ছেলের বার্লির বাটি হাতে করে রান্নাঘর থেকে আসছিল সুবৰ্ণলতা, দাঁড়িয়ে পড়েছে কাঠ হয়ে। বাটিটা কাত হয়ে গিয়ে বার্লি পড়ে গড়াতে শুরু করেছে সে খেয়াল নেই।
এ বাড়ির বাবুদের চোখে-কনে ঠুলি আটা!
এ বাড়ির বাবুদের চোখে-কনে ঠুলি আটা!
এ বাডির বাবুদের!
চোখে-কানে ঠুলি!
সুবৰ্ণলতার মাথার মধ্যে লক্ষ করতাল বাজতে থাকে, এ বাড়ির বাবুদের—।
বাসনামাজা ঝিয়ের মুখে শুনতে হলো, এ বাড়ির বাবুদের চোখে কানে ঠুলি! যে কথা সুবৰ্ণলতা ভাবছে, সে কথা ওর চোখেও ধরা পড়ে গেছে তাহলে!
সুবৰ্ণলতা তো জানতো, শুধু এ বাড়ির বাবুদের চোখেই নয়, ঠুলি আটা এ বাড়িটারও। আষ্টেপৃষ্ঠে ঠুলি আঁটা। রাজরাস্তার মুখর হাওয়া এ গলির মধ্যে ঢুকে আসে না। বস্তিতে যায়, যায় গাছতলায়, শুধু এ গলির মধ্যে ঢুকতে চাইলে, গলির বাঁকে বাকে ভাঙা দেওয়ালের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে বোবা হয়ে যায়।
কিন্তু আশ্চৰ্য, সুবৰ্ণলতার চোখ-কান এত খোলা থাকে কি করে! সুবৰ্ণলতা কেন বাইরের জগতের বাতাসে স্পন্দিত হয়, বাইরের ঝড়ে বিক্ষুব্ধ হয়, বাইরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাকে ঘৃণার চোখে দেখে!
সুবৰ্ণলতাকে এই চারখানা দেয়ালের ভিতরে বাইরে জগতের বার্তা এনে দেয় কে?
আর যে বার্তা অন্য সকলের কানের পাশ দিয়ে ভেসে যায়, গায়ের চামড়ার উপর দিয়ে ঝরে পড়ে, সে বার্তা সুবৰ্ণলতার গায়ের চামড়াকে জুলিয়ে ফোস্কা পড়িয়ে দেয় কেন? কেন ক্যানের মধ্যে গরম সীসে ঢেলে মনের মধ্যে তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি করে?
হরিদাসীর চোখে যদি ধরাই পড়ে থাকে এ বাড়ির বাবুদের চোখে-কনে ঠুলি আটা, তাতে সুবৰ্ণলতার চোখ দিয়ে আগুন ঝরাটা বাড়াবাড়ি নয় কি? আর সুবৰ্ণলতা যদি সেই ঠুলি উন্মোচন করতে চায়, ধৃষ্টতা ছাড়া আর কি?
সারাজীবন কি শুধু ধৃষ্টতাই করবে সুবৰ্ণলতা?
সংসারের সমস্ত সদস্যের পূজোর কাপড় কেনা প্ৰবোধচন্দ্রের ডিউটি, কারণ তাঁর পয়সা কাঁচা পয়সা! আর তার পরিবারের বুদ্ধিটা কাঁচা বুদ্ধি!
সুবৰ্ণ বলেছিল, এবারে বিলিতি কাপড় আনা চলবে না। জেলা তাতির জেলে গামছা কাপড়ও তার চেয়ে ভাল।
প্ৰবোধ নাক তুলে বলেছিল, তোমার ভাল তো পাগলের ভাল! সে কাপড় কে ছোঁবে?
সে চৈতন্য এনে দিলে সবাই ছোঁবে, মাথায় করে নেবে!
চৈতন্যদায়িনী দিক তবে চৈতন্য, আসছে। বছর কাজে লাগবে। বলে সুবর্ণর কথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে একবোঝা যথারীতি বিলিতি কাপড়ই এনে ফেলেছিল প্ৰবোধ। এনেছিল আলতা, চীনেসিঁদুর, মাথা ঘষার মশলা।
যার যার কাপড় তার তার ঘরে উঠে গেছে, ছোট ছোট ছেলেগুলো দিন গুনছে কখন পরবে: সেই পূজোর কাপড়, আর ছোট ছোট মেয়েগুলো হিসেব করছে। কার কাপড়ের পাড়টা ভাল!
