প্লেগ।
আবার প্লেগ! যে প্লেগ ক-বছর যেন আগে শশান করতে বসেছিল দেশটাকে!
কলেরা, বসন্ত তবু ভালো। কিন্তু প্লেগ?
ওরে বাবা, সাক্ষাৎ যম!
পালাও পালাও।
যে যেখানে পারো পালাও! দক্ষিণের লোক উত্তরে এসো, পুবের লোক পশ্চিমে। চললো সেই
কলকাতার বাইরে যেখানে যত লোক আছে, তাদের বাড়ি ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। আগত আগন্তুকে। যাবেই তো।
প্লেগ থেকে রক্ষা পেতে যে সব অসহায় আত্মীয় ছুটে এসে পড়েছে, তাদের তাড়িয়ে দেবে কী করে তারা?
সব বৌরাই বাপের বাড়ি কি মাসীর বাড়ি, নিদেনপক্ষে পিসির বাড়িও ছুটেছে।… শুধু সুবৰ্ণলতার ব্যাপার আলাদা।
সুবৰ্ণলতার বাপের বাড়ি নেই। বাপের গুষ্টির কেউ নেই ঠাঁই দেবার।
তবে?
সুবৰ্ণলতা কোথায় গিয়ে রক্ষা পাবে?
সুবৰ্ণলতার শাশুড়ী পর্যন্ত নবদ্বীপে গুরুপাটে গিয়ে উঠেছেন। চাপা তার সঙ্গে যাবে কিন্তু সুবৰ্ণলতা আর তার ন্যানজারি। কটা?
সুবৰ্ণলতা বলল, আমি মরব না, এ প্রমাণ তো হয়ে গেছে, প্লেগ আবার কী করবে। আমার?
কিন্তু সেটা তো কাজের কথা নয়।
পুরুষেরা যে কোনো মুহূর্তে পালাতে পারে, শহরের অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠলে পালাবেও। অফিস-কাছারিও তো খোলা থাকবে না। আর বেশিদিন, তালা পড়ল বলে। স্কুলগুলো তো বন্ধ হয়েই যাচ্ছে। ইঁদুর দেখলেই মারার বদলে, দেখামাত্রই মরে যাচ্ছে লোকে।
তা সেই অবস্থায় তুমি লক্ষ্মীছাড়া মেয়েমানুষ কোলে কাঁধে পাঁচটা আর জঠরের অভ্যন্তরে একটা আপোগণ্ড নিয়ে পুরুষদের পায়ে বেড়ি হয়ে বসে থাকবে? তুমি তো বলছি তোমার ছেলেদের অন্য কারো সঙ্গে পাঠিয়ে দাও! কে নেবে ভার?
বলে নিজের ভারেই অস্থির লোকে!
ওদের নিয়েই মরতে চাও?
বটে! ওরা তোমার খাস তালুকের প্রজা! তাই মারতে ইচ্ছে হলে মারবো! ওদের বাঁচাবার দুইড্রোমায় চলে যেতে হবে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে যেখানে এই রাক্ষসী মহামারীর থাবা C
কিন্তু কোথায় সেই জায়গা?
সহসা সুবর্ণর ভাসুর সুবোধচন্দ্ৰ বাতলে দিল সেই জায়গা।
চাঁপতা!
সুবালার বাড়ি।
সম্প্রতি দেখে এসেছে সুবোধ, দেখেছে দৈন্যের মধ্যেও সুখের সংসার সুবালার। গোয়ালে গরু, পুকুরে মাছ, বাগানে তরকারি, ক্ষেতে ধান।
তবে দৈন্যটা কোথায়?
দৈন্যটা নগদ টাকায়। তবু মনে দৈন্য নেই সুবালার আর তার বরের। এই তো মা-ভাই সাতজন্মে। খোঁজ নেয় না, একবার অসুখ শুনে ভাই একটু দেখতে গিয়েছিল বলে যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে।
কী যত্ন! কী আদর!
সুবৰ্ণকে অনাদর পেতে হবে না।
যে মানিনী উনি, যেখানে সেখানে থাকতে পারবেন না তো।
তাই তো প্রকাশের বৌয়ের সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়িতে যাবার কথা হয়েছিল একবার, সুবর্ণ হলো রাজী?
