সুরাজ চুপিচুপি সুবৰ্ণকে বলে, মোটেই তা নয় বাবা, মায়ের এই দাপটের বহরে থাকবার বাসনা মিটে গেছে আমার। অন্যকে নিচু করে আমায় বড় করা, এ বাপু অসহ্য!
তা সেই অসহ্যটুকু শেষ পর্যন্তই করতে হল সুরাজকে। ভবেনকে নিয়ে আদিখ্যেতার বাড়াবাড়ি করলেন মুক্তকেশী। যাত্রাকালে শুধু মেয়েকেই ভাল ফরাসডাঙার শাড়ি দিলেন তা নয়, জামাইকে কাঁচির ধুতি-চাদর দিলেন।
দিলেন সুবালা আর সুবালার বরকেও, দিলেন মিলের ধুতি-শাড়ি।
তবু খরচপত্র হয়ে গেল বিস্তর।
দিলেন সঙ্গে।
আর শেষ অবধি হয়তো হাফ ছেড়েই বাঁচলেন।
সুবালার ইচ্ছে ছিল কটা দিন থাকে।
কিন্তু পাঁজি-পুথি না দেখে আদিনে এসেছে এই ছুতোয় তাকে ভাগালেন মুক্তকেশী।
তারপর–
হ্যাঁ, তার পরদিনই সন্ধ্যাবেলা ছেলেদের ডেকে সংকল্পটা ঘোষণা করলেন মুক্তকেশী।
বললেন, আমার তীর্থখরচ তো ডবল লাগল-শশধরের মার কাছে একশোখানি টাকা হাওলাৎ নিয়ে তবে পাণ্ডার কাছে মুখর ক্ষে। সে কার্জ শোধ করতে হবে। তারপর তোমাদের এই বোনভগ্নীপোত আনাআনি। খরচের খরচান্ত! বৌ-ছেলেদের মাস দুচ্চারের মতন বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দে। দিকি। দেনাপত্তর শোধ করে, একটু গুছিয়ে নিয়ে তাপর আনিস!
শুনে ভাইয়েরা মুখ-চাওয়াচাওয়ি করল।
সুবোধের তো শ্বশুরবাড়ি বলতে অষ্টরস্তা। শাশুড়ীই কখনো ভাইয়ের বাড়ি, কখনো দ্যাওরের বাড়ি, কখনো বোনঝির বাড়ি!
আর প্রবোধ?
তার যে একটা শ্বশুরবাড়ি আছে, সে কথা কে কবে মনে রেখেছে?
প্রভাসের অবশ্য ভাল শ্বশুরবাড়িই আছে, প্রকাশেরও আছে একটা যেমন তেমন কিন্তু প্ৰস্তাবটা কারো কাছেই প্ৰীতিকর ঠেকে না। তবু মায়ের কথার প্রতিবাদ চলে এ তারা ভাবতেই পারে না।
স্বৰ্গাদপি গরীয়সী বলে কথা!
ন্যায় বলুন, অন্যায় বলুন, মাথা পেতে নিতে হবে আদেশ।
কে জানে বৌয়েরা এ প্রস্তাব কোন আলোয় নেবে! ইদানীং তো বৌগুলো যখন-তখনই বলতে শুরু করেছে, এতই যদি মাতৃভক্তি, মায়ের আঁচলতলায় খোকা হয়ে থাকলেই পারতে! বিয়ে করে সংসার পাতবার সাধ হয়েছিল কেন?
যখন-তখনই বলে।
ধমকে ঠাণ্ডা করা যায় না।
এ এক বিড়ম্বনা।
মাতৃভক্তি আর বিয়ে, এই দুটোর মধ্যে যে কখনো বিরোধ ঘটতে পারে, এটা কে কবে ভেবেছিল?
সে যাক, নেপথ্যের চিন্তা পরে, আপাতত সামনে মা। ছেলেরা তাই নিতান্ত বাধ্য ভাবে বলে, তুমি যা ভাল বুঝবে।
আমি তো ভাল বুঝেই বলছি। তবে তোমরা এখন সব বিজ্ঞ হয়েছ
হঠাৎ প্ৰবোধচন্দ্ৰ ইতস্ততঃ করে বলে ওঠে, আমার আর শ্বশুরবাড়ি!
