অবিশ্যি চাপাও ও-দোষে দোষী।
পুতুলের বাক্স তার প্রাণ। কেউ হাত দিলে বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে না পড়ে পারে না। কিন্তু চাঁপা তো। ঢং করে বলতে যায় নি, ভাই-বোনের জন্যে মন-কেমন করছে!
মন-কেমন! রাতদিন যাদের বলছে মর মর, এক্ষুনি মীর লক্ষ্মীছাড়ারা! যমের বাড়ি যা, নিমতলার ঘাটে যা! তোরা মলে আমি হরির লুট দিই! তাদের জন্যে মন-কেমন! ন্যাকামি! চালাকি! শেষ অবধি ওর মা কিছু লোভটোভ দেখিয়ে কি ঘুষঘাষ দিয়ে মেয়েকে ফাঁদে ফেলেছে। জানে তো মেয়ে নইলে চলবে না!
বিয়ে হয়ে গেলে করবে কি?
তখন তো চালাতেই হবে!
মাঝখান থেকে চাঁপারই ঘোরতর কষ্ট!
তুলের বাক্সটা এনেছে চাঁপা, কিন্তু খেলার সঙ্গিনীই যে ভাগল্বা! মল্লিকার এই বিশ্বাসঘাতকতায় হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছিল চাঁপার। তবু প্ৰথম দুচার দিন ঠাকুমার সঙ্গে মন্দিরে মন্দিরে ঠাকুর দেখে বেড়িয়ে, গঙ্গায় নেয়ে এবং ঠাকুমার গুরুবাড়ির সংসারযাত্রার নতুনত্ব দেখে একরকম ভালই কাটছিল, ঠাকুমাও মেয়েটা একা পড়েছে বলে একটু হৃদয়বত্তার পরিচয় দিচ্ছিলেন। কিন্তু সে অবস্থা আর থাকল না।
গুরুর নিজেরই মেয়েজামাই, নাতিনাতনী আর শ্বশুরবাড়ির দিকে কে সব এসে হাজির হল, কে জানে কী উপলক্ষে! তবে সেই উপলক্ষে চাপা মুক্তকেশীর আদর ঘুচিলো।
ঘরের অকুলান হওয়ায় দালানের চৌকিতে শুতে হল। ঠাকুমা-নাতনীকে, এবং গুরুমার ব্যাজার ব্যাজার ভাব যেন সর্বদাই স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল, তোমরা এখন অবান্তর। প্রশ্ন করতে লাগল, আর কতদিন?
অন্য কোথাও এ ভাব দেখলে নিৰ্ঘাত মুক্তকেশী পুঁটলি-বোঁচকা গুটিয়ে চলে যেতেন। কিন্তু জায়গাটা গুরুবাড়ি, দীনহীন হয়ে থাকাই নিয়ম। তাই মুক্তকেশী গুরুমার কাজের সাহায্য করেন, গঙ্গাজল বয়ে এনে দিয়ে মন রাখতে চেষ্টা করেন।
কিন্তু চাঁপার মন কে রাখবে?
মুক্তকেশী ওদিকে যতই আহত হন, ততই এদিকে ঝাল ঝাড়েন। উঠতে বসতে আপদ, বালাই, পায়ের বেড়ি, ঘাড়ের বোঝা ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করতে থাকেন নাতনীকে। নাতনীর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাটি মনঃপূত না হলে নাতনীকেই টিপে টিপে গঞ্জনা দেন এবং বলতে থাকেন, নিরিমিষ্যি মুখে রুচিছে না! সাহেবের গিন্নী হবেন! কত ভাগ্যে নারায়ণের অনুপেসাদ জোটে তা জানিস হারামজাদি?
