মেজকর্তা করেন?
সেটা তো বাইরের হাত!
ভিতরের ঘরের অধিকারটা কারি?
মেজঠাকুরপো যখন সকলের পূজোর কাপড় কিনে এনে মায়ের কাছে ধরে দেন, তখন কি মনে হয় না মেজবৌই দিল?
অনেক দুঃখে আর অনেক ধোয়ায় বাষ্পাচ্ছন্ন চোখ দুটো মুছে নিয়ে উমাশশী রুদ্ধকণ্ঠে বলে ওঠে, এ কী হচ্ছে মেজবৌ!
মেজবৌ কিছু উত্তর দেবার আগেই একটা ছেলে বলে উঠল, বস্তর-যজ্ঞি হচ্ছে জেঠিমা। সাহেবদের তৈরি কাপড় আর পরা হবে না, পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে সেই ছাইয়ের টিপ পরবো আমরা।
ছাইয়ের টিপ!
এসব কী কথা!
কোন ভাষা!
উমাশশী দিশেহারা হয়ে তাকিয়ে দেখে মেজবৌয়ের দিকে। ধোঁয়া উঠছে বিলক্ষণ, তবুও আগুনে জ্বলছে দৰ্প দৰ্প করে, আর সেই আগুনের আভায় আনন্দের আভার মত জ্বলজ্বল করছে সুবৰ্ণলতার মুখ। মাথার কাপড় খোলা, গায়ের কাপড়ও অবিন্যস্ত, এ বাড়ির ঐতিহ্য অগ্রাহ্য করে সেমিজ পরে এই যা!
ওকে যেন তাদের পরিচিত মেজবৌ মনে হচ্ছে না। ওকে ধিক্কার দেবে উমাশশী?
কম্পিত্যকণ্ঠে উচ্চারণ করলো, এ কী কথা মেজবৌ?
মেজবৌ সেই আহ্লাদে জুলজুল মুখে বলে, হোম হচ্ছে!
উমাশশীর আর কথা যোগাতো কি না কে জানে, তবে কথা থামাতে হল। মাথার ঘোমটাটা দীর্ঘতর করতে হল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখে সুবৰ্ণলতাও মাথায় আঁচলটা তুলে দিল!
ভাসুর নয়, দ্যাওর। তবু বয়সে বড় বিজ্ঞ পুরুষ দ্যাওর। ভাসুরের মতই সমীহ করা দরকার বৈকি। সেটাই বিধি।
প্রভাস চলে এসেছে। ছাতে, তার হাতে হাত জড়িয়ে চাপা। চাঁপার চোখ ক্ৰন্দনার্যক্ত। কাঁদতে কাঁদতে কাকাকে ডেকে এনেছে সে, মা তাদের পূজোর কাপড় আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দিচ্ছে বলে।
বাড়ির বিচারকের পোস্টটা সেজকাকার, সেই জানা আছে বলেই পাকা মেয়ে চাপা তার কানেই তুলেছে খবরটা।
কি কচ্ছে মা?
ধমকে উঠেছিল। সেজকাকা।
পূজোর কাপড় পুড়িয়ে দিচ্ছে! সব কাপড়!
হু-হু করে কেঁদে উঠেছিল চাপা। কই কোথায়— বলে বীরদৰ্পে এগিয়ে এসেছে প্ৰভাস, তবু এ ধারণা করে নি।
এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে-ও।
পরীক্ষণেই ব্যাপারটা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না তার। কারণ পথে-ঘাটে এ ব্যাপার ঘটতে দেখছে যে!
কিন্তু বাড়িতে?
বাড়িতে সেই থিয়েটার?
আর সেই থিয়েটারের অভিনেত্রী বাড়ির বৌ?
বড় ভাজ। কানে হাত দেওয়া চলবে না, অতএব তার ছেলেটাকেই কান ধরে টান মারে প্রভাস, যতটা জোর টানলে শুধু ছিঁড়ে পড়তে বাকি থাকে।
পলিটিক্সের চাষ হচ্ছে বাড়িতে? পলিটিক্সের চাষ? লীডার কে? মা জননী? তা বাড়িতে শাড়ি পড়ে বসে ঘোমটার মধ্যে খ্যামটা নাচ নেচে ছেলেগুলোর পরকাল ঝরঝরে করবার দরকার কি? কুছ কুছা এটি রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেই হয়। ইংরেজরাজকে খবর পাঠাই, তোমাদের অন্ন এবার
ব্যঙ্গ মুখটা বিকৃত করে প্রভাস।
সুবৰ্ণলতা যে স্রেফ পাগল হয়ে গেছে তাতে আর সন্দেহ কি! নচেৎ অত বড় দ্যাওরের সামনে গলা খুলে কথা বলে? আর তাকেই বলে?
