মুক্তকেশী সহসা যেন আকাশ থেকে হাত-পা ভেঙে ধপাস করে পড়েন।
সুবোধ!
সুবোধ বলেছে এই কথা!
কেন?
রীত-চরিত্তির মন্দ হয়ে যাচ্ছে না তো হতভাগার! ওই জাঁহাবাজ ভাদরবৌয়ের গুণ দেখেছেন তিনি! ভাদ্দরবৌ তাহলে গুণ-তুক করছে!
বড় দুঃখে আর রাগ আসে না-রুদ্ধকণ্ঠে বলেন, বটে! এই কথা বলেছে সুবো?
বলে তো! যখন তখন বলে! তা যাই বল পিসি, তুমিও তো সোজা মায়ের সোজা মেয়ে নও! জানি তো আমার ঠাকমাকে! কী নিধিটি ছিলেন!
মুক্তকেশী এবার ভয় খান।
কাণ্ডজ্ঞানহীন ছেলেটা কী বলতে কী বলে ঠিক কি?
উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, দুগৃগা, দুগ্গা, গঙ্গাচ্ছন করে এসে মাতৃনিন্দে শুনছি বসে বসে। চললাম বৌ।… এই ছুড়ি, চল। ওমা, কোথায় আবার গেল মুখপুড়ী?
গেছে। ওইদিকে বোধ হয়। পেয়ারা পাড়তে।
রাক্ষুন্সী যেন পেয়ারার যম। আবার এখন—
শ্যামাসুন্দরী আবহাওয়া হালকা করতে বলেন, তা সে আর কোন মেয়েছেলেটা নয়?
তা তো নয়—, মুক্তকেশী। আর একবার তোলা প্ৰসঙ্গ পেড়ে নামান, এই তো বললে তো? আমার মেজ বৌমার কাছে বল গিয়ে? শুনবে পেয়ারা খেলে নাকি পেট কামড়ায় ওঁর ছেলেমেয়েদের? চাপিটাকে সঙ্গে আনা বন্ধ করেছি কি সাধো? মা দজাল, মেয়েটা তো আমার পায়ের কাদা! ঠাকমা তোমার সঙ্গে যাব বলে রসাতল! মেম মা বলেন। কিনা, গঙ্গার ঘাটে বুড়ীদের দলে বসে রাজ্যের পাকা পাকা কথা শিখবে আর রাজ্যের ফল-পাকড় গিলে অসুখ করাবে—
আমি বলি, ও বটে! আচ্ছা! রইল তোমার মেয়ে। মাথা খুড়ে মরলেও আনি না। আর। বড়বৌমার এইটেকে নিয়ে আসি।
জগু বলে, এটা কিন্তু তোমার নিষ্ঠুরতা পিসি।
তা নিষ্ঠুর বলিস নির্মায়িক বলিস, সবই শুনতে হবে। মুক্তকেশী উদাস গলায় বলেন, সেদিন সেই কথার পর প্রবোধ কি এসে পরিবারের হয়ে হাতজোড় করে মাপ চেয়েছে? বলেছে কি মা, তুমি থোঁতা মুখ ভোঁতা করে ড্যাংডেঙিয়ে নাতনীদের নিয়ে গঙ্গাচ্ছনে যাবে, যা ইচ্ছা কিনে খাওয়াবে! বলে নি তো? তবে? তবে আর কিসের মায়া-মমতা আমার?
জগু সহসা উদ্দীপ্ত গলায় বলে ওঠে, তবে যদি বললে পিসি, এ তোমার শিক্ষার দোষ। এ যদি তোমার গোয়ার-গোবিন্দ জগু হত, বৌকে মেপে সাত হাত নাকে খৎ দেওয়াতো। মায়ের ওপর ট্যাফো! স্বৰ্গাদপি গরীয়সী না? আমার মা, আমি পাশ পেড়ে কাটতে পারি, তা বলে পরের মেয়ে উঁচু কথা বলবে? শাস্তরে বলেছে–
শ্যামাসুন্দরী বলেন, থাম খুব ধোষ্টামো হয়েছে! তোর মুখে শাস্ত্ৰবাক্য শুনলে স্বর্গে বসে মুনি ঋষিরা গালে মুখে চড়াবে!
ওই শোনো! দেখছো পিসি, কেন দু-চক্ষের বিষ দেখি বুড়ীকে? দিশে ধর্মে বলেছে কুপুত্ৰ যদ্যপি হয় কুমাতা কদাপি নয়। অথচ আমার ভাগ্যে হলো উল্টো! ভগবানের রাজ্যে একটা বেতিক্রম পটলের মা পলুতাপাতা, আর এই সংসারে এক বেতিক্রম জগার মা শ্যামাসুন্দরী! মাতৃনাম উচ্চারণে পাপ নিও না ঠাকুর। মাগো মা শ্যামা মা! যাক পিসি, বড়মানুষের মেয়েকে তুমি হুকুম করে যাও দিকি, ওই ওখানে শ্বেতপাথরের বাটিতে জল আছে, কৃপা করে একটু চরণ ড়ুবিয়ে রাখতে!