বলা বাহুল্য, গুরুমার কানেই যায় কথাটা। কিন্তু নিরিমিষের কষ্ট পূরণ করতে এখন আর দুধ টুকু, দইটুকু, আচারটুকু, আমসত্ত্বটুকু পাতে পড়ে না। নারায়ণের বালভোগের জোড়া মণ্ডটি তো গুরুর ছোট নাতির একচেটি হয়ে গেল। অথচ প্রথম দিকে গুরুদের পূজো করে উঠে এসেই মেয়ে কই? মেয়ে কই? করে ডেকে ডেকে ওই মণ্ডটি হাতে দিতেন চাঁপার।
কিন্তু তাঁকেও দোষ দেওয়া যায় না।
চাঁপা একটা বুড়ো মেয়ে, ছোট্ট কেউ বাড়িতে নেই বলেই আদর জুটছিল তার। নাতি এল একটা, তিন-চার বছরের শিশু, আদরটা স্বভাবতই তার দিকে গড়াবে। আর নিজের নাতি এবং যজমানের নাতনীতে আদরের পার্থক্য থাকবে না, এ আবার হয় নাকি? সংসারত্যাগী যোগী গুরু নয়, ঘরসংসারী গৃহী গুরু। যজমান-ঘর বিস্তর, তাই অবস্থা ভাল। আর সেই জন্যেই যজমানরা নবদ্বীপ এলে ওঠে ওঁর কাছে। আদর্যযন্ত্বও পায়।
কিন্তু সে তো আর অনির্দিষ্ট কালের জন্যে নয়, ব্যাজার আসাই স্বাভাবিক।
ব্যাজার আসাই স্বাভাবিক, এটা মনে মনে হৃদয়ঙ্গম করেন মুক্তকেশী, তাতেই মেজাজ আরো খাপ্পা হয়। এবং সেই মেজাজটা চাঁপার উপরই পড়ে।
প্রথম প্রথম এখানে ঠাকুমার ভক্তিবিগলিত নম্র মূর্তি দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিল চাঁপা, কারণ ঠাকুমার এ মূর্তি তাদের কাছে অভূতপূর্ব। কিন্তু ভাগ্যে সাইল না। এখন ঠাকুমা উঠতে বসতে চাঁপাকে খিচোচ্ছেন। হয়তো নিরুপায়তার প্রকাশই এই। অধস্তনের উপর বীরত্ব ফলানো।
তাই পুরুষজাতি যখন দরবারে না মুখ পায়, তখন ঘরে এসে বৌ ঠ্যাঙায়।
চাঁপা এত মনস্তত্ত্ব বোঝে না, চাপা ঠাকুমার ভর্ৎসনায় মর্মাহত হয়। এবং তেমন দুঃখময় মুহূর্তে বলেও বসে, কেন আনলে আমাকে? মল্লির মতন মায়ের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেই হত?
তখন আবার আর এক হাত নেন মুক্তকেশী।
নিঃসঙ্গ চাপা অতএব বড়ই মনঃকষ্টে আছে। এখন ওর সর্বদাই মনে হয়, মা বকলেও এমন নিষ্ঠুরের মত বকে না। মা ঠাকুমার মতন এমন বিতিকিচ্ছিরী করে চুল বেঁধে দেয় না, মার কাছে থাকলে কখন কি পরতে হবে ভাবতে হয় না। ভাবতে হয় না। জ্যাকেট কাপড় শুকলো কিনা, ভিজেগুলো সময়ে মেলা হল কিনা।
গুরুমার মেয়ে আবার খুব সরেশ।
চাঁপা যে কিছু কাজ জানে না, সেটা ইতিপূর্বে ধরা পড়ে নি, ধরা পড়লো ওই মেয়ের চোখে। দুদিন না যেতেই সে বলে বসলো, নাতনী যে তোমার কুটো ভেঙে দুটো করতে শেখে নি মুক্তদি! শ্বশুরঘরে যেতে হবে না?
বাবার শিষ্য, অতএব দিদি!
আর বয়েস যাই হোক, তুমি!
মুক্তকেশী নিজের সাফাই গাইতে তাঁর মেজবৌমার গুণকীর্তন করেন, এবং ওই বেঁটির জন্যেই যে তাঁর নাতি-নাতনীকে সনাতন হিন্দুধর্মে তালিম দিতে পারেন নি, সে কথা ঘোষণা করেন।
চাঁপার মাতৃভক্তির খ্যাতি নেই, নিজেরা যখন জাঠতুতো পিসতুতো বোনেরা একত্র হয়, তখন চাঁপা মাতৃনিন্দায় পঞ্চমুখ হয়, কিন্তু নিতান্ত পরের সামনে এসব কথা ভালো লাগে না তার। তাছাড়া মার কাছ থেকে দূরে এসে কেমন যেন অসহায়-অসহায় লাগে নিজেকে।
কেউ কোথাও যেন নেই চাপোর—এমনি মনে হয়। বাড়িতে তো ঠাকুমাই ছিল পৃষ্ঠবল, এখানে কেন তেমন মনে হয় না কে জানে!
