কর্তারা অদৃশ্য হতেই নেপথ্যাচারিণীরা রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হলেন।
বৌরা যে কাছে-পিঠে কোথাও আছে, এটা মুক্তকেশী আন্দাজ করেছিলেন। ভেবেছিলেন, ভালই, জানা হয়ে থাক। সামনে এসে তো আর প্রতিবাদ করতে পারেন না!
আর প্রতিবাদই বা করবে। কি!
বাপের বাড়ি যাবার সুযোগ পেলে তো বর্তেই যাবে। অবশ্য বড়বৌকে তিনি সবাইয়ের সঙ্গে ধরে সমাদৃষ্টির পরাকাষ্টা দেখালেও, মনে মনে তাকে ধর্তব্য করেন নি। তাকে পাঠাবেন না। কাৰ্যকালে কোনো ছুতো করবেন।
একযোগে সবাই চলে গেলে চলবে কেন?
মুক্তকেশী কি গুরুগঙ্গা ছেড়ে এখন ছেলেদের অফিসের ভাত রাঁধতে বসবেন? বড়বৌ গেলে অচল। যেদিকে জল পড়ে সেদিকে ছাতি ধরে সে। অথচ আত্মভোলা উদোমাদা। বাড়ির পিপড়েটাকে পর্যন্ত ভয় করে চলে। ও থাকবে।
মেজ সেজ ছোটকেই পাঠাতে হবে।
আহ্লাদে নাচবে। সেজ ছোট নাচবেই। তবে—
ওই মেজটার ব্যাপার সন্দেহজনক।
ওর মাতিবুদ্ধি কোনোদিনই স্বাভাবিক খাতে বয় না। হয়তো বা দুম করে বলে বসবে—আমি যাব না।
বৌদের এদিকে আসতে দেখেই মুক্তকেশী গম্ভীর চালে সলতে পাকাতে বসলেন। সলতে তো সংসারে কম লাগে না। ঘরে ঘরে হিসেব করলে, কোন না। দশ-বারোটা পিদিম জ্বলে! কেরোসিনের চলন অন্য কোথাও যদি হয়েও থাকে, মুক্তকেশীর অন্দরে তার প্রবেশ নিষেধ। নতুন আলোর পক্ষপাতী নন। মুক্তকেশী।
গিরিবালা এসেই সুয়োর গলায় বলে, ওসব রাখুন। না মা। আপনি কেন কষ্ট করছেন? সালতে পাকাতে কেউ না সময় পায়, আমি পাকিয়ে রাখবো।
মুক্তকেশী একটু উদাস হাসি হেসে বলেন, তোমরা কচিকাঁচার মা, বললে করবো, হয়তো সময় পেলে না! অসময়ে অসুবিধেয় পড়া তো।
ফস করে গিরিবালার হয়ে কথার উত্তর দেয় সুবৰ্ণলতা, কেন, আমরা কি কিছু করি না?
মুক্তকেশী বহুবার ওর দুঃসাহস দেখেছেন, তবুও কেন যে চমকান? চমকে উঠেই পরীক্ষণে ঠোটের আগায় একচিলতে ধনিলঙ্কার ঝালমাখানো হাসি এনে বলেন, করো না কে বলছে গো! তোমরাই তো সংসার মাথায় করে রেখেছি। তবে আমিই বা বসে থাকি কেন? দুটো সলতে পাকিয়েও যদি উপকার না করবো তো ছেলেদের ভাতগুলো খাবো কোন লজ্জায়?
সুবৰ্ণলতা এতখানি রাগ প্রকাশের পরও বলে, এ আপনার রাগের কথা। সে যাক আমাদের বাপের বাড়ি পাঠাবার কি যেন কথা হচ্ছিল!
মুক্তকেশীর হাতের পীড়নে ছেঁড়া ন্যাকড়ার টুকরোগুলো কাঠির মত কঠিন হয়ে উঠেছে, আরো কঠিন হয়ে উঠছে তার চোয়ালের মাংসপেশী। সেই মুখের উপর্যুক্ত নীরস স্বরেই বলেন তিনি, যাদের কাছে বলবার বলা হয়ে গেছে বাছা, এক কথা পাঁচবার বলার সামর্থ্য আমার নেই।
এতো কঠিন হবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তবুও প্রয়োজন আছে। ওটাই তো আশ্রয়। ওটাই পা রাখবার জায়গা। নইলে কি আর সংসার-পর্বতের চূড়োর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা যায়? ভয় দেখিয়েই সবাইকে পদানত করে রাখা। ভয় ভাঙা হলে চুড়ো থেকে গড়িয়ে পড়ে যেতে হবে কি না। কে জানে!
