ঘরে কেউ থাকলে দেখে চমকে যেত, চেঁচিয়ে উঠত।
এর পর আর কি করতো সুবৰ্ণ কে জানে!
কে জানে চিৎকার করে কেঁদে উঠতো, না দেয়ালে মাথা ঠুকতো?
মোক্ষম সময়ে প্ৰবোধচন্দ্র এসে ঘরে ঢুকলো।
দেরাজ থেকে তোলা তাসজোড়াটা বার করে নিতে এসেছিল প্ৰবোধ।
আড্ডায় লোকসংখ্যা বেশি হয়ে গেছে, কাজেই একদল বেকার ব্যক্তি খেলোয়াড়দের পিছনে বসে উসখুসি করছে আর চাল বলে দিয়ে খেলার পিপাসা মেটাচ্ছে।
অবস্থাটা অস্বস্তিকর!
প্রভাস বলেছে, দূরছাই, আর একটা বাসর বসুক! তোমার ঘরে আরও তাস আছে না?
প্রভাস ইচ্ছে প্ৰকাশ করেছে, প্ৰভাস বলেছে! হস্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিল প্ৰবোধ তোলা তাসটা নিতে! কিন্তু সুবর্ণর মূর্তি দেখে থমকে দাঁড়ালো।
মুঠোপাকানো হাত, আর সে হাতের স্ফীত শিরাগুলো দেখে ভয়ই হলো তার। সত্যি বলতে, এমনিতেই সুবৰ্ণকে ভয়-ভয় করে প্রবোধের। নিয়ে ঘর করে বটে, কিন্তু কোথায় যেন অনন্ত ব্যবধান!
সত্যি, বাড়ির সমস্ত স্ত্রীলোকগুলিকে বুঝতে পারা যায়, পারা যায় না। শুধু নিজের স্ত্রীকে! এ কি কম যন্ত্রণা!
অথচ ওই বুঝতে না পারাটা স্বীকার করতে রাজী নয় বলে না-বোঝার জায়গাগুলো চোখ বুজে এড়িয়ে যেতে চায়, ভয় করে বলেই শাসনের মাত্রায় সহসা মাত্রা ছাড়ায়।
আশ্চর্য!
মেয়েমানুষ পর্যচর্চা করবে, কোদল করবে, ছেলে ঠেঙাবে, ভাত রাধবে, আর হাঁটু মুড়ে বসে। এককাসি চচ্চড়ি দিয়ে একগামলা ভাত খাবে, এই তো জানা কথা। ভাত বাড়া দেখে ঘরের পুরুষেরা পাছে মুচকে হেসে প্রশ্ন করে, বেড়াল ডিঙোতে পারবে কিনা। তাই পুরুষের চোখের সামনে কখনো ভাত বাড়বে না নিজেদের। এই সবই তো চিরাচরিত।
প্ৰবোধের ভাগ্যে সবই উল্টো।
সৃষ্টিছাড়া ব্যতিক্রম!
ইচ্ছে হচ্ছিল, না দেখার ভান করে কেটে পড়ে, কিন্তু হলো না। চোখোচোখি হয়ে গেল। অগত্যাই একটু এগিয়ে এসে বলতে হলো, কী ব্যাপার? শরীর খারাপ হচ্ছে নাকি?
সুবৰ্ণ শুধু চোখ তুলে তাকালো, সুবর্ণর নিঃশ্বাসটা আরো দ্রুত হলো।
হলো কি? কামারের হাপরের মত আমন বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলাছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে? বড়বৌকে ডেকে দেব?
এবারে আর নিঃশ্বাসটা ফোঁস করে উঠল না, ফোঁস করে উঠল সুবর্ণ নিজেই, কেন, বড়বৌকে ডেকে দেবে কেন?
বাঃ, ডেকে দেব কেন! কী হলো না হলো বড়বৌ বুঝবেন।
সুবৰ্ণ শুধু ফোঁসই করে না, এবার তীব্র একটা ছোবল দেয়, বড়বৌ বুঝবেন! আর তুমি বুঝবে না? কবিরাজী পান এনে ভোলানো হয়েছিল, কেমন? মিথু্যক, জোচ্চোর!
প্ৰবোধ ওই আরক্ত মুখের দিকে তাকায়।
প্ৰবোধের ব্যাপার বুঝতে দেরি হয় না।
আর বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়টাও কাটে। ওঃ, শরীর খারাপ নয়, রাগ। বাবাঃ, স্বস্তি নেই!