সুবৰ্ণ ভেবে রেখেছিল যে যা করে করুক, সে পরবে না ও শাড়ি। সে আপনার সংকল্পে অটুট থাকবে।
ষষ্ঠীর দিনে যখন নতুন কাপড়ের কথা উঠবে, সুবর্ণ বলবে পূজোর পুণ্যদিনে অশুচি বস্ত্ৰ পরিবার প্রবৃত্তি নেই তার। কোনো দিনই নেই। সে ত্যাগ করবে। এবারের পূজোর কাপড়।
কিন্তু হরিদাসীর ধিক্কারে সে সঙ্কল্পের পরিবর্তন হল।
দাউ দাউ আগুন জ্বেলে জুলিয়ে পুড়িয়ে খসিয়ে দাও ওই ঠুলি। নয়তো মুক্তি দিক সুবৰ্ণলতাকে এই নাগপাশ থেকে। তাড়িয়ে দিক ওরা সুবৰ্ণলতাকে, দূর করে দিক তাকে তাঁর ভয়ঙ্কর দুঃসাহসের জন্যে।
মীরাবাঈয়ের মত পথে বেরিয়ে পড়ে দেখবে সুবৰ্ণ পৃথিবীর পরিধিটা কোথায়?
কতদিন কল্পনা করেছে সুবৰ্ণলতা এরা সুবৰ্ণকে তাড়িয়ে দিল, সুবর্ণ সাহস করে চলে গেল।
বাইরের লোকের কৌতূহলী চোখকে এড়াবার জন্য ঢুকে পড়ল না তাড়াতাড়ি মুক্তকেশীর শক্ত বেড়ার মধ্যে।
তারপর সুবৰ্ণলতা পথে পথে ঘুরছে, ঘুরছে তীর্থে তীর্থে, ঘুরছে ওই সব মহাপুরুষদের দরজায় দরজায়, যাঁরা স্বদেশী করেন।
চোখ জ্বালা করানো ধুমকুণ্ডলী পাক খেতে খেতে নিচে নামছে…তার সঙ্গে নেমে আসছে। তীব্ৰ আর পরিচিত একটা গন্ধ।
এ বাড়ির ছাদের আকুলতা আকাশে ওঠবার পথ পায় না, তাই নিরুপায় ধোঁয়াগুলো ছাদের আলসে টপকে পাতালের দিকে নামতে চায়।
প্রথমটা কারো খেয়াল হয় নি, খেয়াল হল চোখ জুলায়। তারপর পোড়া গন্ধ। ন্যাকড়া পোড়ার গন্ধ তো আর চাপা থাকে না!
ছোটদের চেঁচামেচিটা নতুন নয় এ বাড়িতে, কাজেই সবশেষে অনুভবে এল সেটা।
কোথায় কি সর্বনাশ ঘটাচ্ছে পাজীগুলো!
সর্বনাশে উমাশশীর বড় ভয়, উমাশশী এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে আবিষ্কার করল ঘটনাটা!
রান্নাঘরের ছাদে ধুমালোক, জড়ো-করা চারটি কাপড় পুড়ছে, তার ধারে কাছে কটা ছেলেমেয়ে চোখের জ্বালা নিবারণ করছে চোখ রগড়ে রগড়ে, আর তার সঙ্গে করছে হৈ চৈ।
কিন্তু শুধুই কি ছোটরা?
তার সঙ্গে নেই পালের গোদা মেজগিন্নী?
উমাশশী থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
উমাশশীর মুখ দিয়ে কথা বেরোল না।
ইচ্ছে করে এ কী পোড়াতে বসেছে মেজবো? কাপড় না। ভবিষ্যৎ? তা সে তো পোড়াচ্ছেই জীবনভোর! আ-জীবনই তো ধ্বংসকার্য চালাচ্ছে! তবু সে আগুনটা ছিল অদৃশ্য, এবার কি বাড়িটাতেই আগুন ধরাবে মেজবৌ?
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েই রইল উমাশশী। তারপর আঁচল দিয়ে চোখটা মুছল। জল পড়ছে চোখ দিয়ে, জ্বালা করছে।
ধোঁয়ায়?
না সুবৰ্ণলতার অসমসাহসিক দুঃসাহসের স্পর্ধায়?
অবিরত এইরকম করে চলেছে সুবৰ্ণলতা, তবু তার ভাগ্য উথলে উঠছে দিন দিন। দু হাতে খরচ করছে, চাঁদির জুতোয় সবাইকে কিনছে, সোনার ঠলি দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখছে লোকের।
