এই যে যমের দক্ষিণ দোর থেকে। লক্ষ্মীছাড়া হাড়হাবাতে ছেলে ছেকল তুলে রেখে দিয়ে গেছে।
ওমা সে কি কথা!
মুক্তকেশী এগিয়ে আসেন।
পিছনের মেয়েটা হঠাৎ হি হি করে হেসে ওঠে, মামী-ঠাকুমাকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছে—
মুক্তকেশীর মুখেও একটু হাসি ফুটে ওঠে। তবে সেটা গোপন করে তাড়া দিয়ে ওঠেন, মরণ আর কি! হেসে মরছিস যে— তারপর কপাটের শিকলটা খুলে দেন ছড়াৎ করে।
রান্নাঘরের মধ্যে বসে কুটনো ফুটছিলেন শ্যামাসুন্দর, মুক্তকেশী ঢুকতেই বঁটিটা ঠেলে রেখে
মেয়েটা আর একবার হেসে ফেলে পরনের বৌপাগলা শাড়িখানার আঁচলটা মুখে চাপা দিয়ে বলে, মামী-ঠাকমা বুঝি দুষ্টুমি করেছিলে? তবে জ্যাঠামশাই শাস্তি দিয়ে গেছে?
শ্যামাসুন্দরী এ হাসির উত্তরে হাসেন না-বিরক্তি কুঞ্চিত স্বরে বলেন, দুষ্টুমি কেন, জন্ম জন্ম মহাপাতক করেছিলাম, তাই এত শাস্তি ভোগ করছি।
মুক্তকেশী মেঝোয় বসে পড়ে বলেন, হলো কি?
কী হলো তা জানে যম! আদালতে আজ নাকি মামলার দিন আছে, তাই আমার মাতৃভক্ত সন্তান মায়ের পাদোদক্ খেয়ে যাত্রা করবেন!
মুক্তকেশী মামলা সম্পর্কে কিছুটা অবহিত আছেন। দেশের জমিজমা নিয়ে মায়ের নামে মামলা ঠুকে বসে আছে জগু।
জমিজমা বাগান পুকুর আছে বেশ কিছু। সব জ্ঞাতিরা খাচ্ছে। তাই শ্যামাসুন্দরী সেই জ্ঞাতি দ্যাওর ও ভাসুরপোদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, এই জবরদখলটি ত্যাগ করে তোমরা মানে মানে আমার প্রাপ্য অংশের টাকাটি ফেলে দাও।
জগু মাকে চোখ রাঙিয়েছে।
বলে, বলি প্ৰাপ্য কার? তোমার না। আমার? ওসব আমার ঠাকুর্দার বৈ তোমার ঠাকুর্দার নয়! তুমি পরের বাড়ির মেয়ে, উড়ে এসে জুড়ে বসে রমানাথ মুখুয্যের ভিটে থেকে তার বংশধরদের তাড়াবার কে হে?
অতঃপর মায়ে বেটায় লেগে গেছে লোগ। ঝামাঝাম, ফলশ্রুতি নালিশ! শ্যামাসুন্দরী দেবী জগন্নাথ মুখুয্যের ন্যায্য সম্পত্তির উপর অনধিকার হস্তক্ষেপ করছেন।
মুক্তকেশী জানেন এ কথা, কিন্তু দরজা বন্ধের ব্যাপারটা রহস্যজনক। তাই হেসে ফেলে বলেন, মায়ের সঙ্গে মামলা লড়ে মায়ের পাদোদক জল খেয়ে জিততে যাবে? তা বেশ। কিন্তু ছেকল কেন?
শ্যামাসুন্দরী উত্তর দেবার আগেই পিছন থেকে উত্তর দিয়ে ওঠে শ্ৰীমান জণ্ড। বাজখাই গলায় বলে ওঠে, ছেকল কেন? বলুক-বলুক, ওই নিকষা বুড়ী নিজেই বলুক ছেকল কেন? একদণ্ড পূজোয় বসেছি, অমনি ননদের কাছে ছেলের নামে লাগানো-ভাঙানো হচ্ছে, কেমন?
