এঁরা দেশনেতাদের পাগলা আখ্যা দিতে দ্বিধা করেন না, পরমহংসের বুজরুকীর ব্যাখ্যায় আমোদ পান, বিবেকানন্দের আমেরিকায় গিয়ে হিন্দুধর্ম প্রচারের বার্তা নিয়ে হাসাহাসি করেন এবং মেয়েদের লেখাপড়ার অগ্রগতি লক্ষ্য করে সকৌতুক ব্যঙ্গ যখন তখন ঈশ্বর গুপ্ত থেকে উদ্ধার করে বলেন, আরো কত দেখবে হে! দেখবার এখুনি হয়েছে কি? এরপর সব–
এ, বি, সি, শিখে বিবি সেজে
বিলিতি বোল কবেই কবে।
আর হুট বলে বুট পায়ে দিয়ে
চুরুট ফুকে স্বর্গে যাবে।
বাড়ি বাজার আর অফিস, এই ত্রিভুজ তাঁতে আনাগোনা করতে করতে মরচে পোড়ে গেছে ওঁদের জীবনের মাকুটা।
এঁরাই সুবৰ্ণলতার স্বামীর বন্ধু।
কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর এই অফিসবাবুর দল কি এ যুগে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে?
আজকের পৃথিবীর এই দুরন্ত কর্মচক্রের দুর্বর গতির তাড়নের মাঝখানেও, অলস গতি আর অসাড় আড্ডা নিয়ে আজও কি টিকে নেই তারা? আজও কি তাদের জানার জগতে শুধু এই কথাই নেই, মেয়েমানুষ জাতটাকে ব্যাঙের আর অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতে হয়, তারা পানের পাশে চুন রাখতে ভুলে গেলে তাদের সমঝে দিতে হয়? আছে। ওঁরা যে আধুনিক নন, এই ওঁদের অহমিকা, এই ওঁদের গৌরব।
নাঃ, একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি।
আজও আছে বৈকি কিছু কিছু।
আছে দর্জিপাড়া আর কিনুগোয়ালার গলি, ছিদাম মিস্ত্রী আর রাণী মুদিনীর লেনের অন্তরালে।
এখনো ঐরা জানেন পুরুষ জাতটা বিধাতার স্বজাতি বলেই শ্রেষ্ঠ।
এঁরা আছেন।
হয়তো চিরকাল থাকবেন।
পৃথিবীর দুরন্ত অগ্রগতির পথে বাঁধা দেবার প্রয়োজনে বিধাতাই এঁদের সৃষ্টি করে চলেছেন, কম-বেশি হারে।
অথচ আবার হয়তো ওঁদের অন্তঃপুরের রঙও বদলাচ্ছে, ওঁরাই আব্রুর কড়া শিকল শিথিল করে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন, ওঁরাই ওঁদের মেয়েদের নিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে আসছেন বিয়ের বাজারে দাম বাড়াবার আশায় আর মেয়েদের বিয়ের বয়েসটা বারো থেকে ষোলোয় তুলছেন পারিপার্শ্বিকের চাপে।
এঁদের নাম মধ্যবিত্ত।
এঁরাই নাকি সমাজের কাঠামো।
এঁরা এদের মধ্যবিত্ততা এবং মধ্যচিত্ততা নিয়ে রক্ষা করে চলেছেন সেই কাঠামো। তার সঙ্গে চলেছে সময়ের স্রোত।
১.১৪ মুটের মাথায় ফলের ঝোড়া
মুটের মাথায় ফলের ঝোড়া, আঙুলের ফাঁকে ঝোলানো বড় দুটো কলার ছড়া—জগু এসে পিসিমার দরজায় হাঁক পাড়লো, পিসি গো পিসি!
কে র্যা, জগু নাকি?
মুক্তকেশী জপের মালা হাতেই বেরিয়ে আসেন।
হ্যাঁ গো হ্যাঁ! তা নইলে এ বাজাখাই গলা আর কার হবে? জগু চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়েই কথা সারে, ও সর্বনাশ, এতখানি বেলা হয়ে গেল এখনো তুমি মালা ঠকঠকাচ্ছে! পুণ্যির ছালা রাখবে কোথায়?
মুক্তকেশী এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলেন, কি ব্যাপার? এত কলা কিসের?
