তবে যা, বল গে এইমাত্তর—ইয়ে কলঘরে ঢুকেছে।
আমি বাবা মিথ্যে-টিথ্যে বলতে পারবো না, ইচ্ছে হয় যাবে, না ইচ্ছে হয় না যাবে! বলে ধৰ্মপুত্রের মহিলা সংস্করণ মল্লিকা ধর্মের মহিমা বিকীর্ণ করে চলে যায়। মনে হয় একটা গিন্নী!
অগত্যাই যেতে হয় প্ৰবোধকে বলির পাঁঠার গতিভঙ্গী নিয়ে।
মুক্তকেশী ছেলেকে দেখে জলদগম্ভীরে বলেন, বাবা প্ৰবোধ! মুখ্যু মেয়েমানুষ, একটা অসঙ্গত কথা না হয় বলেই ফেলেছি, ঘাট মানছি তার জন্যে। কিন্তু অপরাধের শাস্তি দিতে নিজে তুমি ধরে সাত ঘা জুতো মারলে না কেন আমায়? বৌকে দিয়ে এই অপমানটা করানোর চাইতে সে অনেক ভাল ছিল!
মা! প্ৰবোধচন্দ্ৰ প্ৰায় আছড়ে মায়ের পায়ের কাছে পড়ে বলে মা, তোমাকে অপমান করার সাহস যার হয়েছে জুতো তারই খাওয়া উচিত! কোথায় সে! এখনি একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক।
মুক্তকেশী অবশ্যই একটু প্রীত হন।
নচেৎ তুমি ছেড়ে তুই ধরতেন না।
বলেন, থাম পেবো! বীরত্বের বড়াই আর করিস নে। এদিকে তো বৌয়ের ভয়ে কেঁচো হয়ে গুটিয়ে যাস! পুরুষের হিম্মত যদি থাকতো তোর, তোর বৌ এমন দুঃশাসন হয়ে উঠত না!
প্ৰবোধচন্দ্ৰ জননীর এই ধিক্কারবাক্যে সহসা দুঃশাসন-শাসক ভীমমূর্তি ধারণ করে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, মল্লিকা, ডেকে আন তোর মেজকাকীকে! সোজায় না আসে চুলে ধরে নিয়ে আয়!
মুক্তকেশীর কুলিশকঠোর ওষ্ঠ্যাধরের ফাঁকে বোধ হয় ক্ষীণ একটু হাসির আভাস দেখা যায়। কিন্তু সেটুকু দমন করে ফেলে বলেন, থাক বাছা, কেলেঙ্কারিতে আর কোজ নেই। যে যেমন আছে থাক। আমাকে তোমরা আজই কাশী পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা কর। বেটার বোয়ের লাথি খেয়ে সংসার কামড়ে পড়ে থাকবার প্রবৃত্তি আমার নেই।
কিন্তু মুক্তকেশীর কথা শেষ হতে না হতেই ঘরের মধ্যেই কি কেউ দাগলো? না হলে সবাই আমন চমকে উঠল। কেন?
বোমা না হলেও বোমার মতনই শক্তিশালী! মৃদু অথচ তীক্ষ্ম একটি প্রতিবাদ!
অপমান আমি কাউকে করি নি। কথার জোরে, নয়কে হয় করলে কী করবো!
বললো।
বললো এই কথা সুবৰ্ণলতা।
বরের সামনে, বড় বড় দ্যাওরদের সামনে, স্পষ্ট গলায় শাশুড়ীর কথার প্রতিবাদ করলো।
বজ্রাহত ভাবটা কাটলে মুক্তকেশী একটু তিক্ত হাসি হেসে বলেন, এর পরও আর তোমরা আমায় এ সংসারে থাকতে বল বাবা? না হয়। আমি তোমাদের শাখা-চুড়ি পরা মা নয়, তবু মা তো—
বড়বৌ!
হঠাৎ যেন ঘুমন্ত বাঘ গর্জন করে উঠল, বড়বৌ! বড়বৌ! চিৎকারে বাড়ি থরথরিয়ে ওঠে।
দোষ করেছে মেজবৌ, ডাক কেন বড়বৌকে?
কেউ বুঝতে পারে না।
সবাই থারথার করে।
বড়বৌ তো মেজ দ্যাওরের সঙ্গে কথাও কয় না। তথাপি এই ডাকের পর বসেও থাকতে পারে না। রণস্থলে হাজির হয়ে ঘোমটা দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে।
প্ৰবোধচন্দ্ৰ উত্তেজিতভাবে বলে, বড়বৌ, তোমাদের মেজবৌকে বল মার পায়ে ধরে ক্ষমা চাক!
