হেরেও কোন উপায়ে জিতে যায় সুবর্ণ, মার খেতে গিয়েও মাথায় চড়ে বসে, এ এক অদ্ভুত রহস্য।
যে যতই তড়পাক, শেষ পর্যন্ত কোথায় যেন ভয় খায়।
আর বিজয়িনী সুবৰ্ণলতা খানিকটা করে এগিয়ে যায়। এ বাড়ির বৌরা মেলায় যাবে, এ কথা কেউ দশ দিন আগেও কল্পনা করতে পারতো?
অথচ সেই আকল্পিত ব্যাপার ঘটাল সুবর্ণ। আর আহ্লাদে ভাসতে ভাসতে বলল, আসছেবারে আমিও মেলায় দোকান দেব!
আসছেবার আমিও মেলায় দোকান দেব! বলেছিল সুবৰ্ণলতা আহ্লাদে ছলছল করে। ভেবেছিল এইবার বুঝি বন্ধনমুক্তির মন্ত্ৰ পেল সে। ভেবেছিল আলোর রাস্তায় হাঁটবার অধিকার অর্জন করবে। সে রাজপথে।
চাঁপাকে সুবৰ্ণ ঘৃণা করে, চাঁপা যেন তার মে–। সেজমেয়ে চন্দনটা বোকাটে নিরীহ। ছেলেদের ওপর অনেক আশা। এ আশা ও পোষণ করছে এখন থেকেই, আর একটু বড় হোক ভানু, ওকে সঙ্গে নিয়ে কাশী চলে যাবে সে একদিন। গিয়ে দেখবে তার সেই কুল ভেঙে অকুলে ভাসা মাকে।
আজ পর্যন্ত নিয়ে গেল না প্ৰবোধ! খুব ভাল মানসিক অবস্থায় কখনো কি ইচ্ছে প্ৰকাশ করে নি সুবৰ্ণ? বলে নি কি, ন বছর বয়সে সেই শেষ মাকে দেখলাম! আর কি বাঁচবেন মা? জীবনে আর দেখা হবে না!
বলেছে।
প্ৰবোধও প্ৰবোধ দিয়েছে, কেন বাঁচবেন না? ধুৎ! কত বয়েস তোমার মার! আমার মায়ের থেকে তো আর বড় নয়? তোমার এই এণ্ডি-গেণ্ডি নিয়ে তো আর কাশী যাওয়া চলে না! ওগুলো একটু বড় হোক!
সুবৰ্ণ ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলতো, ওগুলো বড় হলেই শখ মিটবে তোমার? রেহাই দেবে?
প্ৰবোধ অভিমানাহত গলায় বলতো, এই নিয়ে চিরদিন ঘেন্না দিলে। তবু ভেবে দেখলে না। কোনোদিন আমার সেজভাই ছোটভাইয়ের মতন স্বভাব খারাপ করতে যাই নি!
আশ্চর্য, ওই মোক্ষম কথাটা ভেবে দেখত না সুবর্ণ।
বরং বলতো, ওরাই জগতের আদর্শ পুরুষ নয়!
তারপর একদিন কোথা থেকে একটা কবিরাজি পান এনে হাজির করল প্ৰবোধ। চুপি চুপি বললো, ভোরবেলা খালি পেটে খেয়ে নেবে, ব্যস! তুমি যা চাও তাই হবে, আর ন্যানজারি হতে হবে না!
সুবৰ্ণ হেসে বলেছিল, বিষ দিচ্ছ না তো আপদের শান্তি করতে?
প্ৰবোধ সর্পাহতের মত মুখে বলেছিল, এই কথা বললে তুমি আমায়? এই সন্দেহ করলে? ভুলিয়ে তোমায় বিষ খাওয়াচ্ছি। আমি? বেশ তা যদি ভেবে থাকো, খেও না!
সুবৰ্ণলতা আরো হেসে উঠেছিল, নাঃ, ঠাট্টাও বোঝে না! মাথা না বুনো নারকেল! আর বিষ বলে ভয় পাবো কেন গো? বিষের জন্যেই তো হাহাকার করে বেড়াই। তারপর ঈষৎ আড়ষ্ট গলায় বলেছিল, খেলে পাপ হবে না?
