বিল তো পিসি বল তো!
জগু বুকে থাবড়া মেরে মিটমিটি হাসে।
শ্যামাসুন্দরী বিরক্ত গলায় বলেন, ভাইপোর সুয়ো হয়ে খুব তো বলছো ঠাকুরঝি, বলি আজ যদি আমি ওর হাতে পড়ি, কাল আমায় আঁচল পেতে ভিক্ষে করতে হবে না? আমার কি পেটের আর পাঁচটা আছে যে, ও না খাওয়াক আর একজন খাওয়াবে? আমি যাই মা বসুন্ধরার মতন সহ্যশীলা, তাই ওকে সহ্য করছি। অন্য মা হলে ওই ছেলের মুখে নুড়ো জ্বেলে দিয়ে চলে যেত।
ভাজকে যে ভালবাসেন না মুক্তকেশী তা নয়। সময়-অসময়ে অনেক করে ভাজ। তবু ঝোল তার কোলে টানেন না। বলেন, নুড়ো তোমার বুদ্ধির মুখেই জ্বালতে হয় বৌ! মামলা-মকদ্দমা হল বাইরের কাজ, বাপে-বেটায় হচ্ছে, ভাই-ভাইয়ে হচ্ছে, এই তোমার মতন গুণবতী মায়ের সঙ্গে হচ্ছে, তাই বলে মানুষ ধর্মাধর্ম ছাড়বে? মায়ে-বোটায় লাঠা-লাঠি বলে কি তুমি মরলে ও হবিষ্যি গিলবে না? না মাথা মুড়োবে না?
জগু এতক্ষণ দুই কোমরে হাত দিয়ে বীরের ভঙ্গীতে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল, এবার পরম সন্তোষের সুরে বলে, এই দেখো জ্ঞানবানের কথা! বুঝলে পিসিমা, এই সহজ কথাটুকু আর ওই নিকষা বুড়ীকে বুঝিয়ে উঠতে পারলাম না! কথায় বলে, স্বৰ্গাদপি গরীয়সী! বলে কিনা? তুমি জ্ঞানবান, বুঝমান, তোমার সঙ্গে কথা কয়ে সুখ আছে!
শ্যামাসুন্দরী টিটকিরি দিয়ে ওঠেন, তা সুখ থাকবে না কেন? কোলে ঝোল টানলে সবাই জ্ঞানবান! বলি, তোমার ছেলেরা এ রকম হলে কী বলতে ঠাকুরঝি! ভাগ্যিগুণে তারা সবাই ভাল, তাই। আমার হচ্ছে এক ব্যানুন নুনে বিষ!
ভাগ্যিগুণে নয় হে-বুদ্ধির গুণে! জগু রায় দেয়, পিসির ছেলেরা কি আমনি ভাল হয়েছে? কথাতুই আছে, যেমন মা, তার তেমন ছা! তা যেমন তুমি তেমনি তোমার পুত
জ্ঞানপাপী!
বলে শ্যামাসুন্দরী মুখ বাঁকিয়ে আবার কুটনো কুটিতে বসেন।
মুক্তকেশী ও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে বলেন, তাও বলি বৌ, ছেলে কেন বাউণ্ডুলে হবে না? বয়েস পার হয়ে গেল ছেলের, তুমি বিয়ে দিলে না–
কথাটা সত্যি।
বিয়ের বয়েস কোন কালে পার হয়ে গেছে জগুর। মুক্তকেশীর বড় ছেলে সুবোদের থেকেও বড় সে। কিন্তু পাত্র হিসেবে যে সুপোত্র নয় সে কথা বলাই বাহুল্য। লেখাপড়ায় জলাঞ্জলি দিয়ে ছেলেবেলা থেকে কেমন করে যেন গাঁজার আড্ডায় ভিড়ে পড়েছিল, আবার এখন এক অবধূত বাবার শিষ্য হয়েছে।
মুক্তকেশী আগে বহু চেষ্টা করেছেন হাল ধরতে, কিন্তু নৌকো ঠেলে নিয়ে যেতে সক্ষম হন নি। হন নি। অবশ্য জগুরই প্রবল প্রতিবন্ধকতায়, তবু তিনি যখন তখন ভাজকেই দোষী করেন। এখনো করলেন, বয়সের ছেলে, সময়ে বে-থা না হলে—
থামো ঠাকুরঝি, ওকথা মুখে এনে না। আর—, শ্যামাসুন্দরী গুরুজনের সম্মান ভুলে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, নিজে তো ওই এক ভূত বিইয়ে জ্বলে পুড়ে মরছি। আবার কি পরের মেয়ের কপালে তেঁতুল গুলতে সেই ভূতের বিয়ে দেব? পাগল তো হই নি এখনো!
