খরচ অবশ্য বড়লোক সুরাজের খাতিরে একটু অতিরিক্তই করা হচ্ছিল। বিরাজ এক ধরনের বড়লোক, এ আর এক ধরনের। বিরাজের কাছে চক্ষুলজ্জা নেই, এর কাছে সেটা আছে।
তবু লজ্জা কি বাঁচানো যাচ্ছে?
লজ্জা যে চতুর্দিকে ছড়ানো!
সুরাজ বলে, স্বামী ধমক দেবে। আর তাই সইতে হবে? কেন দড়ি কি নেই জগতে?
সুরাজ বলে, পড়ে মার খাও বলেই এত অত্যাচার তোমাদের ওপর। নিজের মানটি নিজে রাখতে হবে বাবা! সেজদাই বা হঠাৎ সংসারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হল কেন তাও বুঝি না! আর মেজদার ওই সন্দেহবাতিক সহ্য কর কি করে মেজ বৌদি ভেবে পাই না। ধোবার সামনে বেরিয়েছিলে বলে। তোমায় যাচ্ছেতাই করলে মেজদা। আমি তো দেখে হ্যাঁ। আমি হলে কি করতাম জানো? ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে রাস্তার লোকের সঙ্গে গল্প করতাম।
সুবৰ্ণ এ ধরনের কথায় চুপ করেই থাকে। সুবর্ণ এই সহানুভূতির মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা অপমানের জ্বালা অনুভব করে। তা গিরিবালাও দণ্ডমুণ্ডের কর্ত প্রসঙ্গে জ্বালা অনুভব করছিল। তাই বলে ওঠে, ই, তা তো করতে! তার পর ঠেঙানিটা খেলে?
সুরাজ ভুরু কুঁচকে বলে, ঠেঙানি!
তবে না তো কি! ইহঁ, মেজ বড়ঠাকুরের তো সে গুণে ঘাট নেই! নিজে পড়েছ শিবতুল্য মানুষের হাতে–
সুরাজ সুবর্ণর মুখের দিকে তাকায়।
সুরাজ ভয় পায়।
তাই তাড়াতাড়ি বলে, আসল কথা কি জানো সেজবৌ, মাতৃনিন্দা মহাপাপ হলেও না বলে পারছি না, মার পৃষ্ঠবলেই এতটা হতে পেরেছে। মা টি তো আমার সোজা নয়! পুরুষ একলা পড়লেই পরিবারের কাছে জব্দ। মা দাদা ভাজ চারিদিকের পৃষ্ঠবলে এত বাড় বাড়ে তাদের। তোমাদের নন্দাইটি যে একলা পড়েছে কিনা তাই শিবতুল্য।
তখনকার মত রক্ষা হয়।
কিন্তু মুক্তকেশীই আবার আগুন জ্বলেন।
হেমাঙ্গিনী এসেছেন সুরাজকে দেখতে, মুক্তকেশী হেসে হেসে গলা খুলে মেয়ের বাসার সুখসমৃদ্ধির গল্প করেন, গল্প করেন বশংবদ জামাইয়ের আনুগত্যের কাহিনী।
সে কী বাড়ি! একেবারে সাহেব বাড়ি, বুঝলি হেমা? কোচ কেদারা, টেবিল আর্শি। কত কেতা! সুরিও আমার বেড়ায় যেন মেম! পায়ে জুতো-মোজা, বিলিতি ঢং করে কাপড় পরা। আর জামাইয়ের আমার… হি হি হি কী বলবো-অবস্থা যা! অত বড় একটা হোমরা চোমরা চাকুরে, সুরির কাছে যেন চোরটি! সুরির কথায় উঠছে বসছে, সুরি চোখ রাঙালে চোখে অন্ধকার দেখছে। দূরে থেকে শুনি, চোখে তো দেখা হয় নি, দেখে বলবো কি চোখ যেন জুড়োলো!
হঠাৎ এই জমাটি সভায় ছন্দপতন ঘটে।
হঠাৎ সুবৰ্ণলতা কোন দিকে থেকে যেন এসে প্রশ্ন করে, এসব দেখলে আপনার চোখ জুড়োয় মা?
মুক্তকেশী প্রথমটায় থতামত খান। তার পর কপাল কুঁচকে বলেন, কোন সব?
