ঘাট হয়েছিল। তাই উচিত ছিল। প্ৰবোধ বলে ওঠে, জিভ তো নয়, ছুরি!
প্ৰবোধ বানাৎ করে দেরাজ টেনে তাসটা বার করে।
তাস নেবে না বলছি, ভাল হবে না! সেদিনের প্রতিজ্ঞার কথা মনে নেই? ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করেছিলে না? বেহায়া নির্লজ! জোচ্চোর!
একখানা ঘরের ব্যবধানে ভাইরা আর খেলার বন্ধুরা, এ সময়ে আর গোলমাল বাড়তে দিয়ে একটা কেলেঙ্কারি করা চলে না। নইলে প্ৰবোধের কি ইচ্ছে হচ্ছিল না, ফুটবলের মত লাথিয়ে লাথিয়ে ঘরের বাইরে বার করে দেয় ওই অবিশ্বাস্য ঔদ্ধত্যকে!
তাই কষ্টে মুখে হাসি টেনে এনে বলে, ফুঃ, সঙ্কটকালে আমন কত প্ৰতিজ্ঞা করতে হয়। তাই বলে যদি রাতের প্রতিজ্ঞা দিয়েও মানতে হয়, তাহলে তো বাঁচাই চলে না।
কী? কী বললে?
সুবৰ্ণ আবার বসে পড়ে।
প্রতি মুহূর্তে স্বামীর অপদার্থতার পরিচয় পায় সুবর্ণ তবু চমকে চমকে ওঠে।
অথচ অপদার্থতা সুবৰ্ণর মাপকাটিতেই। অন্য অনেক মেয়েমানুষই অমান বর পেলে ধন্য হয়ে যেত।
প্ৰবোধ পালায়।
স্রেফ পালায়। তাড়া-খাওয়া জানোয়ারের ভঙ্গীতে।
শুধু বলে যায়, ওঃ, কাকে কি বলছি হঁশ নেই, কেমন? নিজে নিত্যি ফ্যাসাদ বাধিয়ে বসবেন, আর মেজাজ হবে যেন আগুন!
কাকে কি বলাই বটে!
কিন্তু ইশ কি সত্যিই নেই সুবর্ণর?
নাকি ও চায় অপমানের অন্ধুশে আহত হয়ে একবার অন্তত জ্বলে উঠুক প্ৰবোধ? পুরুষের মত জ্বলে উঠুক, বজের তেজ নিয়ে জ্বলে উঠুক? মা ভাইয়ের কাছে মুখ রাখতে শাসনের প্রহসন নয়, সত্যিকার শাসন করুক। সুবৰ্ণকে তাড়িয়ে দিক, মেরে ফেলুক। সেই মরণের সময়ও যেন জেনে মরে সুবৰ্ণ, যে প্রাণীটার সঙ্গে ঘর করছিল সেটা মানুষ!
কিন্তু ফলটা ফলে বিপরীত।
সুবৰ্ণলতা যত উগ্র হয়ে ওঠে, প্ৰবোধচন্দ্র ততো নিস্তেজ হয়ে যায়। পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়।
কিন্তু সুবর্ণই বা কি!
তার মধ্যেই কি পদার্থ থাকছে আর? যেটুকু ছিল, সেই আত্মঘাতী সংগ্রামে ক্ষয় হয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে না? তার নিজের ভিতরকার যে সুরুচি, যে সৌন্দর্যবোধ এই কুশ্রী পরিবেশ থেকে মুক্তি পাবার জন্যে সর্বদা ছটফট করে মরতো, সে যে প্রতিনিয়ত এই নিস্ফল চেষ্টায় বিকৃত হয়ে উঠছে, সে বোধ কি আর আছে সুবৰ্ণলতার?
এই বাড়ি আর এই বাড়ির মানুষগুলোর অসৌন্দর্য ঘুচিয়ে ছাড়াবার জন্যে নিজে সে কত অসুন্দর হয়ে যাচ্ছে দিন দিন, এ কথা তাকে কে বুঝিয়ে দেবে!
কী হে প্ৰবোধবাবু, তাস আনতে যে বুড়ো হয়ে গেলে!
অভ্যস্ত কথা, অভ্যস্ত ঠাট।
বুঢ়ী আঁচল ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করছে না বুঝি?
হুঁ, গিন্নী!
