ভয় আবার কি—, পৃথিবীর মাটিতে নেমে-আসা সুবর্ণ অপ্রতিভ হয়ে বলে, বেশ তো তুই, আমায় ডাকিস নি যে?
ডাকি নি আবার? কত ডাকছি! শেষে—
তাড়াতাড়ি নেমে আসে সুবর্ণ, আর এসেও চোখ জুড়িয়েই যায়। সত্যনারায়ণ ব্ৰতের আয়োজন কি সত্যিই এর আগে দেখে নি। সুবৰ্ণ? দেখেছে। পাড়াপাড়শীর বাড়ি কদাচ, বাড়িশুদ্ধ সকলে ভিড় করে গিয়ে। নিজেদের চ্যা-ভ্যাঁ-তেই ত্ৰাহি ত্ৰাহি লেগেছে।
এখানে সকলেই বেশ গিন্নীবামী, শ্যামাসুন্দরীর বান্ধবীকুলই সম্ভবত, শান্তভাবে বসে আছেন যুক্ত করে।
ধুপ ধুনো চন্দন ফুল চৌকি মালা ঘট পট সব মিলিয়ে দেবতা যেন সত্যই একটি সত্তা নিয়ে বিরাজ করছেন।
আশ্চর্য, সুবৰ্ণর ছেলেমেয়েরাও তো এখানে দিব্যি চুপ করে জোড়হাতে বসে আছে! অথচ ওরাই দলে মিশে যেন অন্য অবতার। ঠেলাঠেলি, হাসোহাসি, অসভ্যতা, লোলুপতা, এই তো মূর্তি ওদের।
পরিবেশ।
পরিবেশই মানুষকে ভাঙে গড়ে।
পুরোহিত পুথি খুলে গলা ঝেড়ে কথা শুরু করেন।
কলাবতীর গল্প!
কলাবতীর মৃত স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সত্যনারায়ণ, সুবর্ণলতার জীবনযাত্রার গতিটা ফিরিয়ে দিতে পারেন না?
কলাবতীর সত্যকারী ভক্তি ছিল!
সত্যকার ভক্তিটা কেমন বস্তু? আর তার আকুলতাটাই বা কেমন?
গাড়ি অনেকক্ষণ আগে নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। কথার শেষে পড়াশীরা বিদায় নেয়, শ্যামাসুন্দরী এদের ছাড়েন না। রাতের খাওয়াটা খাইয়ে দেবেন বলে লুচি ভাজতে বসেন। অভিভূত সুবৰ্ণ আপত্তি করে না, সুবৰ্ণ যেন ভুলে গেছে সে কাদের বাড়ির। ভুলে গেছে আবার সে-বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে তাকে।
কিন্তু মনে থাকলেই কি মনে করতে পারতো, সেই দাঁড়ানোর চেহারাটা এমন হবে? ভয় ছিল একা আসার জন্যে, ভয় ছিল রাত হওয়ার জন্যে, তবু এ ভয় ছিল না, সেই দরজা তার সমস্ত কদৰ্যতাকে উদঘাটিত করে বন্ধ হয়ে থাকবে।
ছেলেমেয়ে কটা বাবা কাকা জেঠা প্রভৃতি অনেককে ডেকে ডেকে শেষ অবধি বাইরের দরজার ধুলো-জঞ্জালের ওপরই বসে পড়েছে।
একেই গুরুভোজনে ক্লান্ত, তাছাড়া রাতও হয়েছে।
ঝি হরিদাসী কড়া নেড়ে নেড়ে হতাশ আর অবাক। মন্তব্য প্রকাশের ভাষা যোগাচ্ছে না আর তার।
গলির মধ্যের এপাশের ওপাশের সমস্ত বাড়ি এই দোর-ঠ্যাঙানোর সমারোহে সচকিত, জানলায় কৌতূহলী দৃষ্টির উঁকিঝুঁকি।
শেষবারের মত দরজায় প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিয়ে হরিদাসী পরাজিতের সুরে বলে, আমার দ্বারা আর হবে নি মেজবৌদি, আর দাঁড়াবার ক্ষ্যামতা নেই। বেশি আত্তির হলে বাড়িউলি আবার সদর কপাট বন্ধ করে দেয়। তোমার সঙ্গে গিয়ে ভালো বিপদ হল দেখছি। তোমার মামীশাউড়ীর যে আবার আদর উথলে উঠল, নুচি ভেজে খাওয়াতে বসলো!
