হ্যাঁ, হেমাঙ্গিনীই বলেছে, ওই দজাল পরিবারকে তো তোর পেবো মাথায় করে নাচে, বলি সদা-সর্বদা অতি দাপট সয়ে থাকিস কি করে? বৌ তো একন্দোরী!
মুক্তকেশী বলেছিলেন, কী করবো বল? অসহ্য হলে বেটার বৌকে লোকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়, আমার তো ওর বেলায় সুখ হবার জো নেই। সদা-সর্বদাই বুকের ওপর আগুনের মালসা নিয়ে বসে আছি।
হেমাঙ্গিনীই তখন এই পরামর্শ দিয়েছিলো, বিরোধ মিটিয়ে ফেল! জিদ নিয়ে কি ধুয়ে জল খাবি? আর সত্যি তো তোর বেয়ানমাগী কুচরিত্তির নয়! কাশীতে আছে, শুনি নাকি ডাটের ওপর আছে। বাপের পয়সা খায় না, খোট্টাদের ছেলেমেয়েকে বাংলা, ইংরিজি পড়িয়ে মাইনে নেয়, সেই পয়সার চালায়। তুই বাপু তোর মেজবৌয়ের বাপের বাড়িটাকে এবার জাতে তোলা। তুইও দুদিন হাফ ফেলে বাচ, মহারাণীও দুদিন বাপ-ভাইয়ের ওপর দাপট করে আসুক!
অতএব এই জাতে তোলার প্রয়াস!
কিন্তু সে প্রয়াসে যার বর্তে যাবার কথা, সে-ই বাদী হচ্ছে! বলছে, আমি চাই না। তার মানে মেয়েমানুষ নয়, পাষাণী!
প্ৰবোধকে অতএব অবাক হয়ে বলতে হয়, আশ্চর্য!
সুবৰ্ণ তীক্ষ্ণ গলায় বলে, ওঃ, এইটুকুতেই আশ্চর্য হচ্ছে তুমি? তা হতে পার, তোমাদের অসাধ্য কাজ নেই। তবে ভাবছি—এত বছর বিয়ে হয়েছে, বাপ-ভাইয়ের চেহারা কেমন তা ভুলে গেছি, এখন উপযাচক হয়ে বৌ পৌঁছে দিয়ে আসতে মাথা কাটা যাবে না তোমাদের?
মাথা যে একেবারেই কাটা যাচ্ছিল না তা নয়। তবু আর একজন যে প্রত্যক্ষ হাতে মাথা কাটবার জন্যে খাঁড়া শানিয়ে বসে। সে ভয়ের তুল্য ভয় আছে?
তাই প্ৰবোধকে উদার সাজতে হয়। বলতে হয়, মায়ের মাতিবুদ্ধিতে এতদিন তো কষ্ট পেলে, এখন বাপ বুড়ো হয়েছেন, কবে আছেন। কবে নেই, যাওয়া-আসাটা বজায় করাই তো ভাল।
তোমাদের ভালর সঙ্গে আমার ভাল মেলে না—, সুবর্ণ উদ্ধতভাবে বলে, মোট কথা আমি যাব না।
প্ৰবোধ হাসির চেষ্টা করে বলে, যাবো না বললে আর চলছে কোথা? হাইকোর্টের হুকুম যে বেরিয়ে গেছে!
সুবৰ্ণলতা এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে বলে, আমি যদি সে হুকুম না মানি?
যদি না মানি! মার হুকুম তুমি মানবে না!
ন্যায্য হুকুম হলে অবশ্যই মানবো, অন্যায্য হুকুম হলে নয়।
প্ৰবোধ রূঢ় গলায় বলে, মার ন্যায্য-অন্যায্যের বিচার করবে তুমি?
করবো না কেন? মানুষ হয়ে যখন জন্মেছি, ভগবান যখন চোখ কান, মন বুদ্ধি দিয়েছে—
এ কথায় প্ৰবোধ রীতিমতো ক্রুদ্ধ হয়। বলে, মানুষ হয়ে জন্মেছ, তাই প্রতি পদে গুরুজনদের ব্যাখ্যানা করবে, কেমন? পায়ে মাথায় এক হয় না, বুঝলে?
