৰ্ভয়।
ঘণ্টুর এই মেয়েটাকে ক্ষ্যাপানোই আপাতত শৌখিন খেলা। আর খেলোটাকে সে নির্দোষই ভাবে। তাই ঘণ্টু হঠাৎ তারস্বরে বলে ওঠে, আচ্ছা করবো না নিন্দে, বল তবে একটা ধান গাছে কখানা তক্তা হয়?
চাঁপা ক্ষোভে দুঃখে উঠে যায়।
ঘণ্টু মহোৎসাহে চেঁচায়, কলকেতার বিবিদের ছড়াটা শুনে গেলি না?
চাপা গিয়ে কেঁদে পড়ে, ঠাকুমা, ওই ঘণ্টুটা যা ইচ্ছে বলছে! বলছে কলকাতা ছাই-বিচ্ছিরি! থাকবো না। আর আমি!
মুক্তকেশীর অজানা নয় ব্যাপারটা, তাই ব্যাজার মুখে বলেন, ও ক্ষ্যাপাচ্ছে বলেই তুই ক্ষেপবি? বাড়িতে তো খুব দুদে, এখানে একেবারে কচি খুঁকি হয়ে গেলি যে!
গুরুকন্যা বলে ওঠেন, যা বলেছ মুক্তদি, নাতনীর তো তোমার বিয়ের বয়েস বয়ে যায়, কী ন্যাক বাবা! ঘণ্টু কি একটা মানুষ, তাই ওর কথায় ক্ষেপছে!
মুক্তকেশী আড়ালে গিয়ে চাপা গলায় বলেন, নেকি, তুমি রাতদিন ওই দস্যি ছোঁড়ার সঙ্গে মেশই বা কেন? ওসব হচ্ছে পাজীর পা-ঝাড়া! খবরদার ঘণ্টুর সঙ্গে মিশবি না।
চাপা কেঁদে ফেলে।
কলকাতার দুঁদে চাঁপার সব মর্যাদা ঘোচে। বলে, আমি কি মিশতে যাই? ওই তো আসে সোধে সোধে!
তা হোক। তুই আমার কাছে কাছে থাকিবি।
তোমার কাছে? তুমি যেন বড্ড থাকো? রাতদিন তো রাস্তায়। তার থেকে চলে যাই চল।
চলে যাই বললেই তো হয় না? তোর বাপ-জ্যাঠা হুকুম দেবে, তবে তো?
চাঁপা অতএব এদের ছাতে উঠে কাঁদতে বসে।
কলকাতার নিন্দেয় তার এমন জ্বালাই বা করে কেন? কলকাতার কথা মনে পড়লেই বা প্ৰাণের মধ্যে এমন হুঁ-হুঁ করে ওঠে কেন?
ছাতে নির্জনে বেশিক্ষণ বসা যায় না, বেলা পড়ে গেলেই গা ছমছম করে, আর দুপুরবেলা বুক টিপটিপ করে।
তবু আসে একবার একবার।
আলসের ধারেই একটা নারকেল গাছ, তার পাতাগুলো ঝিরবির করে, সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চাঁপার মনটা হারিয়ে যায়।..
