মেজবৌমার বাপের বাড়ি বস্তুটা যে কোন পর্যায়ে আছে, সেটা পাড়ার কারোরই অবিদিত নেই, তবু ও ছাড়া আর কিছুও মনে পড়ে না মহিলাটির।
সুবৰ্ণ এবার কথা কয়।
স্থির গলায় বলে, না।
তা হলে?
বোকা হলেও চন্ননটা ইদানীং খুব কথা শিখেছে, সে ঘুম-চোখেও বলে ওঠে, মামীঠাকুমার বাড়ি সিনী ছিল, তাই নেমন্তন গিয়েছিলাম–
মামীঠাকুমার বাড়ি? বসাক-গৃহিণী ক্রমশই কৌতূহলোক্রান্ত হন, তোরা একা গিছলি? আর কেউ যায় নি? ঠাকুমা?
না। মেয়েটার চোখের ঘুম ছেড়ে আসে, বলে, না, মামীঠাকুমা যে মকদ্দমায় জিতেছে, ঠাকুমা যাবে কেন?
বসাক-গৃহিণীর আর ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করতে দেরি হয় না, কারণ মুক্তকেশীর ওই ভাঁজ বনাম ভাইপোর মামলা জানতে কারো বাকী নেই। সাত বছর চলছিল।
বসাক-গৃহিণী বুজতে পারেন।
গম্ভীরভাবে বলেন, তা তোরা গেলি যে?
তা জানি না। মা গেল তাই। দিদি, দাদা, মেজদা তো যায় নি। দিদি বলেছিল, যেখানে ঠাকুমা যাচ্ছে না, সেখানে—
চন্নন, তুই চুপ করবি?
মায়ের ধমকে চমকে চুপ করে যায় চন্দন।
সঙ্গে সঙ্গে বসাক-গৃহিণীর করুণার প্রস্রবণও শুকিয়ে যায়। চুপ করবার নির্দেশ দিয়ে এই যে ধমক, এ কি সুবর্ণর শুধুই মেয়ের প্রতি?
ওই ধমক তাঁর কৌতূহলের ওপরও একটা চড় বসিয়ে দেওয়া নয় কি?
পড়শিনীর ঘরের এই অদ্ভুত কেচ্ছাটা সম্পর্কে কৌতূহল তার হয়েছিল, হবেই তো। যা নয় তাই কাণ্ড, তবু হবে না কৌতূহল? বেশ, ঠিক আছে।
গম্ভীর গলায় বলেন, থাক্, মেজবৌমা, তোমাদের ঘরের ‘কেলেঙ্কার’ সোনবার দরকারও নেই আমার, প্রবৃত্তিও নেই। তবে যা দেখছি, আজ রাতে আর দরজা ওরা খুলবে না। তা কুচোকাঁচা নিয়ে সারারাত পথ পড়ে থাকবে? মানুষের চামড়া চোখে নিয়ে এ অবস্থায় ফেলে চলে গিয়ে নিশ্চিন্দির ঘুম তো ঘুমানো যাবে না? বাকি রাতটুকু আমার ঘরে এসে শোও।
পাড়ার গিন্নীদের সঙ্গে কথা কওয়ার রেওয়াজ বৌ-ঝির নেই, কিন্তু সুবর্ণ ওই রেওয়াজটার উপর দিয়ে চলে। সুবৰ্ণ কথা বলে।
এখনও বলল।
শোবার আর দরকার হবে না বসাক-কাকীমা!
বসাক-গৃহিণী তবু টলেন না, সুবর্ণর একটা হাত ধরবার চেষ্টা করে বলেন, আচ্ছা না শোও, নয় বসেই থাকবে, তবু তো একটা আচ্ছাদনের নিচে! তোমার দরকার নেই, ছানাপোনা কটার দরকার আছে। এভাবে পড়ে থাকলে রাতের মধ্যে নিমুনি হবে যে!
হবে না। কাকীমা, কিছু হবে না। হলেও ওরা মরবে না, রক্তবীজের ঝাড় কিনা! আপনি আর ব্যস্ত হবেন না, যান ঘুমোন গে যান।
বাটে!
যান ঘুমোন গে যান!
বসাক-গৃহিণী প্রসারিত হাতটা ফিরিয়ে নিয়ে বলেন, ও মাগো! কলিতে ভালোর বালাই নেই।… চলো গো চলো, দোর দিয়ে শুয়ে পড়বে চল। সাধে কি সুবোর মা অমন করে! বৌ নিয়ে জ্বলেপুড়ে মরেই—বাকীবাঃ, বৌ নয় তো যেন কেউটের ফণা!