এই যে—পুরুষমানুষ স্ত্রীর কথায় উঠছে বসছে, স্ত্রী চোখ রাঙালে চোখে অন্ধকার দেখছে! তাছাড়া কোচ কেদারা টেবিল আর্শি-
মুক্তকেশী ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, কেন, শুনে বুঝি তোমার গা-জ্বালা করে উঠল মেজবৌমা? তা করবেই তো, হিংসের রীষে ভরা যে! বলি তোমরাই বা সোয়ামীকে কী ভ্যাড়াকান্ত করতে বাকী রেখেছ? সাধ যায় তো পরো জুতো-মেজো, খানা খাওগে টেবিলে বসে! ধন্যি বটে! আহ্লাদ করে দুটো গপূপো করতে এলাম, গায়ে যেন ছুঁচ ফুটলো মানুষের!
ছুঁচ কেন ফুটবে মা! সুবর্ণ উঠে পড়ে বলে, আহ্লাদের কথায় আহ্লাদই হয়। মনে হয় তবু বাংলা দেশের একটা মেয়েমানুষও মানুষের মত বাঁচিছে। তবে আপনাদের চোখে এসব মেমসাহেবী ভাল ঠেকে, এটা দেখেই আশ্চয্যি হচ্ছি!
মুক্তকেশী আর উচিত উত্তর খুঁজে পান না। সুবৰ্ণ চলে গেলে বলে ওঠেন, দেখলি তো হেমা, এই আগুনের খাপরা নিয়ে ঘর করছি আমি।
সর্বদা এই কথাই বলেন মুক্তকেশী।
সবাই তাই বলে।
আগুনের খাপরা।
কিন্তু সেই আগুন কানে জ্বালাতে পারলো সুবৰ্ণ? কী বা জ্বালালো? শুধু তো নিজেই জ্বলে জ্বলে ভস্ম হলো!
সুরাজের বরের চিঠি এল।
রঙিন খাম, আতরের গন্ধ, খামের কোণে বেগুনীরঙা একটি ছোট গোলাপ ফুল!
কত বছর বিয়ে হয়েছে সুরাজের?
সুবৰ্ণর থেকে বড় না সুরাজ?
সুরাজের নামের মানে নিয়ে যখন কৌতুকের হাসি হেসেছিল সুবর্ণ, তখন তো সুরাজের বিয়ে হয়ে গেছে।
সুরাজ লজ্জায় আনন্দে গৌরবে হেসে ফাটে। বলে, বুড়ো বয়সে ঢং দেখেছ? আসল কথা বিয়ে হয়ে ইস্তক তো ইস্তিরী গলায় ঝুলছে, এদিকে সখের প্রাণ গড়ের মাঠ! তাই নতুন বরের মত—
চিঠিখানা নিয়ে সরে পড়ে সুরাজ আতর আর আদরের সৌরভ ছড়িয়ে!
গিরিবালা বলে, পয়সা থাকলেই আদিখ্যেতা শোভা পায়।
বিন্দু বলে, শোভা পায় আর বোলো না। সেজদি, হাসি পায় তাই বল!
উমাশশী বলে, সেজ ঠাকুরজামাই তোমাদের ভাসুরের চাইতে মাত্তর দু বছরের ছোট।
হয়তো ওইতেই অনেক কিছু বলা হয়।
শুধু সুবর্ণ কিছু বলে না।
সুবৰ্ণকে কে যেন আচমকা এক ঘা চাবুক মেরে গেছে।
সত্যিই কি তবে হিংসুটে হয়ে যাচ্ছে সুবৰ্ণ?
সৌভাগ্যের অনেক লীলা দেখিয়ে বিদায় নিল সুরাজ। শেষের দুদিন যে আবার বরও এসেছিল নিয়ে যেতে।
বড়লোক বোনাইকে তোয়াজ করতে অনেক ব্যয় করে ফেললে মুক্তকেশীর ছেলেরা। কারণ সুরাজের বর ভাবেন সাহেবের আগমন উপলক্ষে আরও তিন মেয়ে-জামাইকে নেমন্তন্ন করে আনলেন। মুক্তকেশী। সুবালা তো পড়ে থাকে চাপতীয়, সাতজন্মে আনবার কথা মুখেও আনেন না, কারণ তার একপাল এণ্ডি গেণ্ডি। আবার আনলেন।
মুক্তকেশী সবাইকে ডেকে ডেকে বলেন, লক্ষ্মীর ঘরে যষ্ঠীর কৃপা কম, এ হচ্ছে ডাকের বচন। দেখ তার সাক্ষী সর। বললাম। এ দুটো মাস থাক আমার কাছে, একেবারে খালাস হয়ে তবে যাস! জামাইও রাজী হয়েছিলেন, বরসোহাগী মেয়েই আমার থাকতে পারলেন না-বর ছেড়ে!
