ক্ষিপ্ত মেজদা অতএব বৌ শায়েস্তা করবার ভার নেয়। থার্ড ক্লাস ঘোড়ার গাড়ি একখানা ডেকে আনে।
যে গাড়িতে চাপিয়ে এ বাড়ির মেজবৌকে নির্বাসন দেওয়া হবে। মেজবৌ যাবে একা, একবস্ত্ৰে। মেয়েটা আর ছেলে দুটো থাকবে এ বাড়িতে। তারা এ বংশের। সুবৰ্ণলতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা হবে না।
যদি কোনোদিন পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে চিঠি লেখে, তবেই হয়তো আবার ওদের মুখ দেখাতে পারবে সুবর্ণ। নচেৎ এ বাড়ির অন্নজলের বরাত উঠল। ওর। বরাত উঠল স্বামী-সন্তানের সঙ্গর।
আড়ালে-আবডালে সবাই প্ৰবোধকে স্ত্রৈণ বলে। দেখুক আজ তারা।
নিজেই বনবাস দিয়ে আসবে সীতাকে।
মুক্তকেশী। কিন্তু এ ভূমিকায় নেই।
মুক্তকেশী সেই যে জপের মালা নিয়ে বসেছেন, নড়ন-চড়ন নেই তার থেকে।
সুবৰ্ণর বড় মেয়ে চাঁপা মায়ের এই দুৰ্গতিতে কাঠ হয়ে বসে থেকে একসময় ঘরে গিয়ে কাঁদতে বসেছে, ভানু কানু দুই ছেলে মার সঙ্গে যাবো—করে পরিত্ৰাহি চেঁচিয়ে অবশেষে জেঠির কাছ থেকে খেলনা পুতুল খাবার পেয়ে চুপ করেছে, কর্তারা কে কোন দিকে গেছেন, গিন্নীরা আরদ্ধ কাজের ভার আবার হাতে তুলে নিয়েছে, মুক্তকেশী নির্বিকার।
প্ৰবোধের কাজটা তার সমর্থন পেলো কি পেলো না, তাও বুঝতে পারে না প্ৰবোধ।
এর চাইতে যদি মুক্তকেশী গলা খুলে বলতেন, বেশ করেছে প্ৰবোধ, এত বড় জাঁহাবাজ মেয়ে তিনি ভূভারতে দেখেন নি, অনেক আহ্লাদের ব্যাপার হতো!
এটা কী হলো?
লাঠিটা ভাঙলো, সাপটা মরলো না!
বৌ বিতাড়িত হল, মা প্ৰসন্ন হলেন না!
১.১০ মুক্তকেশীর সংসারের অন্নজল
কিন্তু মুক্তকেশীর সংসারের অন্নজল কতদিনের জন্যে উঠেছিল সুবৰ্ণলতার?
সে ইতিহাস জানতে হলে টাইট-বঁধুনি তো দূরের কথা, একেবারে অবাঁধা। বুরো ঝুরো পাতাগুলো তার এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে, উড়ে বেড়িয়েছে।
তবু সেই বিদেয় করে দেওয়ার অধ্যায়টা খুঁজে পেতে দেখে এইটুকু দেখা যায়, বাড়ির দরজায় ঘোড়ার গাড়ির শব্দ পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন সুবৰ্ণলতার বাবা নবকুমার বাঁড়িয্যে। ফর্সা ধবধবে রঙ, নিটোল গড়ন, চুল কাঁচা-পাকা। হয়তো বা কাঁচার থেকে পাকার সংখ্যাই বেশি।
পরনে ফতুয়া, পায়ে বিদ্যাসাগর চটি। একদা সরকারী কোনো এক অফিসের বড়বাবু ছিলেন, রিটায়ার্ড। ঘরকুনো মানুষ, বাইরে বেরোন কমই। সারাদিন বাড়ি বসে ছেলের বেঁকে টিকটিক করেন। আর নাতি নিয়ে সোহাগ করেন।
বেরোনোর মধ্যে সৌদামিনী দেবীর বাড়িতে একটু বেড়াতে যাওয়া। বৃদ্ধা বিধবা, নবকুমারের দূর সম্পর্কের দিদি। বহু দুঃখ-কষ্ট পার হয়ে আর বহু কৰ্মক্ষয় করে শেষ জীবনে পেয়েছিলেন কিঞ্চিৎ সুখের স্বাদ, কিন্তু সাইল না।
বুড়োটি গত হলেন।
অবিশ্যি সৌদামিনীর যা বয়েস তাতে বৈধব্যটাই স্বাভাবিক, তবে বহু কষ্ট পেয়ে সবেই তো স্বামী পেয়েছিলেন। তার সতীনই সর্বস্ত দখল করে রেখেছিল।
স্বামী গেছেন, সতীন গেছে, এখন একা সতীনের ছেলে।পুলে বৌ জামাই সব নিয়ে সংসার করছেন।
এই সংসারটাই দেখে পরিতৃপ্ত হন নবকুমার। তাই ছুটে ছুটে আসেন। এ সংসারে পুরনোর ছাপ বিদ্যমান, কারণ সৌদামিনীর হাতেই তো গড়া। যে সৌদামিনী নবকুমারের দিদি।
নবকুমারের মনের সঙ্গে খাপ খায় না। সে পছন্দ, সে রুচি!
