এসব কথা নাতনীর জন্যে নয়, মুক্তকেশীর এ স্বগতোক্তি পালকির সূত্রে বেরিয়ে পড়া ভিতরের উন্মা। পথে ঘাটে কেবলই শোনেন কিনা স্বদেশীওলারা সাহেবদের উচ্ছেদ করবার তালে আছে। বোমা করছে, গুলি বন্দুক গোছাচ্ছে। গঙ্গার ঘাটে ওই আলোচনা শুনে শুনে হাড়পিত্তি জ্বলে যায়। ওদের রাজ্যপাট, তোরা কেড়ে নিবি? ওদের সঙ্গে পারবি? বামন হয়ে চাদে হাত?
হঠাৎ স্বদেশীদের ওপর খাপূপা হয়ে ওঠেন কেন মুক্তকেশী কে জানে!
মনে হচ্ছে হঠাৎ যেন নিজের জীবনের একটা মস্ত বড় ফাঁক ধরা পড়ে গেছে তাঁর চোখে।
কিসের এই শূন্যতা?
তাঁর রাজ্যপাট তো পুরোদস্তর বজায় আছে। তবে হঠাৎ সাহেবের রাজ্যপাট বেদখল হবার চিন্তায় মেজাজ ক্ষিপ্ত হয় কেন?
গোঁয়ার-গোবিন্দ জগুর মার ওপর কি সূক্ষ্ম একটা ঈর্ষাবোধ আসছে? কেন? মুক্তকেশীর ছেলেরা কি মাতৃভক্তিতে কম? তাই জগুর অভিনব মাতৃভক্তি তাঁকে ঈর্ষার পীড়িত করেছে?
মাতৃভক্তিতে কসুর কোথায় মুক্তকেশীর ছেলেদের? তবু গভীর। এই শূন্যতার বোধটা ভরাট করে তুলতে পারছেন না বুদ্ধি দিয়ে যুক্তি দিয়ে। মুক্তকেশীর নিজের হৃদয়ে ছেলেদের ঠাঁই নেই, না ছেলেদের হৃদয়ে মুক্তকেশীর ঠাঁই নেই? ঠাঁই থাকলে ভরাটত্ব থাকবে না কেন? শ্যামাসুন্দরীর মধ্যে যে ভরাটত্বটা দেখে এলেন এইমাত্র?
ছেলের বিয়ে দেওয়াটাই কি তাহলে বোকামি? হাতের কড়ি পরকে বিলিয়ে দেওয়ার মত?
অ ঠাকমা, অত জোরে হাঁটছে। কেন? আমি বুঝি পারি?
পারিস না তো আসিস কি করতে? মুক্তকেশী গতিবেগ একটু কমিয়ে বলেন, আমি বুড়ী পারছি, তুমি জোয়ান ছুড়ি পারছি না? তোদের বয়সে লোহা ভাঙতে পারতাম, তা জানিস?
কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়।
অসামান্য গতর ছিল, এখনো আছে। কথায় বলে মারা হাতী লাখ টাকা! আখ, কখনো দাঁতে ছাড়িয়ে ভিন্ন বাঁটিতে ছাড়িয়ে খান না, নিত্য ডালবাটা পোস্তবাটা খেয়ে অবলীলায় হজম করেন। জলের কলের মধ্যে চামড়া আছে, এই বিচারে বিধবা হয়ে পর্যন্ত কখনো কলের জল খান নি। দৈনিক দু ঘড়া করে ভরির গঙ্গাজল তার বরাদ্দ।
নিষ্ঠাবতী বলে বিশেষ একটা নামডাক্ষ আছে মুক্তকেশীর। পাড়ার লোক সমীহর দৃষ্টিতে দেখে। মুক্তকেশীকে পথে বেরোতে দেখলেই রাস্তার ছেলেরা ডাংগুলি খেলা স্থগিত রাখে, মারবেল খেলতে খেলতে চকিত হয়ে দাঁড়ায়।
দোবরা চিনিতে হাড়ের গুঁড়ো আছে বলে কখনো সন্দেশ রসগোল্লাটি পর্যন্ত খান না মুক্তকেশী, রাতে আচমনী খান না। অম্বুবাচীর কদিন অশুদ্ধ বসুমতীর সংস্পর্শ ত্যাগ করে দৈনিক একবার মাত্র গঙ্গাগর্ভে দাঁড়িয়ে মধু আর ডাব পান করেন। এমন আরো অনেক কঠোর কৃচ্ছসাধনের তালিকা আছে মুক্তকেশীর, তাই তার চেহারাতেও রুক্ষ-কাঠিন্য।
মুক্তকেশীর জীবন-দর্শনের সঙ্গে আজকের শূন্যতার মিল নেই। তিনি তো বরাবর ভালোবাসার চেয়ে ভয়কেই মূল্য দিয়েছেন বেশি। ভেবেছেন, ওটাই সংসারের পায়ের তলার মাটি। তবে আজ কেন গোয়ার জগুর মাতৃপাদোদক পান করার মত হাস্যকর ব্যাপারটা বার বার মনে পড়ছে? কেন মনে হচ্ছে শ্যামাসুন্দরী একটা উঁচু পাথরের বেদীতে বসে আছেন, মুক্তকেশী নীচে থেকে মুখ তুলে দেখছেন?