ফের জগা?
শ্যামাসুন্দরী ক্রুদ্ধ গলায় বলেন, ফের ধাষ্টামো?
চোখ রাঙিও না বলছি মা জননী— জগুও সমান গলায় বলে, বেশি বাড়াবাড়ি করবে তা ওই ঠ্যাঙ দুখানি ভেঙে এইখানে শুইয়ে রেখে দেব।
মুক্তকেশী আপসের সুরে বলেন, তুচ্ছ কথা নিয়ে তুমিই বা কেলেঙ্কার করছে কেন বৌ, দিয়ে দাও না!
শ্যামাসুন্দরী সহসা দুমদুম করে গিয়ে সেই পাথরবাটি-রক্ষিত জলে বা পায়ের বুড়ো আঙুলটা ড়ুবিয়ে আবার এসে বসে পড়েন।
জণ্ড সাবধানে বাটিটা উঠিয়ে নিয়ে সোল্লাসে বলে, ব্যাস, কেল্লা ফতে। দেখি এখন রাবন জেতে কি নিকষা জেতে!
ঝগড়ার শেষ শোনার সময় নেই, বেলা হয়ে যাচ্ছে। মুক্তকেশী ডাকেন, টেঁপি, এই হারামজাদী আয় না?
টেঁপি এগিয়ে আসে।
জগু তার হাতে চারটে পয়সা দিয়ে বলে, পুতুল কিনিস।
আবার পয়সা কেন? মুক্তকেশী অসন্তুষ্ট স্বরে বলেন, নিত্যি তোর পয়সা দেওয়া! ছুড়িও হয়েছে তেমনি লুভিষ্টে! হাত পেতেই আছে। নে চল চল, রোদ উঠে গেল। চলি বৌ। বলি হ্যাঁ গো, থরে থরে কত কুটনো কুটেছে! মা ব্যাটা দুটো মনিষ্যিতে তো খাবে!
শ্যামসুন্দরী চরম বিরক্তির স্বরে বলে, ব্যাটা যে একাই একশো! বাহান্ন ভোগ না হলে গলা দিয়ে ভাত নামবে? মাছ খাবি, চারখানা মাছ-সর্ষে রোধে দেব চুকে যাবে, তা নয়, মার হেঁসেলে নিরিমিষ্যি গিলবো! হাড়মাস পুড়িয়ে খেলো। আজ আবার আদালতের সমন, একথুনি বলবে ভাত দাও! তখন জলে পড়ি কি আগুনে পড়িা!
মুক্তকেশী আর দাঁড়ান না।
বাইরে আগুনের মত রোদ উঠে গেছে। বেলা দশটাতেই এত রোদ। মুক্তকেশীর মনে হয়, পৃথিবীর আবহাওয়াও বুঝি বদলে গেছে। তাঁদের বয়েসকালে আষাঢ় মাসে এত রোদ কখনো ছিল না।
পথে বেরিয়ে টেঁপি আবদারের সুরে বলে, একটা পালকি ডাকো না ঠাকমা, হাঁটতে ভালো লাগছে না।
মুক্তকেশী চড়া গলায় বলেন, ভাল লাগে না তো আসিস কেন লক্ষ্মীছাড়া! গঙ্গাচ্ছান করে মানুষের কাঁধে চড়বো!
আহা, গঙ্গার ঘাটের সেই মুটকি বুড়ীটা রোজ পালকি চড়ে না?
মুক্তকেশী বুড়ীর উল্লেখে হেসে ফেলে বলেন, সে বুড়ীর ক্ষ্যামতা নেই তাই চড়ে। পালকি আর আছেই বা কই? দেখতেই তো পাই না? যাবে, আস্তে আস্তে সবই উঠে যাবে। পালকি যাবে, আরু যাবে, গুরুজনে ভক্তিছেদা যাবে, ধর্মাধৰ্ম পাপপুণ্যি সবই যাবে। স্বদেশীর হুজুগে। দেশ ছারেখারে যাবে পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।… সাহেবের রাজ্যিপাট, তোরা যাচ্ছিস তাদের উৎখাত করতে! বলি ওদের উচ্ছেদ করে করবি কি! রাজ্যি চালাবি? হুঁ! সুখের পৃথিবীতে ইচ্ছে করে আগুন জ্বালা!