রাত দশটা না বাজতেই এদের ঘুমের বহর দেখে সুবৰ্ণও প্রথমটা সত্যিই যেন অবাক হয়ে গিয়েছিল, এখন অবাক হওয়াটা পার হয়ে গিয়েছে।… তারপর মনে পড়ল ভাসুর এখন উপস্থিত নেই। মেজ বোন সুবালার বরের অসুখ শুনে খবর নিতে গেছেন তার গ্রামে।
এসব কর্তব্য সুবোধই করে থাকে। তাছাড়া সুবোধ বাড়িতে থাকলে যে বাড়িসুদ্ধ সবাই এমন করে ঘুমে পাথর হয়ে যেতে পারত না, সেটা নিশ্চিত।
সুবৰ্ণ আরক্ত চক্ষু মেলে বলে, তোমার রাত হয়ে যাচ্ছে হরিদাসী, বাসায় যাও।
হরিদাসী দোদুল্যমান মনকে রাশে এনে বলে, শোনো কথা! আতদুপুরে এই কুচোকাঁচা সমেত তোমাকে আস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে নিশ্চিন্দি হয়ে বাসায় যেতে পারি? হলো কি এদের? কেউ নিদুলী মন্তর দিল নাকি?
সামনের বাড়ির বসাক-কর্তা অনেকক্ষণ সহ্য করে এবার রণাঙ্গণে নামেন। ভারী গলায় হাঁক পাড়েন, ও প্ৰবোধবাবু, বলি কী রকম ঘুম মশাই আপনাদের! বাড়ির মেয়েছেলে দু ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে!
এবার বুঝি মুক্তকেশী-নন্দনদের ঘুম ভাঙে, প্রভাসচন্দ্রের ভারী গলার উত্তর পাওয়া যায়, আমাদের বাড়ির মেয়েবৌরা কেউ রাতদুপুরে একা বাইরে থাকে না মশাই। নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোন খোলা জানলাটা সজোরে বন্ধ হয়ে যায়।
এ হচ্ছে তেজ-দম্ভর কথা! হরিদাসী অকৃতজ্ঞের গলায় বলে ওঠে, এ হচ্ছে তেজের কথা, দ্বেষের কথা। আগে কি জানি ছাই—তোমাদের ভেতরে এত মনকষাকষি। এমন যখন অবস্থা যাওয়া তোমার উচিত হয় নি। পুরুষের রাগ হচ্ছে চণ্ডাল! সেই চণ্ডালকে-
তুই যাবি, যা, যা বলছি—
হরিদাসী বিরক্তভাবে বলে, ওমা, দেখ একবার! যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর! বেশ যাচ্ছি। এই ধর তোমাদের সিনীর পেসাদ।
ও তুই নিয়ে যা।
আমি নে যাবো কিগো? এ যে এখেনের জন্যে দিল মামীমা!
ঠিক আছে, তুই না নিস রাস্তায় ফেলে দিগে যা।
দুগ্গা, দুগ্গা! হরিদাসী সভয়ে প্ৰসাদটা মাথায় ঠেকিয়ে বলে, হিন্দুর মেয়ে হয়ে—
এই খানিক আগে নগদ চারগণ্ডা পয়সা বখশিশ দিয়েছে মেজবোঁদি, তাই মুখে বেশি বলে না, মনে মনে বলে, সাধে আর গুষ্টিসুদ্ধ লোকে তোমার নিন্দে করে!
বসাক-কর্তা বয়সে প্রবীণ, তবু রাতদুপুরে একা সুবর্ণর কাছে যেতে তার সাহস হয় না। গৃহিণীর সাহায্য নেন।
বসাক-গৃহিণী নেমে এসে করুণা-ঢালা সুরে বলেন, ইস্, ছেলেপুলে যে ঘুমিয়ে পড়েছে দেখছি! রাস্তার ওপর! ধুলোয় মাখামাখি! ব্যাপার কি মেজবৌমা, একা কোথায় গিয়েছিলে?
মেজবৌমা নিরুত্তর।
বসাক-গৃহিণী আরো মমতা ঢালেন, বুঝেছি, রাগারগির ব্যাপার। কিন্তু যতই যা হোক, রাতদুপুরে বৌ-ছেলেকে পথে বসিয়ে রেখে দোর দিয়ে ঘুমোবে, এমন দুর্দান্ত রাগ? কোথায় গিয়েছিলে? বাপের বাড়ি বুঝি?