তা বিষের কথাটায় কান দেয় নি। প্ৰবোধ, শেষের কথাটায় দিল, পরম আনন্দে মশগুল হয়ে বলল, পাপ কিসের? এগিয়ে দিয়েছিল সেই কবিরাজী পান।
সুবৰ্ণও বোধ করি আশায় কম্পিত হয়েছিল। রেহাই যদি নেই তো উপায় একটা ধরা হোক। সেজভাই ছোটভাইয়ের মত প্ৰবোধেরও যদি স্বভাব খারাপ হত, সুবর্ণ কি বাঁচিত না? বলেছেও তো কতবার বরকে! তাই হও তুমি। আমি বাঁচি।
কিন্তু খারাপ হতে যাবার জন্যে যে সাহসের দরকার তাই বা কোথায় প্ৰবোধের?
নেই।
তাই প্রবোধ সুবৰ্ণলতার কাছে পান নিয়ে এসে দাঁড়ায়। বলে, মহৌষধ।
মহৌষধ।
সুবৰ্ণ তাই তারপর থেকে নিশ্চিন্ত আছে। সুবর্ণ বিশ্বাস করেছে আর ন্যানজারি হবার ভয় নেই তার। তাই আহ্লাদে ছলছলিয়ে বলে উঠেছে, আসছেবারে আমিও স্বদেশী মেলায় দোকান দেব! মেয়েরা দিচ্ছে!
ভেবে দেখে নি, যে মেয়েরা স্বদেশী মেলা খুলে দোকান দিচ্ছে তারা কাদের ঘরের মেয়ে!
তারা কি সুবর্ণর ডাস্টবিন ওলটানো সরু সরু গলির মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছে?
নাঃ, তারা রাজরাস্তার, তারা প্রাসাদের।
তাদের জন্যে তাদের অকৃপণ বিধাতা রেখেছেন অনেক আলোর প্রসাদ। ভাগ্যের টীকা ললাটে পরেই পৃথিবীর মাটিতে অবতীর্ণ হয়েছে তারা।
সুবৰ্ণ যদি নিজের ওজন বুঝতে না শিখে তাদের রাস্তায় হাঁটতে চায়, তাদের আকাশে চোখ তুলতে চায়, সুবর্ণর কৃপণ বিধাতা ঘা মেরে সচেতন করিয়ে দেবেন বৈকি।
সুবৰ্ণর মাকেও তো দিয়েছিলেন।
সুবৰ্ণর মা যখন ভেবেছিল, আমি পাই নি, কিন্তু আমার মেয়ের জন্যে মুঠোয় ভরে আহরণ করে নেব সেই আলো, আর সেই আলোর সাজে সাজিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেব ওই রাজপথে, যেখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর এক পৃথিবীর মেয়েরা!
তখনও কি সুবর্ণর মায়ের বিধাতা বড় একটা হাতুড়ি বসিয়ে দেন নি তার ধৃষ্টতার উপর?
সুবৰ্ণর মা যদি বাকী জীবনটা শুধু এই কথাই ভেবে ভেবে দেহপাত করে—ইচ্ছায় অনিচ্ছয়, প্ৰতারকের প্রতারণায়, অহঙ্কারীর নির্লজ্জ শক্তির মত্ততায়, যে কোনও ঘটনায় ঘটিত বিয়েও চিরস্থায়িত্ব পাবে কেন, মানুষকে নিয়ে মানুষ পুতুল খেলা করবে কেন? —তবু সুবর্ণর তাতে কোন লাভটা হবে?
সুবৰ্ণর পরবর্তীকাল লাভবান হবে? সুবৰ্ণ দেখতে পাবে সে লাভ?
সুবৰ্ণ যদি ওর সরু গলির শিকলটা ভাঙবার দুরন্ত চেষ্টায় নিজেকে ভেঙে ভেঙে ক্ষয় করে, কোনো একদিন শিকল খসে পড়বে?
কে জানে কে কথা!
সুবৰ্ণ অন্তত জানে না।
সুবৰ্ণ পরবর্তী কালকে জানে না।
সুবৰ্ণ নিজে চায় শিকল ভেঙে বেরিয়ে পড়তে। চায় আলোর মন্দিরের টিকিট কিনতে।
কেনা হবে না!
তার বিধাতা তাকে আঘাত করবে, ব্যঙ্গ করবে!
সেই ব্যঙ্গ ধরা পড়ল সুবর্ণর কাছে।
ধরা পড়েছিল, তবু চোখ বুজে ছিল। খারাপ মনটাকে নিয়ে জোর করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, হঠাৎ সেই অনেক দিন আগে পড়া ময়াল সাপের প্রবন্ধটা মনে পড়ে গেল।
ভাবতে ভাবতে নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল। তার, বিস্ফারিত হয়ে এল চোখ দুটো, আড়ষ্ট কঠিন হয়ে উঠিল শরীর। হাত দুটো আপনি মুঠো হয়ে গেল।