জগু একটা তাচ্ছিল্যের হুঙ্কার ছাড়ে।
পরনে ফরসা হলদেটে রং একখানা খাটো বহরের কেটে ধুতি, লোমশ বুকের উপর একছড়া রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে রক্তচন্দনের ফোঁটা। পিসির গলার সাড়া পেয়ে নিঃশব্দে এসেছে দোতলা থেকে।
শ্যামাসুন্দরী মুখ বঁকিয়ে বলেন, ওই শোনো ঠাকুরঝি, নদেরচাঁদ ভাইপোর বাক্যি শোনো। তোর নামে লোকের কাছে লাগাতে বসবো, এত সস্তা জিভ আমার নয় রে লক্ষ্মীছাড়া!
শুনে যাও পিসি শুনে যাও—, জগু দরাজ গলায় বলে, দেখো পেটে পেটে কী শয়তানির প্যাঁচ। হবে না? দাদামশাইটি আমার কেমন ঘুঘু ছিলেন! নাম করলে হাঁড়ি ফাটে। তাঁরই কন্যে তো! যেই শুনেছে আজ মামলার দিন, অমনি পা নুকিয়ে বসে আছে! হেতু? না পাছে জবরদস্তি করে পাদোদক জলটুকু নিই।… আমিও বাবা তেমনি বজাত, দিয়েছি। দরজায় ছেকল তুলে। বেরোতে তো হবে একসময়। দেখি তখন কেমন করে পা আটকায়? পূজো সেরে এসে ওই চৌকাঠে জল ঢেলে ওৎ পেতে বসে থাকতাম। ছেকল খোলা পেয়ে যেমনি না বেরোবে, পড়বে তো পা জলের ওপর? সেই জল চেটে মেরে দেব-
নিজের বুদ্ধি-গরিমায় হা হা করে হেসে ওঠে জগু।
শ্যামাসুন্দরী তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন, ওরে আমার মাতৃভক্ত পুত্তুর রে! চব্বিশ ঘণ্টা মাকে পাশ পেড়ে কাটছেন, মায়ের নামে মামলা ঠুকে রেখেছেন আবার ঢং করে আসেন চন্নামেত্তর খেতে! জুতো মেরে গরু দান!
সমর্থনের আশায় নিনদের দিকে তাকান শ্যামা।
মুক্তকেশী কিন্তু ভ্ৰাতৃবধুর কথায় সমর্থন করেন না। অসন্তুষ্টভাবে বলেন, তা বললে কী হবে বৌ, এ তোমার অনেয্য কথা! তুমি যদি সোয়ামীর মরণকালে তার কানে বিষমন্তর ঝেড়ে পেটের ব্যাটাকে বঞ্চিত করে যথাসর্বস্ব নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে থাকো, ও কেন হকের ধন ছাড়বে? এ হলো নেয্য দাবির কথা। তা বলে ছেলের তুমি মাতৃভক্তির কসুর পাবে না।
শ্যামাসুন্দরী যদিও বড় ননদকে যথেষ্ট খাতির করে চলেন, তবু এতটা অসহ্য সব সময় সইতে পারেন না! গৰ্জন করে বলেন, অমন মাতৃভক্তির ক্যাথায় আগুন! ও ছেলের মুখদর্শন করলে নরক দর্শনের কাজ মেটে। বলি ঠাকুরঝি, সব্বস্ব নিজের নামে লিখিয়ে নেবো না তো কি সব্বস্ব ওই বাউড়ুলে উড়নচণ্ডে অকাল কুষ্মাণ্ড গেঁজেলটার হাতে তুলে দিয়ে ঘুচিয়ে পুচিয়ে দেব? ওর হাতে পড়লে এ ভিটেয় এসে দাঁড়াতে পেতে? একখানা একখানা করে ইট বেচে গাঁজা খেত না? আর ওর সেই গেঁজেল গুরুর সেবায় লাগাত না? আবার উদারতা কতা! জ্ঞাতিরা লুটেপুটে খাচ্ছে খাক! তাদের ঠাকুর্দার সম্পত্তি! নিজের যে তাহলে এরপর মালা হাতে করে ভিক্ষেয় বেরুতে হবে!
শ্যামাসুন্দরী একটু দম নেন।
মুক্তকেশী কিন্তু এহেন বিভীষিকার আশঙ্কাতেও দামেন না। জোর গলায় বলেন, তা হত হতই! ওর বাপের সম্পত্তি ও ওড়াতো! আর কারুর বাপের বিষয়ে তো নোখ ডোবাতে যেতো না! নেশা-ভাঙ আবার কোন বেটা ছেলেটা না করে? তাই বলে হকের দাবি পাবে না?