প্ৰবোধ গুছিয়ে বসে বলে, প্ৰবোধচন্দ্ৰ অমন গিন্নী-ফিনীর ধার ধারে না। দেরি হল তাসটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে।
বাড়ির অখ্যাতি বন্ধুমহলেও প্রচার হয়ে গেছে, তাই প্ৰবোধের সগর্ব উক্তিতে একজন হেসে ফেলে বলে, আরো রেখে দাও তোমার গুমোর! গিন্নী তো শুনি তোমার কান ধরে ওঠায়, কান ধরে বসায়া!
হাসি।
হাসিই একমাত্ৰ মুখরক্ষার ঘোমটা।
তাই হাসতে থাকে প্ৰবোধ তাস ভাজতে ভাঁজতে, নাঃ, তোমরা আর মান-মৰ্যাদা রাখলে না!
এই সময় সুবোধের ছেলে বুদো এক ডাবর সাজা পান এনে আড্ডার মাঝখানে বসিয়ে দেয়, প্ৰবোধের লজ্জায় ছেদ পড়ে। পর পর তিন মেয়ের পর ছেলে, তবু বেচারা যেন নিতান্তই বেচারী।
রবিবারটা বুদোর দুঃখের দিন।
খেলতে যেতে পারে না, সারাক্ষণ আসরের খিদমদগারী খাটতে হয়।
বিশেষ এক-একটা ভার যে কেমন করে বিশেষ এক-একজনের ঘাড়ে এসে চাপে, সেটাই বোঝা শক্ত। বাড়িতে আরো ছেলে আছে, কিন্তু বুন্দোরই সব রবিবার দুঃখের দিন।
অবশ্য ভানু কানুর এ আসরের মুখে হবার জো নেই। তাদের মা তাহলে তাদের ধরে ধোবার পাটে আছাড় দেবে। এবং যে তাদের ফরমাস করবে, তাকেও রেহাই দেবে না। এটাও জানা। তাই বাড়িতে ভানু কানু নামের দু-দুটো ছেলে থাকতে বুদের ঘাড়েই সব বোঝা।
প্ৰবোধ বলেছিল, ওরা কিছু করে না, একা দাদার ছেলেটাই খেটে মরে—এটা স্বার্থপরের মত দেখায় না!
দেখায়! সুবর্ণ বলেছিল, কি করা যাবে, দেখাবে!
তোমারই যত ইয়ে, কই ওরা মা তো এত রাগ করে না?
ওর মা মহৎ।
তা মহৎই!
নইলে ওই ডাবর ডাবর পানই বা সে একা সেজে মরে কেন?
জনৈক আড্ডাধারী পকেট থেকে জর্দার কোটো বার করে তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, পান কে সেজেছে রে বুদো? তোর মা বুঝি?
মেয়েদের সম্পর্কে প্রশ্ন করতে হলে তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞার সুর মেশাতে হয়, এটাই রীতি। ভদ্রলোক সে রীতিতে বিশ্বাসীও।
নির্বোধ বুদো এ প্রশ্নে কৃতাৰ্থমন্য হয়ে একগাল হেসে বলে, হ্যাঁ।
তোর মাকে শিখিয়ে দিগে যা বাপ, পান দিলে তার সঙ্গে একটু চুন দিতে হয়।
যেন একটি ক্ষুদে লাটের ভঙ্গীতে একটা পান তুলে নেন। ভদ্রলোক।
এই এঁদের অভ্যস্ত ভঙ্গী।
পৃথিবীটা এঁদের কাছে করতলগত আমলকীবৎ। সর্ববিধ ব্যাপারকে নস্যাৎ করে দেবার কৌশলটি এঁদের জানা। দেশ যখন স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গে উদ্বেল, এরা তখন ঘরে বসে রাজা-উজির মারছেন, সেই আন্দোলনকে তুড়িতে ওড়াচ্ছেন।
পাড়ার প্রত্যেকটি বাড়ির বৌদের খবর এঁরা রাখেন এবং সমালোচনায় তৎপর হন। এ বাড়ির বড়বৌটিকে ওঁরা অগ্রাহ্য করেন,–মেজটিকে ব্যঙ্গ করেন, সেজটিকে স্বার্থপর বলে ছিছিক্কিার করেন এবং ছোটটিকে অবজ্ঞা করেন।
গুণানুসারেই করেন। অবশ্য, এবং মনোভাব চাপতেও চান না।
শুধু পাড়াপাড়শীই নয়, ওঁদের আড্ডায় কাটা পড়ে না। এমন মাথা নেই। এঁরা ব্ৰাহ্মকে বলেন বেম্ম, ব্ৰাহ্মণপুরুতকে বলেন, বামনা, বিদুষী মেয়ের নাম শুনলে বলেন, লীলাবতী!
