অতএব কালীর দিব্যি দিয়েছে প্ৰবোধ স্ত্রীকে, দিয়েছে নিজের দিব্যি। রাত্রিকালে নিশ্চিন্ত অবকাশে বুঝিয়েছিল, নভেল পড়ার কি কি দোষ।
কিন্তু বেহায়া সুবৰ্ণ সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তেও এক অদ্ভুত কথা বলে বসেছিল। বলেছিল, বেশ, তুমিও একটা দিব্যি গালো!
আমি? আমি কি জন্যে? আমি কি চোরদায়ে ধরা পড়েছি?
না, তুমি কেন পড়বে, সব চোরদায়ে ধরা পড়েছে মেয়েমানুষ! কেন বলতে পারো? কেন?
কেন? শোনো কথা!
এর বেশি আর উত্তর যোগায় নি প্ৰবোধের।
সুবৰ্ণ হঠাৎ প্ৰবোধের একটা হাত ঘুমন্ত ভানুর মাথার ওপর ঠেকিয়ে বলে উঠেছিল, তুমিও দিব্যি কর। তবে, আর কখনোও তাঁস খেলবে না?
তাস খেলবো না! তার মানে?
মানে কিছু নেই। আমার নেশা বই পড়া, তোমার নেশা তাস খেলা। আমাকে যদি ছাড়তে হয় তো তুমিও দেখো, নেশা ছাড়া কী বস্তু। বল আর কখনো তাস খেলবে না!
প্ৰবোধের সামনে আসন্ন রাত্রি।
আর বহু লাঞ্ছনায় জর্জরিত স্ত্রী সম্পর্কে বুক-দুরু-দুরু আতঙ্ক।
আবার কী না কি কেলেঙ্কারী করে বসে কে বলতে পারে! তবু সাহসে ভর করে একবার বলে ফেলে, চমৎকার! মুড়ি-মিছরির সমান দর!
সুবৰ্ণলতা তীব্ৰস্বরে বলে উঠেছিল, কে মুড়ি কে মিছরি, তার হিসেবই বা করেছিল কে, আর তাদের দর বেঁধে দিয়েছিলই বা কোন বিধাতা, বলতে পারো?
আশ্চর্য, এত লাঞ্ছনাতেও দমে না মেয়েমানুষ। উল্টে বলে, লজ্জা আমার করার কথা, না। তোমাদের করার কথা সেটাই বরং ভাবো!
প্ৰবোধ। অতএব বলে বসেছিল, ঠিক আছে বাবা ঠিক আছে, করছি দিব্যি!
খেলবে না। আর কখনো তাস?
খেলবো না। হল তো! তা আমার বেলায় তো বেশ হলো, নিজের প্রতিজ্ঞা?
বলেছি তো, তুমি যদি আর তাস না খেলো, আমিও বই পড়বো না।
আমার সঙ্গে কি তা তো বুঝলাম না! হলো পরপুরুষের সঙ্গে মাখামাখি-
খবরদার! আর একবারও যেন ওকথা উচ্চারণ করতে শুনি না, ইতর ছোটলোক!
বাঃ, বাঃ, একেই তো বলে পতিব্ৰতা সতী! সতী স্ত্রীলোকেরা–
তোমাদের হিসেবমতন সতী আমি নই, নই, নই। হলো!
সুবৰ্ণ ক্রুদ্ধগলায় বলে, ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করেছে। মনে রেখো। পয়সা বাজি ধরে তাস খেলা! ও তো জুয়া খেলা! জুয়া খেললে পাপ হয় না তোমাদের? নাকি পুরুষের পাপ বলে কিছু নেই?
পুরুষের আবার পাপ নেই! প্ৰবোধ বলে, মহাপাপ হচ্ছে বিয়ে করা। বলেই সবলে আকর্ষণ করে সুবৰ্ণলতার পাথর-কঠিন দেহটাকে।
তারপর?
গড়িয়ে চলে দিনরাত্রি।
যথানিয়মে সকালে সূর্য ওঠে, সন্ধ্যায় অস্ত যায়, মুক্তকেশী গঙ্গাস্নানে যান, মুক্তকেশীর ছেলেরা প্রতিদিন সন্ধায় আর ছুটির দিন সারাদিন তাসের আড্ডা বসায়, বড়বৌ রাশি রাশি পান সেজে বৈঠকখানায় পাঠায়, বাড়ির ছেলেরা ঘন ঘন তামাক সাজে।…
আজকাল আবার আর এক নতুন ফ্যাসান উঠেছে চা খাওয়া। চায়ের সাজসরঞ্জাম কেনা হয়েছে, মহোৎসাহে চা বানিয়ে তাসের আড্ডায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
চলছে যথারীতি।
কিন্তু মুক্তকেশীর মেজছেলে!