প্রশ্নটা তামাদি হয়ে গেছে, তবু মুক্তকেশী অসন্তুষ্ট স্বরে বলেন, তার মানে তুমি চাও আমার বাপের বংশটা লোপ পাক?
পেলে আর করছি কি! শ্যামাসুন্দরী বলেন কত কত রাজা-বাদশার বংশ লোপ পাচ্ছে!
তবে আর কি! লোকের গলা কাটা যাচ্ছে তো আমার গলাটাও কাটি! তুমি না দাও, আমি এবার জগুর বিয়ে দেব। বলতে কি, সেই উদ্দিশ্যেই আসা আজ। গঙ্গার ঘাটে এক মাগী কেন্দে পড়লো। বলে, গলায় গলায় আইবুড়ো মেয়ে, ইচ্ছে হয় যে গলায় দড়ি দিই! দিদি যদি একটা পাত্তরটাত্তর দেখে দেন! আমার মনে এল জগুর কথা। এখনো যদি ধরে করে একটা বিয়ে দিতে পারা যায়–
জগু বলে ওঠে, এই দেখো পিসির দুর্মতি! বলি নিজেই তো বলে মর, ছেলেগুলো তোমার সব বৌয়ের গোলাম হয়ে আছে, বৌরা কান ধরে ওঠাচ্ছে বসাচ্ছে, আবার এ হতভাগার কানের মালিক আনার চেষ্টা কেন?
মুক্তকেশী সহাস্যে বলেন, শোনো কথা ছেলের! আগে থেকেই বুঝি গোলাম হয়ে বসছিস? বলি, সবাই তা হবে কেন? বৌকে পায়ের পাপোষ করে রেখে দিষ্টান্ত দেখা তুই!
হুঁ, দেখাবো বললেই দেখানো হয়! জগু বিচক্ষণের ভঙ্গীতে বলে, এই বেড়ালই বনে গেলে বন-বেড়াল হয়, বুঝলে পিসি? তার ওপর আবার আমার রক্তে আমার বাপের গুণ!
বটে, বটে। রে হতভাগা পাজী বাঁদর-, শ্যামাসুন্দরী ছিটাফিটিয়ে ওঠেন, দূর হ দূর হ আমার সুমুখ থেকে। মরা বোপকে গাল দিচ্ছিস লক্ষ্মীছাড়া? নরকেও ঠাঁই হবে তোর?
নরকে ঠাঁই চাইতে যাচ্ছে কে? জগু বুকে আর একটা থাবড়া মেরে বলে, সিগাগো থাকতে নরকে যেতে যাব। কী দুঃখে? মরণকালে মা মা করে মরব, মাতৃনামে তরে যাব। তবে ওই বিয়েটিয়ের কথা কইতে এসো না পিসি। বিয়ে করেছি। কি গোল্লায় গেছি!
তা যা বলেছিস-
মুক্তকেশী সহসা নিজ যুক্তি বিস্মৃত হয়ে একগাল হেসে বলেন, তা যা বলেছিস। এ ছোঁড়া দেখছি না পড়েই পণ্ডিত! বলেছিস ঠিক। আমার ছেলেগুলো কি আর মনিষ্যি আছে? বিশেষ করে পেবোটা! যেটা নাকি সব চেয়ে ডাকাবুকো ছিল! সেরেফ ভেড়া হয়ে বসে আছে। বৌ দজ্জালি করলে তেড়ে একবার করে মারতে আসে, আবার কেঁচো হয়ে গুটিয়ে পালায়। লাখোবার বলেছি, ও বৌ ত্যাগ দিয়ে আর একটা বিয়ে কর। সে সাহসও নেই। দিলে একবার বাহাদুরি দেখিয়ে বিদেয় করে, ওমা বৌ। কিনা তৎক্ষণাৎ বাপের সঙ্গে ফিরে এল!
এবার জগু একটু গম্ভীর হয়।
বলে, এটা পিসি তোমার অন্যায্য কথা হচ্ছে। তোমার মেজবৌকে তুমি অন্যায় নিন্দে করা। সুবো। আমায় বলেছে, আমার মায়ের হাতে না পড়ে অন্যত্র পড়লে, ওই বৌয়ের ধন্যি ধন্যি হত।