ক্যাবলা-ক্যাবলা হাসি হেসে বলে, ও ফেঁসে গেছে বুঝি তুক? বাবা, কী ইয়ে—
বোধ করি বলতে যাচ্ছিল কোনো বেফাঁস কথা, সামলে নিল। ওই সামলে নিতে নিতে কথার ধরনই সভ্য হয়ে যাচ্ছে। একমাত্র এই তাসের আড্ডাতেই যা ইচ্ছেমত মুখ খুলতে পাওয়া যায়। স্ত্রী তো নয়, যেন গুরুমশাই!
বলে মিথ্যেও নয়!
গুরুমশাইয়ের ভঙ্গীতেই ধমকে ওঠে তার স্ত্রী, খবরদার বলছি, দিদিকে ডাকবে না!
ডাকিবো না? বাঃ! শেষে একলা ঘরে দাঁতকপাটি লাগিয়ে বসে থাকবে? ওসব মেয়েলী কাণ্ড বড়বৌই ভাল বুঝবে!
মেয়েলী কাণ্ড!
মেয়েলী কাণ্ড!
আর সর্পিণী নয়, যেন বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় সুবর্ণ স্বামীর উপর। যেন নখে করে ছিঁড়ে ফেলতে চায় ওর ওই বোকামির মুখোশ।
আর মুখোশ ছিঁড়ে ফেলা সেই কুৎসিত জীবটাকে কটুক্তির চাবুকে জর্জরিত করে ফেলতে পারলেই বুঝি সুবৰ্ণলতার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
কিন্তু সত্যিকার নখ দিয়ে তো আর সে মুখোশ ছেড়বার নয়, তাই কিছুই হয়ে ওঠে না। শুধু একটা আগুনঝরা প্রশ্ন ঠিকরে ওঠে, মেয়েলী কাণ্ড! কচি খোকা তুমি!
প্ৰবোধ এই আগুনের খাপরার কাছ থেকে সরে পড়তে পারলে বাঁচে, তাই একটা সাজানো হাসি হেসে বলে, হল কি রে বাবা! থেকে থেকে যেন ভূতে পায়। তাসজোড়াটা কোথায়? দেরাজে আছে?
প্রশ্নটা বাহুল্য।
ঘরে ওই দেরাজটা ছাড়া আর কোনো আসবাব নেই।
না, আর একটা জিনিস আছে।
ইট দিয়ে উঁচু করা একটা চৌকিও আছে। যার নীচে বাক্স-প্যাটরা চালান করবার জন্যে ওই উঁচু করা। যে চৌকিটার উপর অনেকদিন পর্যন্ত দুটো ছেলে-মেয়ে নিয়েও আড়াআড়ি শুয়ে এসেছে সুবর্ণ আর প্রবোধ। তিনটে হবার পর থেকেই সেটাকে ছেড়ে মাটিতে শয্যা বিছিয়েছে সুবর্ণ।
চৌকিটায় এখন সারাদিন গাদা করে বিছানা তোলা থাকে, আর রাত্ৰে প্ৰবোধ একা হাত পা ছড়িয়ে শোয়। কচি-কাঁচা নিয়ে শুতে পারে না। আর সে। বয়েস হয়েছে, শরীর ভারী হয়েছে, তাছাড়া-কাঁচা পয়সার গুমোরও হয়েছে কিছু।
মনে জানে, আরাম চাইবার দাবি জন্মেছে তার।
সুবৰ্ণ মাটিতে বিছানা বিছিয়ে শোয় ছেলে-মেয়ে নিয়ে, দিনের বেলা মাদুরে। ঘরের এ-প্ৰান্ত থেকে ও-প্রান্ত অবধি বিছানা কাঁথার সমাবেশ, কে জানে অদূর ভবিষ্যতে আরও একটা জায়গা
তাসজোড়াটা থাকলে দেরাজেই থাকবে। কিন্তু সেই সহজ নির্দেশটা দিল না। সুবর্ণ, উঠে দাঁড়িয়ে কটুকণ্ঠে বলল, আবার তাস?
আস্তে! প্ৰবোধ বলে, গলা যে ভাসুরের কান ফাটিয়ে দিচ্ছে!
কিন্তু ভাসুরের নামোল্লেখেও দমে না। সুবৰ্ণ, সমান তেজে বলে, ওঃ, ভারি একেবারে সাতমহলা অট্টালিকা, তাই ভাদরবৌয়ের গলা ভাসুরের কানে পৌঁছবে না! সারা বাংলায় বোবা মেয়ে ছিল না? বোবা মেয়ে! তাই একটা খুঁজে নিয়ে বিয়ে করতে পারো নি.?