কিন্তু বৌয়ের বা দোষ কি? শ্বশুর মনের মত রুচি-পছন্দ সে পাবে কোথায়? শাশুড়ীকে কি চক্ষে দেখেছে?
বিয়ের কনের থেকেই গিন্নী হতে হয়েছে তাকে। সংসারত্যাগিনী শাশুড়ীর পরিত্যক্ত সংসারটাকে কুড়িয়ে তুলে নিতে হয়েছে ছোট দুটি হাতে।
সংসারও অবিশ্যি ছোট, শ্বশুর দ্যাওর স্বামী। কিন্তু ছোট বলেই যে হাল্কা তা তো নয়। পাষাণবার। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই যে উত্তরাধিকার সেটা সহজ, সেটা কোমল, কিন্তু এ তো তা নয়।
স্বেচ্ছায় সংসারটাকে ত্যাগ করে চলে গেছে সংসারের গিন্নীটা! ছেলের বিয়ে সব ঠিকঠাক, তখনই অকস্মাৎ মেয়ের বিয়েকে কেন্দ্র করে এই কাণ্ড।
যথানির্দিষ্ট দিনে ছেলেটার বিয়ে হয় নি বটে, তবু বিয়েটা হলো। কারণ শাশুড়ী সত্যবতী নাকি এ সম্বন্ধ স্থির করে গিয়েছিলেন।
শ্বশুর সেই ইচ্ছেকে প্ৰাধান্য দিয়েছিলেন।
বৌ সুধীরবালা।
মানুষ খারাপ নয়, তবু নবকুমার যেন তাকে তেমন মেহের চোখে দেখেন না, পয়-অপয় কথাটা বিশ্বাস করেন। তিনি।
হাঁচি টিকটিকি মঙ্গলবার সব কিছুতেই পরম বিশ্বাস নবকুমারের। আজও পঞ্জিকাখানা হাতে নিয়ে উল্টে দেখছিলেন, কটা থেকে বেলা কটা পর্যন্ত মূলো খেতে নেই।
হঠাৎ এই ঘোড়ার গাড়ির শব্দ! এই বাড়ির দরজাতেই থামালো!
নবকুমার পঞ্জিকাখানা তাকের উপর রেখে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসেন, আর হাঁ করে দেখেন ভয়ঙ্কর অপরিচিত। আর বেশি পরিচিত এক নারীমূর্তি নেমে আসছে গাড়ি থেকে।
কে!
কে ও!
নবকুমার যেন আর্তনাদ করে ওঠেন। এত বাৰ্ধক্য এসেছে তাঁর, তাই এত দৃষ্টিবিভ্রম! না, না!
নবকুমার তাই আৰ্তনাদ করে ওঠেন।
কিন্তু এই বিচলিত ভাবটা মুহূর্তমাত্র স্থায়ী হলো, পরীক্ষণেই সে ভাব বদলে গেল। বিস্ময়বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখলেন নবকুমার, ভাড়াটে এই গাড়িটা, যাকে নাকি ছ্যাকরা গাড়ি বলা হয়, সেটা ওই নারী আরোহিণীকে নামিয়ে দিয়েই উল্টো মোচড় দিয়ে গড়গড় করে চলে গেল।
তার মানে যে পৌঁছুতে এসেছিল, সে নামল না। সে পত্রপাঠ বিদায় নিল।
অর্থাৎ মানুষটাকে নির্বাসন দিয়ে গেল।
এর মানে কি?
পরমাকাজ্যিক্ষত মূর্তির এ কী অনাকাঙ্ক্ষিত রূপে প্ৰকাশ!