বলে কিনা, যার যেমন বুদ্ধি, তার তেমন কথা! এ বাড়ির পুরুষদের চেয়ে হরিদাসীর ভাইও অনেক উঁচুদরের মানুষ!
হঠাৎ উমাশী দ্রুত পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুড়-দুড় করে চলে যায়।
দ্যাওরের হাতে বড় ভাজের মার খাওয়া দেখতে পারবে না। সে।
আর ততক্ষণে তো আরো সবাই গিয়ে জুটেছে ছাতে! তার মানে সভাস্থলে লাঞ্ছনা!
কিন্তু আশ্চর্য! আশ্চর্য!
লাঞ্ছনা হলো না সেদিন সুবৰ্ণলতার।
বোধ করি মূক হয়ে গেল সবাই সুবৰ্ণলতার বুকের পাটায়। কিংবা ভোবল পাগল হয়ে গেছে! সুবৰ্ণর ব্যবহারে এরা যখন বাক্যাহত হয়ে যায়। তখন এরা বলে, পাগল হয়ে গেছে! মাথার চিকিৎসা করা দরকার!
আজও বলল।
প্রভাসই বলল।
হয়তো মান বাঁচাতেই বলল।
মারতে গেলে ফিরে উল্টে মার খাওয়া অসম্ভব নয়। আর সত্যিই কিছু আর একটা শিক্ষিত ভদ্রলোক বড় ভাইয়ের স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারে না।
এক মারানো যেত মেজদাকে দিয়ে!
কিন্তু তাই বা হচ্ছে কই?
মেজদাকেও যে গুণন্তুক করেছে!
সংসারে যখন ভয়ঙ্কর কোনো ঢেউ তোলে সুবৰ্ণলতা, মনে হয় এবারে আর রক্ষা নেই তার। এবারে সত্যি সত্যিই মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে গলির বার করে দেওয়া হবে তাকে।
কিন্তু নাঃ, সে আশঙ্কা গর্জন করতে করতে তেড়ে এসে হঠাৎ ভেঙে গিয়েই কেমন ছড়িয়ে পড়ে। যেন ফেনার। রাশির মত স্তিমিত হয়ে মিলিয়ে যায় বালির স্তরে।
প্ৰবোধচন্দ্র এসে সব শুনলো।
মুক্তকেশী কথাটা আর এক সুরে বললেন। বললেন, বছরকার দিনে লক্ষণ করে কেনা পূজোর কাপড় চোপড়ে আগুন, সেই অবধি ভয়ে আমার বুকের কাঁপুনি থামছে না। বাবা! না জানি কী দুর্ঘটনা আসছে, কী অলক্ষণ ঘটবে সংসারে! কাপড়ের একটা সুতো উড়ে আগুনে পড়লে স্বস্তেন করতে হয়, আর এ কী! তোমার পরিবার যখন এমন দুর্দান্ত তখন তোমার উচিত হয় নি। ওর অমতে কাজ করা!
প্ৰবোধ মীরমে মরে যায়।
প্ৰবোধ ঘটা করে ভাইদের সঙ্গে পরামর্শ করতে যায় বহরমপুরের পাগলাগারদে পাঠাতে হলে কি কি উপায় অবলম্বন করা দরকার।
তারপর প্রবোধ মার হাতে একশোখানি টাকা তুলে দেয়। বলে, মা, কাপড় কেনায় ঘেন্না দরে গেছে আমার, এ টাকা থেকে প্ৰকাশকে দিয়ে যা হয় করে কিছু কিনিয়ে নিও।
কিন্তু বহরমপুরের টিকিট কি কেনা হয়েছিল সুবর্ণর?
কোথায়?
টিকিট যা কেনা হল সে তো স্বদেশী মেলার!
বাড়িসুদ্ধ ছেলেমেয়েকে আর ননদ বিরাজকে নিয়ে মহোৎসাহে দুখানা গাড়ি ভাড়া করে স্বদেশী মেলা দেখতে গেল সুবৰ্ণ।
কিনে স্বদেশী দেশলাই, স্বদেশী চিরুনি, স্বদেশী সাবান। সবাইকে বিলালো। বললো, পূজোয় এবার কাপড় কেনা হবে। ঢাকাই আমাদের নিজস্ব বাংলাদেশের জিনিস।