এই বেশ।
এই ঠিক জায়গা।
সুবোধচন্দ্র নিজেই হঠাৎ হাল ধরলো।
রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে নেপথ্যের উদ্দেশ্যে বলল, মেজবৌমা, আমার ইচ্ছে নয়। তুমি এই মড়কের সময় এখানে থাকো, সুবালার কাছে গিয়ে থাক দু-দশদিন।
একটা ছেলে ঘর থকে বলে ওঠে, জেঠাবাবু, মা বলছে, সবাই চলে গেলে আপনাদের রোধে দেবে কে?
সুবোধ হেসে উঠে বলে, ও হরি, এই কথা! সে যা হয় হবে। বামুনদের ছেলে দুটো ফুটিয়ে নিয়ে খেতে পারা যাবে না? তাছাড়া আমরাই বা আর কদিন? এ শহরে যা অবস্থা হয়ে উঠছে ক্ৰমশ…যাক, ওই কথাই থাকল।
ছেলেটা বলল, আচ্ছা জেঠাবাবু, তুমি যা বলছি তাই হবে।
তাই হবে!
সুবৰ্ণ বলছে তাই হবে!
অবাক কথা বৈকি!
তবু রীতিমত স্বস্তির কথা।
সবাইকে স্বস্তি দিয়ে সুবর্ণ তার প্রায় অপরিচিত ননদের বাড়ি যাত্রা করে মড়কের হাত থেকে বাঁচতে।
মরার জন্যেই যার আজীবন আকিঞ্চন।
কেউ বোধ হয় ছুটে গিয়ে খবর দিয়ে এসেছে, সুবালা ভিজে শাড়ি সপসপিয়ে জলভর্তি ঘড়াটা কাখে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এক মিনিটে এসে হাজির।
দুম করে ঘাড়াটা দাওয়ায় বসিয়ে সেই ভিজে কাপড়েই একটা পেন্নাম ঠুকে উল্লসিত স্বরে বলে ওঠে, মেজদা গো, তোমাদের কলকেতায় পেলেগ। এসেছিল, তাই না। এই কাঠকুড়ুনীর কুঁড়োয় মহারাণীর পদধূলি পড়লো!
সুবৰ্ণ তার বয়সে বড় মান্যে ছোট ননদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। দেখল ব্যঙ্গ নয়, কৌতুক। হুল নয়, মধু।
মনটা জুড়িয়ে গেল।
চোখ জুড়োচ্ছিল রেলগাড়িতে উঠে পর্যন্ত। এই গ্রামে নেমে পর্যন্ত। গরুর গাড়িতে আসতে হয়েছে খানিকটা, সেও তো পরম লাভ। সুবৰ্ণ তো যতক্ষণ তাদের গলি ছেড়েছে, ততক্ষণ ওই কথাই ভেবেছে।
ভাগ্যিস কলকাতায় প্লেগ এসেছিল!
কে বলতে পারে, সেই ভয়ঙ্কররূপী সুখদাতা না এলে সুবর্ণর জীবনে কখনো আর রেলগাড়ি চড়া হতো। কিনা।
হয়তো হতো না।
অতএব গ্রাম দেখাও হতো না। আর কখনো।
কিন্তু সুবর্ণ কি কখনো গ্রাম দেখে নি?
দেখেছে বৈকি।
সেই তার পিতৃভূমি বারুইপুর গ্রাম।
সেও এমনি ছায়া-সুশ্যামল নিভৃতে শীতল বাংলার পল্লীগ্রাম। কিন্তু সুবর্ণর স্মৃতিতে সে ছায়া কেবল অন্ধকার। সে শ্যামলিমায় দাবদাহ। হায়, সুবর্ণ যদি সেবার গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবার সঙ্গে ঠাকুমার কাছে যাব বলে না নাচতো!
সুবৰ্ণর দেখা গ্রামের স্মৃতিতে সুবর্ণর জীবনের অভিশাপ জড়িত, তবু এই মাঠ পুকুর ফল বাগান, ছোট ছোট ঝোঁপঝাড়, সব কিছু তার সবুজের সমারোহ। আর শীতলতার স্পর্শ নিয়ে সুবৰ্ণকে যেন মায়ের মেহের স্বাদ যোগাচ্ছিল।
খাস কলকাতার বৌ না হয়ে সুবর্ণ যদি এরকম এক গ্রামের বৌ হতো!
গরুর গাড়িতে আসতে আসতে বলেও ফেলেছিল সুবৰ্ণ সে কথা।
আমার যদি এরকম একটা পাড়াগায়ে শ্বশুরবাড়ি হতো!