তোমার সঙ্গে তর্ক করবার বাসনা আমার নেই। তবে তোমার মাকে বলে দাও গে, এতকাল পরে হঠাৎ বাপের বাড়ি আমি যাব না।
প্ৰবোধ আরো ক্রুদ্ধ। গলায় বলে, ইচ্ছে হয় নিজে গিয়ে বল গে, আমি বলতে পারবো না। আশ্চর্য, এমন বেহায়া মেয়েমানুষ কখনো দেখি নি! কত ভাগ্যে যদি মার মত হল—
দোহাই তোমার, ভাগ্যের কথাটা থামাও। বেশ, অত ভাগ্যের ভার বইবার ক্ষমতা আমার নেই, তাই ধরে নাও! মনে পড়ে পিসি একবার চিঠি লিখেছিল, বাবার শক্ত অসুখ, সে চিঠি তোমরা ছিঁড়ে ফেলেছিলে? মনে পড়ে ছোড়দা একবার দাদার মেয়ের অন্নপ্রাশনে নেমন্তন করতে এসেছিল, তোমরা তাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে দাও নি, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলে?
প্ৰবোধ সদৰ্পে বলে, তা রাগের ক্ষেত্রে মানুষ অমন করেই থাকে!
রাগের ক্ষেত্রটা হঠাৎ শ্ৰীক্ষেত্র হয়ে যাচ্ছে কি জন্যেই সেটাই জানতে চাইছি।
প্ৰবোধ হঠাৎ একটা অসতর্ক উক্তি করে বসে। বলে ফেলে, আমি বলি নি বাবা, আমার ইচ্ছেও ছিল না। মার হুকুম, কী করবো!
সুবৰ্ণলতা একবার স্বামীর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলে, ঠিক আছে। আমিই হুকুম রদ করিয়ে আনছি।
খবরদার মেজবৌ—, প্ৰবোধ হাঁ-হাঁ করে ওঠে, ইচ্ছে করে আগুন খেতে যেও না। জেনে—শুনে সাপের গর্তে হাত দিও না।
সাপের বিষেই তো জরজর হয়ে আছি, এর থেকে আর বেশি কি হবে! বলে সুবৰ্ণলতা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
নিরুৎপায় প্ৰবোধচন্দ্র ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে। সাহস হয় না। দালানে বার হতে। কি জানি কি সর্বনাশ ঘটাতে গেল সুবৰ্ণলতা!
হ্যাঁ, তখনো এ ভয় ছিল।
তখনো বহুবিধ সর্বনাশ ঘটিয়ে ঘটিয়ে ঘাটা পড়ায় নি। সুবর্ণ। তাই তখনও প্ৰবোধ ভাবতে পারতো, মেয়েমানুষ হয়ে কী ভয়ানক বুকের পাটা মেজবৌয়ের!
মুক্তকেশীও যে মেয়েমানুষই, এ তথ্যটা আবিষ্কার করে ফেলার মতো দুঃসাহস ওদের নেই।
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বৰ্গাদপি গরীয়সী!
জন্মভূমির বার্তা প্ৰবোধচন্দ্রদের সংস্কৃতিতে কখনো প্রবেশ করে নি, ওরা শুধু একজনকেই জানে। জানে তার ইচ্ছে আইন, তার আদেশই অলঙ্ঘ্য। হবে না!
লঙ্ঘন করার চিন্তার ধারে-কাছে কারো ছায়া দেখলেই যে মুক্তকেশী বলে বসেন, থাকবো না, চলে যাবো! বার্ধক্যে বারাণসী এ কথা ভুলে বসে আছি বলেই এত হেনস্থা আমার!
ওদিকে স্ত্রীও ছেড়ে কথা কয় না।
উঃ, পুরুষমানুষ হয়ে জন্মানোর কত জ্বালা!
কতক্ষণ পরে যেন চমক ভাঙলো ভাইঝি মল্লিকার ডাকে।
মল্লিকা উচ্চ চিৎকার হাঁক দিয়েছে, মেজকাকা, জলদি! ঠাকুমা ডাকে—
আমাকে? আমাকে কেন?
মল্লিকা খরখর করে বলে, তা জানি না! মেজকাকী গিয়ে ঠাকুমাকে সাতকথা শুনিয়ে দিয়েছে, তাই বোধ হয়!
প্ৰবোধ কাতর গলায় বলে, মল্লিকা, লক্ষ্মী মা আমার, বল গে। মেজকাকা বাড়ি নেই।
বাঃ, বললেই অমনি হলো? এইমাত্তর আরু তোমায় দেখে গেল না?
