সেজবৌ অনেকদিন মেজদির সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ রেখেছিল, আজ মেজদিই। যখন ভাঙলো সেটা, তখন আর উত্তর দিতে বাধা রইল না।
বলে উঠল, কি বললে মেজদি?
যা বলেছি ঠিকই বলেছি।
কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা? ও বট্ঠাকুর তো মানুষের আকৃতিতে একটি—যাক গুরুজন, বলব না কিছু। সেই যে কথায় বলে না। কিসের আর কিসেয়, সোনায় আর সীসেয়, তোমার তুলনাটা তেমনি।
ঠিকই বলেছে। সেজবৌ! সোনা আর সীসেয় তুলনাটাই ঠিক। তবে সে সোনা কে সীসে সেটাই প্রশ্ন। তোমাদের হিসেবের সঙ্গে আমার হিসেব মেলে না। এই যা।
তা কারো হিসেবের সঙ্গেই কি মেলে সুবর্ণর?
মিললে কি সে ছোট তিনটে ছেলেমেয়েকে নিয়ে ভরাসন্ধ্যেবেলা একা একটা বিরে সঙ্গে একখানা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে উঠত?
চাঁপা ফরকেছে, চাপা যায় নি। যায় নি। ভানু-কানু। শুধু চন্নন পারুল খোকা। এদের এখনো মা ছাড়া চলে না।
ফুলের গন্ধ, ধূপের গন্ধ, আর সদ্য-কাটা তাজা ফলের গন্ধ বাড়িটাতে যেন দেবমন্দিরের বাতাস পৌঁছে দিয়ে গেছে। আর দরজা থেকে সুনিপুণ আলপনার রেখা যেন তার সুষমাময় স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছে দেবতার আবির্ভাবের।
কী অপূর্ব
কী সুন্দর!
কী অনাস্বাদিত এই স্বাদ!
সুবৰ্ণর মনে হলো কোন এক স্বৰ্গলোকের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সুবর্ণ।
মুক্তকেশী তীৰ্থ করেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেরিয়ে, মুক্তকেশী মানতি পূজো দেন দেবমন্দিরে গিয়ে গিয়ে। মুক্তকেশীর ঘরে এমনভাবে দেবতার আহবান নেই। থাকার মধ্যে আছে শুধু বছরে বারকয়েক সুতিকাষষ্ঠীয় পূজো!
কিন্তু তাতে কি এমন মোহময়, সৌন্দর্যময় আর সৌরভময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়?
সুবৰ্ণ এই সুরভিত বাতাসের সুযোগে আচ্ছন্ন হয়ে আস্তে ভিতরে ঢোকে।
শ্যামসুন্দরী সস্নেহে বলেন, এসো মা এসো! দাদা দিদিরা এসো ভাই! থাক থাক, দূরে থেকে প্ৰণাম করো বৌমা! ঠাকুরবি কই?
সুবৰ্ণ মৃদুস্বরে বলে, আসতে পারলেন না।
আসতে পারলেন না? শ্যামসুন্দরী বিস্ময় আর বিরক্তির সঙ্গে বলেন, সত্যনারাণে আসতে পারলেন না? তোমার আর সব জায়েরা?
ওরাও বোধ হয় আসতে পারবে না।
বোধ হয়টা বাহুল্য।
পুরো একখানা গাড়িতে সুবর্ণ তিনটে মাত্র কাচ্ছাবাচ্ছা নিয়ে এসে গিয়েছে আর কারো আসার প্রশ্ন নেই।
শ্যামাসুন্দরী বলে ওঠেন, পারবে না, না আসবে না? বুঝেছি, এসব ঠাকুরঝির নিষেধ। আসবে না। আমার বাড়ি।
সুবৰ্ণ ভদ্র গলায় বলে, তা কেন, আমি তো এলাম!
বুদ্ধিমতী শ্যামাসুন্দরী বোঝেন এখানে বিরুদ্ধ মন্তব্য চলবে না। বুঝে। অবশ্য প্রীতিই হন, বৌয়ের পক্ষে এটা সদগুণ! ঈষৎ হাস্যের সঙ্গে তুমি তো আমার ক্ষাপা মেয়ে বলে কর্মান্তরে প্রস্থান করেন।
কথা এমন মিষ্ট করে বলা যায়!