ও ঠাকমা, পালকি নেবে না?
টেঁপির আবদারের সুর ধ্বনিত হয়।
মুক্তকেশী হঠাৎ যেন নরম হন। বলেন, পয়সা খরচা না করিয়ে ছাড়বি না, কেমন? কই দেখি কোথায় পালকি?
ওই তো। ওখানে বসে রয়েছে—
মুক্তকেশী দেখেন একটা গাছতলায় বসে রয়েছে বটে পালকি নামিয়ে দুটো বেহারা।
হাতছানি দিয়ে ডাকেন।
তারপর তাতে উঠে বলেন, তোর মা যা কঞ্জুষী, আক্কেল করে দেবে ভাড়াটা! দেবে না। চাঁপির মার আর কোন গুণ না থাক এটা আছে।
টেঁপি মুখখানা বোজার করে বলে, চাপির মার হাতে তো রাতদিন পয়সা, আমার মার আছে বুঝি? বলে মার একটা চাবির রিং কেনবার ইচ্ছে কবে থেকে, তাই হয় না!
মুক্তকেশী তাচ্ছিল্যাভরে বলেন, না হলে আর কার কী দোষ? লাখ টাকায় বামুন ভিখিরি! কেন, তোর বাবা কি উপায় কম করে?
হ্যাঁ, এ ধরনের কথা ক্ষুদে ক্ষুদে নাতি-নাতনীদের কাছে হামেশাই বলে থাকেন মুক্তকেশী। যা কিছু বলার ইচ্ছে, যা কিছু বক্তব্য, বেশীর ভাগই তো ওই ছোটগুলোকে মাধ্যম করেই উচ্চারণ করেন। ঠিক জানেন, সরাসরি বলার হাঙ্গামাটা না পুইয়েও সরাসরি বলার কাজটা এতেই হবে।
সঙ্গে সঙ্গেই তো গিয়ে মায়েদের কর্ণগোচর করবে ওরা।
ওরা পাকা পাকা কথা শিখবে?
ওমা, তাতে কী এল গেল!
ক্তকেশীর মেম মেজবৌমার মত আর কে বলতে যাবে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে পাকা কথা শিখবে! কিন্তু মুক্তকেশীর সেই মেজবৌ কি এখনো টিকে আছে তার বাড়িতে? সেদিনকার ঝড়ে উড়ে পড়ে যায় নি। সুবৰ্ণলতার শ্বশুরবাড়ির আশ্রয়?
তাই তো যাবার কথা।
রাগে দুঃখে অপমানে ধিক্কারে স্ত্রী-পুত্রের হাত ধরে বেরিয়ে যাবার কথা তো প্ৰবোধের। অথবা নষ্টচরিত্র স্ত্রীকে গলাধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়ার কথা!
কিন্তু তার কিছুই হয় নি।
আবার সুবর্ণ রান্নাঘরে এসে হেঁসেলের পালা ধরেছে, আবার খেয়েছ ঘুমিয়েছে, কথা বলেছে।
তারপর?
তারপর তো আরো দুই মেয়ে আর দুই ছেলে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল সুবৰ্ণর এ বাড়ির নীচের তলার সেই ঠাণ্ডা স্যাৎসেঁতে আঁতুড়ঘরটায়। যে ঘরে বছরে অন্তত পাঁচ-সাতবার সদ্যোজাতের কানু ওঠে।
অদৃশ্য অন্ধকার জগতে অবস্থিত যে সব বিদেহী আত্মারা পৃথিবীর আলো-বাতাসের আকাঙ্ক্ষায় লুব্ধ হয়ে ঘোরে, তাদের মুক্তির মাধ্যমে তো এই সুবৰ্ণলতার দল! ইচ্ছায় অনিচ্ছায় যারা মা হতে বাধ্য হয়! তাদের নিম্বফল নভেল পড়াটা বন্ধ করা দরকার। ও থেকেই যত অনিষ্ঠ এসে ঢোকে সংসারে!