কলা তোমার ভাইবৌয়ের ছেরাদ্দর! বলে ছড়া দুটো একবার দুলিয়ে নিয়ে জগু মহোৎসাহে বলে, কী আক্রাগণ্ডার বাজারই পড়লো! মাত্তর দুছড়া কলা তিন-তিন গণ্ডা পয়সা!
মুক্তকেশী মুখ বাঁকিয়ে বলেন, ঠকিয়েছে তোকে। আমি আনাপিছু ছড়া আনছি। নিত্য! বলি এত ফল কী হবে রে?
বললাম তো, তোমার আদরের ভাজ শ্যামাসুন্দরীর ছোরাদ।… মাগো মা, শ্যামা মা, মাতৃনাম উচ্চারণে অপরাধ নিও না। সিন্নি হবে গো সিন্নি। শ্যামাসুন্দরী দেবী যে মামলা জিতেছেন! কাল রায়। বেরিয়েছে। সত্যনারায়ণের সিন্নি মানা ছিল, তাই শোধ হচ্ছে আজ। যেও সন্ধ্যেবেলা, সেই কথাই বলতে এলাম। মা ঠাকরুণ পইপই করে বলে দিয়েছেন।
মুক্তকেশী যাকে বলে বিস্ময়বিস্ফারিত লোচনে বলেন, মা জিতেছে! তার মানে তুই হেরেছিস?
তা শ্যামাসুন্দরী দেবী জিতলেই আমাকে হারিতে হবে, এ তো পড়েই আছে কথা! বাদীপ্রতিবাদীর সম্পর্ক যে দিন-রাত্তিরের মত! এ আছে তো ও নেই, ও আছে তো এ নেই।
মুক্তকেশী বিরক্ত কণ্ঠে বলেন, থামা ব্যাখ্যানা! বলি হেরে মরে আবার থেতা মুখ ভোঁতা করে মায়ের মানুতি পূজোর নৈবিদ্যির যোগাড় দিচ্ছিস?
জগু অসন্তুষ্ট স্বরে বলে, ওই, ওই জন্যেই তোমার সঙ্গে মাঝে মাঝে বিরোধ হয় আমার পিসি! বলি আমি যোগাড় করে দেব না তো কোন যম এসে দেবে? আর ককুড়ি ব্যাটা আছে তোমার ভাজের? আবার তো কাল ভোরবেলা তাকে নিয়ে ছুটতে হবে কালীঘাটে। পূর্বজন্মে কত মহাপাতক ছিল তাই এক পুত্তুর হয়ে জনেছি! যেও তাহলে।
জগু চলে যাচ্ছিল, মুক্তকেশী হাতের ইশারায় দাঁড় করিয়ে হাতের মালা কপালে ঠেকিয়ে বলেন, দেখ, সত্যনারায়ণ কাঁচাখেকো দেবতা, তার নাম করে অন্যায্য উপরোধ করিস নে। আমার বাপের বংশধরকে বঞ্চিত করে বৌ ড্যাং ড্যাং করে মামলা জিতে সিনি। দেবে, আর আমি সেখানে পেন্নাম ঠুকতে যাবে? আমার বাড়ির এক প্ৰাণীও যাবে না।
জগু আরো অসন্তোষের গলায় বলে, এই দেখ, আমি পারবো। ড্যাবডেবিয়ে দেখতে, আর তুমি, পারবে না? বলি ঠাকুরটা তো আর ওনার খানাবাড়ির খানসামা নয় যে ওঁকেই পুণ্যফলটুকু ধরে দেবে?… ওগো বৌমারা, একখানা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে ঝি সঙ্গে করে শাশুড়ীকে নিয়ে যেও সন্ধ্যেবেলা। মামীশাশুড়ী বলে দিয়েছে, ভারি ঘটার সিন্নি!.. ভাইরাও যদি পারে তো যায় যেন। চললাম, অনেক কাজ। বড়লোকের কন্যের আহ্লাদ মেটাতে মেটাতেই—
চলে যেতেই সেজবৌ মুখ বাঁকিয়ে বলে, ভাসুর গুরুজন, বললে অপরাধ, তবে ও বাড়ির বটুঠাকুরের বুদ্ধির বালাই নিয়ে মরতে ইচ্ছে করে।… হাসবো, না কাঁদবো?
কোথায় ছিল সুবৰ্ণলতা, কটু করে বলে ওঠে, এ বাড়ির কর্তারা যদি ও বাড়ির বটুঠাকুরের পায়ের নখের যুগ্যিও হতেন, তাহলে দুবেলা তাদের পা-ধোওয়া জল খেতাম।