ভক্তির প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামান না মুক্তকেশী, ভালবাসার তো নয়ই। তাঁর মতে এই-ই ভাল। শনি দেবতার পূজোয় উপচারের ক্রটি করবার সাহস কারো হবে না।
কঠিন মুখে সলতেই পাকাতে থাকেন মুক্তকেশী। জলজ্যান্ত মানুষগুলো যে দাঁড়িয়ে আছে সে সম্পর্কে যেন চেতনাই নেই।
জানেন এ মুখের সামনে সুবৰ্ণলতারও কথা বলবার সাহস হবে না। সাহস হবে না। অবশ্য বকুনির ভয়ে নয়, মানহানির ভয়ে। কথা বললে যদি সে কথার উত্তর না দেন মুক্তকেশী?
সে অপমান যে সুবৰ্ণলতার মরণাতুল্য, সে কথা জানেন মুক্তকেশী। সে মরণ দিতে চানও মাঝে মাঝে। কিন্তু তাঁর নিজের বাকযন্ত্রই বিশ্বাসঘাতকতা করে। করে না বলে থাকতে পারেন না। তিনি।
বিন্দু আর গিরিবালা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল বাপের বাড়ি যাবার প্রস্তাবটা পাকা করার জন্যে। কে বলতে পারে আবার মেজাজ ঘুরে যায়। কিনা গিন্নীর!
নিজেই তো মুক্তকেশী সব সময় বৌদের বাপের বাড়ি যাওয়ার প্রতিবন্ধকতা করেন।
এবারই বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে। এবারই মুক্তকেশী সুর বদলেছেন।
এমন সুযোগ আবার না ফসকে যায়!
ওরা, তাই অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল কথা পাকা করতে। কিন্তু আপাতত সুবিধে হল না। চলে গেল আস্তে আস্তে।
চলে গেল সুবৰ্ণলতাও।
কিন্তু সে কি আস্তে আস্তে?
সে কি আশায় আশায়?
কিন্তু উল্টোপাল্টা সুবৰ্ণলতা সম্পর্কে যা ভেবেছিলেন মুক্তকেশী, তাই-ই হল। সুবর্ণ ঠিকরে এসে বলল, আমি যাব না।
প্ৰবোধও অবশ্য এ আশঙ্কা করেছিল, এবং মনে মনে কণ্টকিতও হচ্ছিল, তবু মুখে অবহেলা দেখিয়ে বললো, কেন? যাবে না কেন?
যাবো কেন, সেটাই শুনতে চাই!
প্ৰবোধ কড়া হবার চেষ্টা করে বলে, ঘটা করে শোনবার কী আছে? একদা একটা কিছু ঘটেছে বলে চিরদিনের জন্যে কুটুম্বুর সঙ্গে বিরোধ রাখাই বুঝি মহত্ত্ব?
মহত্ত্ব করতে তো চাইছে না কেউ!
প্ৰবোধ তীব্ৰস্বরে বলে, মা চাইছেন। মা মহত্ত্বের বশে সেটা মিটোতে চাইছেন।
আমি চাই না।
তোমার বাপ-ভাইয়ের সঙ্গে ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগা চাইছ না। তুমি?
না।
নমস্কার! ক্ষুরে ক্ষুরে নমস্কার তোমার!
সুবৰ্ণ অন্যদিকে চেয়ে বলে, সে তো করছেই। রাতদিনই করছে। নতুন নয়। প্ৰবোধ গলাটা নরম করে কাৰ্যোদ্ধার করবার চেষ্টা করে। মার কানে এই কথা কাটাকাটির আভাস গেলে তো আর রক্ষা নেই।
অবশ্য মায়ের এই আকস্মিক খেয়ালটার কারণ সে বুঝতে পারছে না, এবং সে খেয়ালে বিপন্ন হচ্ছে। ধারণা করতে পারছে না—এ হচ্ছে নির্বুদ্ধির টেকি নামধারিণী হেমাঙ্গিনীর।