রাগ করে বাড়ির দরজায় খিল লাগান বসাক-গৃহিণী, অথচ কৌতূহলকে রোধ করতে পারেন না, সেই রাতদুপুরে ছাতে উঠে দেখতে থাকেন, কী হয় শেষ অবধি।
জ্যোৎস্নায় চারিদিক ফাটছে, দেখা যাচ্ছে সবটাই … কিন্তু নতুন আর কী দেখবেন, সেই তো বৌ একই ভাবে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে রয়েছে—ছেলেগুলো সেইভাবেই ঘুমোচ্ছে।
কতক্ষণ আর দেখা যায় ছাতে দাঁড়িয়ে? রাত গম্ভীর হতে হতে ক্রমশ শেষ হয়ে যায়।
সকালবেলা দরজা আটকে রাখা শক্ত, গোয়ালা আসবে, আসবে পঝি, আসবে শাক-তরকারিওয়ালী।
কখন কার ফাঁকে ছেলেমেয়েগুলো ঢুকে পড়ে টুপটাপ করে খুব খানিকটা ব্যঙ্গ প্রশ্নের সামনে গিয়ে পড়ে।
যেখানে গিয়েছিল, সেখানেই থাকল না কেন, এ প্রশ্ন করতে থাকে। সেজকাকা, ছোটকাকা, আরো ভাইবোনেরা। তারা অপ্রতিভা হয়ে বলতে চেষ্টা করে, তোমরা এমন ঘুম ঘুমোবে জানলে তাই থাকতাম!
কিন্তু সে তো ওরা, সুবৰ্ণলতা?
সুবৰ্ণলতাও কি খোলা দরজার সুযোগে আবার ঢুকে পড়ল?
নাঃ, সুবৰ্ণকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে যেতে হল মুক্তকেশী আর তাঁর মেজছেলেকেই।
উপায় কি? কথাতেই তো আছে— দোরের মড়া ফেলবি তো ফেল!
মড়া অবিশ্যি নয়, মরা এতো সোজাও নয়। মরণ এত সহজ হলে মানব-হৃদয়-ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়গুলো তো লেখাই হতো না।
সুবৰ্ণলতা মরে নি, শুধু শক্ত কাঠ হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারের যাকে বলে মূৰ্ছা, আর বিজ্ঞ পরিজনেরা বলে আদিখ্যেতা।
এত বড় আদিখ্যেতার পরও কিন্তু ভয়ানক রকমের অদ্ভুত কিছু ঘটল না। হ্যাঁ, সেই এক আশ্চর্য রহস্য! হয়তো বা-এই গলিটা নিতান্তই গলি। আর গলির বাসিন্দারা নেহাতই মধ্যবিত্ত বলে তাদের জীবনের সব লীলাগুলোই ওই মধ্যপথে থেকে যায়, চরমে পৌঁছতে পারে না।
না, চরমও জানে না। এরা, পরমও বোঝে না, তাই সেই চিরাচরিত কড়া মন্তব্য, বিস্ময়াহত মন্তব্য, আর তীব্র তিরস্কার, ব্যস তার বেশি কিছু নয়।
যেন বড় একটা আয়োজন করে ফেঁসে যাওয়া!
আর সুবৰ্ণ?
সে তো বেহায়া।
তাই সে জ্ঞান হয়েই বলে, তুলে আনতে মাথার দিব্যি দিল কে? লোকলজ্জা? তা সে লজ্জা তো ঘুচেই গিয়েছিল।… পাড়াসুদ্ধ সকলেই তো জেনে ফেলেছিল, এ বাড়ির মেজবৌ কুলের বার হয়ে গিয়েছিল—
১.১৫ সুবৰ্ণর লজ্জা নেই
সুবৰ্ণর লজ্জা নেই, কিন্তু সুবর্ণর বিধাতার বোধ করি কিছু পরিমাণ লজ্জা অবশিষ্ট ছিল, তাই হঠাৎ একটা নতুন ঢেউ আনিয়ে কটা দিনের জন্যে অন্তত ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন সুবৰ্ণরুক্ষণাৎ আবার ভাতের হাঁড়ির ধারে পাঠিয়ে দিলেন না তাকে।
হঠাৎই।
হঠাৎই প্ৰকাশচন্দ্র দেশের মহামারীর খবর নিয়ে এসে আছড়ে পড়ল।