মুক্তকেশী বলেন, তা জানি। থেকেও নেই। অথচ শ্বশুর মিনসে নাকি এখনও চাকরি করছে, দুই শালা মান্যিমান হয়েছে। ছোটটা তো আবার বিয়েও করে নি, বিদেশে থাকে, টাকা পাঠায়। সেই যে বলে না, আছে। গরু না বয় হাল, তার দুঃখু চিরকাল এ হয়েছে তাই।
প্ৰবোধ এসব তথ্যে অবাক হয়।
শ্বশুরবাড়ি নামক এক জায়গা যে তার আছে, এ প্রমাণ পাবার সুযোগ পায় নি সে। শাশুড়ীর কলঙ্ক-কথা সহজ ধারার মুখে পাথর চাপিয়ে দিয়েছিল। প্রথমে সেই একবার শ্বশুর নিতে এসেছিল, মুক্তকেশী যাচ্ছেতাই করে বিদায় করেছিলেন। তার পর আরও কি উপলক্ষে যেন নেমন্তন্ন করতে এসেছিল। পাঠানো হয় নি। আগে আসতো এক-আধা দিন, আর আসে না।
তদবধি সব সম্পর্ক শেষ।
জীবনে কোনোদিন উচ্চারণ করে নি সুবর্ণ–বাবার জন্যে মন কেমন করছে অথবা একবার তাদের না দেখে থাকতে পারছি না।
এখন হঠাৎ মুক্তকেশীর মুখে তাদের তত্ত্ব-বার্তা!
প্ৰবোধ বোধ করি ক্ষীণকণ্ঠে একবার বলে, কে বললো তোমায়?
মুক্তকেশী গম্ভীরভাবে বলেন, তোদের মাকে কারুর কিছু বলে যেতে হয় না, হাওয়ায় খবর পায়। মেজ বৌমার সেই পিসি বুড়ীর একটা সতীন-ঝি যে আমাদের হেমার ছেলের শালীর শাশুড়ী। সেই সূত্রেই খবর!
পিসি, সতীন-বি, শালী, শাশুড়ী! এই সম্পর্কের জটিলতার জাল-মুক্ত হবার চেষ্টা করে না। প্ৰবোধ। শুধু সাহসে ভর করে বলে ফেলে, তা ওরা তো সাতজন্মে নিয়ে যাবার কথা বলে না—
বলবে কে? মা আছে? তোমরা গরুড়ধ্বজা শাশুড়ীর গুণে উভয় কুল মজিলো! যাক গে, নিয়ে যাবার কথা বলার অভ্যোস ওদের নেই, তাই বলে না। তুই যাবি, বৌকে রেখে আসবি!
এবার প্রবোধের হয়ে সুবোধ হাল ধরে, কিন্তু মা, ওরা যখন বলে নি, তখন—
কথা শেষ করতে দেননি। মুক্তকেশী। বলে ওঠেন, তা ওরা কেমন করে জানবে যে তোমাদের দেনা-কর্জ হয়ে গেছে, বেপোটে পড়েছ? তোমাদের শালা শ্বশুরেরা খড়ি পাততে পারে, এ খবর পেয়েছ। কোনোদিন?
তা-নয়, মানে—, প্ৰবোধ প্ৰায় মরীয়া হয়েই বলে ফেলে, সাতজনে বলে না, হঠাৎ এরকম উপযাচক হয়ে—
মুক্তকেশী ছেলের বক্তব্যকে সম্পূর্ণতার রূপ দিতে দিলেন না, বলে উঠলেন, উপযাচক হয়ে পাঠিয়ে দিলে তাড়িয়ে দেবে, এ ভয় যদি থাকে তোমার তা হলে অবিশ্যি পাঠাবার কথা ওঠে না। তবে চিরকাল জানি বিয়েওলা মেয়ে আরাধনার সামগ্ৰী, বাপের বাড়ি গেলে বাপ-ভাই মাথায় করে রাখে।
তবে তাই হবে–
বলে ছেলেরা তখনকার মত রণে ভঙ্গ দেয়। কারণ অনুভব তো করছে, নেপথ্যে জোড়া তিনেক কান উৎকৰ্ণ হয়ে আছে। তাদের মুখ বন্ধ করে রাখবার কার্যকরী পদ্ধতিটা যেন আজকাল আর তেমন কাজে লাগছে না।
এই বিদ্রোহাত্মক মনোভাবের আমদানিকারিণী যে সুবৰ্ণলতা, তাতে অবশ্য সন্দেহ নেই। সেজ ছোট ভাই তাই প্রতিনিয়ত সুবৰ্ণলতাকে শাপশাপান্ত করছে মনে মনে।
কিন্তু তাতে তো শুধু গায়ের ঝাল মেটানো। সংক্রামক ব্যাধি আপনি কাজ করেই যাবে।