সে কি যোগ দিচ্ছে তাসের আড্ডায়?
তার চরিত্র কোন কথা বলে?
১.১৩ বাসনমাজ ঝি হরিদাসী
বাসনমাজ ঝি হরিদাসী পূজোয় পাওয়া কাপড়খানা বাসায় নিয়ে গিয়ে আবার ফেরত দিতে এল।
বলল, নাটুমার্কা কাপড় চলবে নি। ঠাকুমা, ও বিলিতি কাপড় আমাদের বস্তিতে বারণ হয়ে গেছে।
সন্ধ্যের দিকে ইদানীং যেন মুক্তকেশী চোখে একটু কম দেখছেন, তাই সহসা ঠাহর করতে পারলেন না ব্যাপারটা কি। চোখ কুঁচকে ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বললেন, কি বললি! কিসের কি হয়েছে?
বারণ হয়ে গেছে গো ঠাকুমা, বিলিতি কাপড় পরা বারণ হয়ে গেছে! ও পরলে নাকি দেশের শতুরতা করা হবে!
মুক্তকেশী চোখে-কনে যদিই বা কিঞ্চিৎ খাটো হয়ে থাকেন, গলায় খাটো হন নি। ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলেন, কাপড় ফেরত দিতে এসেছিস! এত বড় আস্পদ্দা! বাজারের সেরা কাপড় এনে দিয়েছে মেজবাবু, আর তুই… কই পেবো কোথা গেল? দেখে যাক ছোটনোককে নাই। দেওয়ার ফল! কাঁচা পয়সা হয়েছে তাই দু হাতে পয়সা ছড়াচ্ছে বাবু। ঝিয়ের কাপড় চোদ্দ আনা! ওই যে—পরিবার রাতদিন বলেন, ঝি বলে কি মানুষ নয়? গরীব বলে কি মানুষ নয়? তারই ফল! তখনই বলেছিলাম, এত বাড়াবাড়ি ভাল নয় পেবো, যা রয়-সয় তাই কর। ও-কাপড় বদলে আট-ন আনার একখানা কাপড় এনে দে। সে কথা শোনা হল না, এখন দেখে যাক আসপদ্দা! সেই কাপড় অপছন্দ করে ফেরত দেওয়া—
হরিদাসী বোজার মুখে বলে, অপছন্দ আমি করি নি। ঠাকুমা, বলেছি পরা চলবে নি।
ওলো থাম থাম, তুই আর কথার কায়দা শেখাতে আসিস নি! যার নাম ভাজাচাল তার নামই মুড়ি, বুঝলি? ছোটমুখে লম্বা লম্বা কথা!
হরিদাসী আরো বোজার গলায় বলে, ছোটনোকে কথা কইলেই তোমাদের কানে লম্বা। ঠেকে ঠাকুমা! বদলে না দাও কাপড় চাই না, গালাগাল কোর না।
গালাগাল! গালাগাল করি আমি? মুক্তকেশী ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, বলেন, বেরিয়ে যা! বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে! ভাত ছড়ালে কাকের অভাব?
তা কালটা তখনো তাই ছিল।
ভাত ছড়ালে কাকের অভাব ঘটত না। তবু কে জানে কোন দুঃসাহসে হরিদাসী চাকরি যাওয়ার ভয়ে কেঁদে পড়ে বলে উঠল না, কাল মা দুগৃগার পূজো, এই বছরকার দিনে তুমি আমার অন্নটা খেলে ঠাকুমা!
না, বলে উঠল না।
কে জানে কোন শক্তিতে শক্তিলাভ করে অপ্ৰসন্ন গলায় বলে উঠল, অন্যায় রাগ করলে নাচার ঠাকুমা! তোমার একখানা কাপড় পরে বাসায় আমি জাতে ঠেকা হয়ে থাকতে পারি না। দেখ গে যাও না, রাস্তায় কী কাণ্ডটাই হচ্ছে! পুলিসের হাতে মার খেয়ে মরছে, তবু মানুষ বন্দে মাতাং! বলছে! এতটুকুন-টুকুন ছেলেগুলো পর্যন্ত মার খাচ্ছে, গান গাইছে। দোকান থেকে কাপড় লুঠ করে বাবুরা সব বিলিতি কাপড়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বস্তর-যজ্ঞি করছে, এরপর সব নাকি স্বদেশী হবে, নেকচারবাবুরা সেই সেই নেকচারই দিয়ে বেড়াচ্ছে।… আমাদের বস্তিতে পর্যন্ত তোলপাড় কাণ্ড চলছে। খালি এ বাড়ির বাবুদেরই চোখে কানে ঠুলি আটা!