ওঃ, তাই!
তাই বড়বৌ!
মায়ের সামনে সরাসরি স্ত্রীকে সম্বোধন করে চলে না, তাই বড়বৌকে মাধ্যম করা!
অবশ্য আশা ছিল বড়বৌকে আর কষ্ট স্বীকার করতে হবে না, এই হুমকিই যথেষ্ট। কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড! এত বড় তর্জনের পরও কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে রইল সুবৰ্ণলতা।
বড়বৌ, ওকে ঘাড় ধরে ক্ষমা চাওয়াও।
উমাশশী কাছে এসে মৃদুস্বরে বলে, সঙ্গের মতন দাঁড়িয়ে রাইলি কেন মেজবৌ? যা, মাপ চা!
সুবৰ্ণলতা মুখ তুলে উমাশশীর দিকে তাকালো। আর সে দৃষ্টিতে উমাশশী যেন হিম হয়ে গেল। শাশুড়ী ফ্রাধের অনেক ভয়াবহ দৃষ্টি দেখার অভ্যাস আছে তার, এমন চাউনি কখনো দেখে নি।
এ কী!
সুবৰ্ণলতা কি পাগল হয়ে গেল?
এ যে স্পষ্ট পাগলের চোখ!
সেই চোখ তুলে সুবৰ্ণলতা তীব্ৰস্বরে বলে, কেন?
মাপ চাইব কেন? উমাশশী বলে, চাইলেই তো সব গোল মিটে যায় ভাই। বল্—বল লক্ষ্মীটি, মা, যা বলেছি, না বুঝে বলেছি।
কিন্তু উমাশশীদের হিসেবমত গোল মিটোতে পারলে তো পৃথিবীটাই সমতল হয়ে যেত। তা হয় না।
সুবৰ্ণলতার মুখ দিয়ে সে কথা বার করানো যায় না। সুবৰ্ণলতা বলে, না। বুঝে তো বলি নি, বুঝেই বলেছি।
হ্যাঁ, বুঝেই বলেছে সুবৰ্ণ শাশুড়ীকে, বাবার সঙ্গে সম্পর্ক তুলে দিয়ে রাখা হয়েছে, বাবা যখন উদ্দিশ করেছেন, তখন দূর-দূর করে খেঁদিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর এখন নিজের সংসারে ভাতের আকাল হয়েছে বলে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে! খুব তো মানের বড়াই, কাকে মান বলে, কাকে অপমান বলে, সে জ্ঞান নেই!
বলেছিল।
আবার এখন বলছে, না বুঝে বলি নি!
অবাক হয়ে গিয়েছিল বাড়ির প্রতিটি সদস্য। এমন কি সুবোধও। বিরক্ত হয়ে বলেছিল, পেবোটা শিক্ষা-সহবৎ দিতে জানে না।
আর মুক্তকেশী?
মুক্তকেশী শুধু স্তম্ভিতই হন নি, যেন একটু ভয়ও পেয়েছিলেন। একটা ভয়াবহ ভবিষ্যৎ যেন দাঁত খিঁচিয়ে উঁকি মারছে তাঁর জীবনের সীমানা-প্রাচীরের ওধার থেকে। পড়বে বুঝি লাফিয়ে!
যাক তবু এখুনি সে ভয়কে আমল দেবার দরকার নেই। ঘরের খিল-হুড়কো আছে মজবুত। ছেলেরা আজও মায়ের পদানত। আজও একটা বৌকে দূর করে দিয়ে ছেলের আর একটা বিয়ে দিতে পারেন মুক্তকেশী!চ
প্রভাস বলেছে, ওকালতি করছি, কোর্ট-কাছারি দেখছি, ভদ্রঘরের মেয়ে যে এমন বে-সহবৎ হয়, এ ধারণা ছিল না। এ সমস্তই মেজদার বুদ্ধিহীনতার ফল! মেয়েমানুষকে কখনো আস্কারা দিতে আছে? সর্বদা চোখরাঙানির নিচে রাখলে তবে শায়েস্তা থাকে।
প্রকাশ বলেছে, পয়সা দিয়ে আর এস্টারে গিয়ে থিয়েটার দেখতে হবে আমাদের, বাড়ি বসেই অনেক থিয়েটার দেখতে পাওয়া যাবে। বিয়েটা জব্বর করেছিল মেজদা!