সুবৰ্ণ একটুক্ষণ অভিভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ছেলেমেয়েদের নিচের তলায় বসিয়ে রেখে উঠে যায় দোতলায়। এ বাড়িতে আগে এসেছে কয়েকবার। শ্যামাসুন্দরী তখন মাঝে মাঝে ননদ ও ভাগ্নে-বৌদের নেমন্তন করতেন।
এখন গুষ্টি বড় হয়ে গেছে, হয়ে ওঠে না। নেমন্তন করলে অন্তত এক কুড়ি পাত সাজাতে হবে।
দোতলার বড় ঘরটাই শ্যামাসুদীর, দক্ষিণ খোলা রাস্তার ওপর। এর জানলায় দাঁড়ালে বড় রাস্তা দেখা যায়।
বাড়িটা বড় নয়, তবু যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গা। দোতলায় ওই রাস্তার দিকটা বাদে আরো দুখানা ঘর, সামনে টানা দালান। কিন্তু জগুর আবার ভূতের ভয়, একা ঘরে শুতে পারে না, তাই বড় ঘরটায় মা ছেলে দুজনের বিছানা পাতা হয়। দুটো সরু সরু চৌকিতে।
শ্যামাসুন্দরী বলেন, তোর যা নাক ডাকে, ভয় পাবার কথা আমারই। তুই নিজের ঘরে শুগে না। বাবা, আমি শেষরাত্তিরে উঠে একটু ঠাকুরদেবতার নাম করে বাঁচি!
জগু বলে, কেন, আমি ঘরে থাকলে তোমার ইষ্টিদেবতাও ভয় খাবে? হুঁ!
অতএব এদিকের ঘর দুটো শেকল তোলা থাকে। মামলায় কে জিতবে এ নিয়ে দুই মায়েবেটায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। তর্কের শেষে অবশ্য জগুরই জয় হয়, কারণ সে শেষ রায় দেন, ভগবান যদি থাকে তো জিত আমারই। বুঝলে? বিষয়টা আমার বাপের, তোমার ঠাকুর্দার নয়।
শ্যামাসুন্দরী সে কথা অস্বীকার করতে পারেন না। আবার ভগবান নেই। এ কথাও বলা চলে না।
সুবৰ্ণ অবশ্য মা-ছেলের সেই অপূর্ব বাকবিনিময়ের কথা জানে না, শুধু দুটি সরু চৌকি দেখে মুগ্ধ হলো।
পূর্ণিমা তিথি।
জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসেছে, ঘরের মেঝোয় কালো কালো গরাদের ছায়া। দোতলায় এখন কেউ নেই, কাজেই হ্যারিকেন লণ্ঠন দুটো নিচেয় নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কোনো জগতে এসে পড়েছে।
নির্জনতার বুঝি নিজস্ব একটা সত্তা আছে। আর সে সত্তা অলৌকিক সুন্দর। অনেকগুলো লোকের উপস্থিতি কী ক্লেদাক্ত বিশ্ৰী!
কত বড় দুঃসাহস দেখিয়ে সে একা এভাবে চলে এসেছে, সে চিন্তা মনে আসে না, ফিরে গেলে কপালে কী লাঞ্ছণা জুটবে সে চিন্তা করতে ভুলে যায়, শুধু লক্ষ্যহীন দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে সুবৰ্ণ, অনন্তকাল ধরে যদি এমনি দাঁড়িয়ে থাকতে পেতাম!
এমনি চলমান পথিকের স্রোতের দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা!
সুবৰ্ণ কেন ওই রাস্তার হেঁটে-যাওয়া লোকেদের একজন হলো না? সুবৰ্ণ কেন মেয়েমানুষ হয়ে জন্মালো?
ও আমার কপাল, তুমি এখেনে—, পিছনে হরিদাসীর কণ্ঠে ভাঙা কাসি ঝনঝনিয়ে ওঠে, হ্যাঁগো মাজবৌদিদি, তোমার আক্কেলটা কী? নিচেয় ভট্টচাষ এসেছে, পূজো বসে গেছে, পাড়াপাড়শীতে ঘর বোঝাই, ছেলেপেলেগুলোকে ফেলে রেখে এসে তুমি এখেনে ভূতের মত দাইড়ে আছো? আদারের ভয় লাগে না গো?
