সুবৰ্ণলতা যদি উমাশশীর মত হতো, কবেই হয়তো প্ৰবোধ তাকে অবহেলায় ঘরে ফেলে রেখে কাঁচা পয়সার সদ্ব্যবহার করবার পথ খুঁজতে যেত। কিন্তু সুবর্ণলতার এই দুঃসহ স্পর্ধাই একটা তীব্র আকর্ষণ!
তাই প্ৰবোধ একবার হয়ে মারে, পরীক্ষণেই জ্ঞানশূন্য হয়ে পায়ে ধরতে যায়।
সেদিনও প্রথমটা স্তব্ধ হয়ে গিয়েই সহসা সুর বদলায় প্ৰবোধ। সুবৰ্ণলতার নখের আঁচড়ে বিক্ষত হাতটায় ফুঁ দিতে দিতে বলে, উঃ, নখে দাঁতে বাঘের বিষ! ফাঁসিতে লটকাতে প্ৰধান সাক্ষী বোধ হয় তুমিই হবে?
একশোবার!
প্ৰবোধের গলায় অভিমানের সুর বাজে, তা জানি। এ আপদ মরলেই যে তুমি বঁচো তা আর আমার জানতে বাকি নেই। নিজের মাছ খাওয়াটাও যে ঘুচিবে সেই সঙ্গে, সে খেয়াল আছে?
সুবৰ্ণলতা বিধ্বস্ত খোঁপাটা জড়িয়ে নিয়ে নিজের বালিশটা মাটিতে ফেলে শুয়ে পড়ে বলে, তোমাদের মতন খাওয়াটাই আমার কাছে চতুর্বর্গ নয়!
তার মানে বিধবা হতেই চাও?
চাই, তাই চাই। শুনলে তো? এখন কি করবে? আমার প্রার্থনা পূরণ করতে বিষ খাবে? না। গলায় দড়ি দেবে?
এই বৌকে কোন উপায়ে জব্দ করবেো প্ৰবোধ?
মেরে ফেলা ছাড়া করা যাবে আর কিছু?
অথচ আবার নিজে সে প্রকৃতির একটা নিষ্ঠুর কৌতুকের প্যাঁচে নিতান্তই জব্দ!
এত কাণ্ডের পরও ওই ত পড়ে থাকা দীর্ঘ, বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যে ভরপুর দেহটা যেন তাকে লক্ষ বাহু দিয়ে আকর্ষণ করতে থাকে!
তিন ছেলের মা হয়েও তো স্বাস্থ্যে এতটুকু শিথিলতা এল না!
অতএব এবার খোশামোদের পথ ধরতে হয়।
তবে সেটা কিছু বিচিত্র।
লুব্ধ পুরুষের গভীর রাত্রির সেই বিচিত্র তোয়াজের ইতিহাস অনুদ্ঘাটিতই থাক।
সুবৰ্ণরই বা কী উপায় আছে। এর থেকে নিস্কৃতি পাবার, মরে হাড় জুড়নো ছাড়া?
রাত্রে দরজা খুলে বেরিয়ে আসার ছেলেমানুষি আর করা চলে না এখন। চারিদিকে চল্লিশটা চোখ! ছোটগুলোর কথা মনে করলেই সেই তীব্র বাসনাও স্তিমিত হয়ে আসে।
অথচ মরবার উপকরণও তো দুর্লভ!
শাশুড়ীর একটা রাতের মালিশের ওষুধ চুরি করে লুকনো আছে বটে, কিন্তু খুব একটা আস্থা আসে না তার উপর।
আবার একবার কি লোক হাসাবে সুবৰ্ণ?
মরতে গিয়ে না মরে কেলেঙ্কারী করবে?
তার থেকে এই কথা বিশ্বাস করাই ভাল, সুবৰ্ণ কারো দিকে তাকালেই মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে প্ৰবোধের, হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তাই এমন কাণ্ড করে বসে।
কারণ?
কারণ তো পড়েই আছে।
ভালবাসার আধিক্য! পায়ে মাথা খুঁড়ে সেই কথাই বোঝাতে চায় প্ৰবোধ।
মেয়েটা ঠাকুমার কাছে শোয়, কিন্তু ছেলে দুটোও তো ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে, তাদের ঘুমের গভীরতায় বিশ্বাস নেই, শেষ পর্যন্ত ওই আধিক্যটা বোঝা ছাড়া উপায়ই বা কি?
১.০৯ তীৰ্থ থেকে ফিরলেন মুক্তকেশী
তীৰ্থ থেকে ফিরলেন মুক্তকেশী, সঙ্গে নিয়ে এলেন সেজমেয়ে সুরাজকে।
না, তীর্থপথে কুড়িয়ে পান নি তাকে, সম্প্রতি তার ব্যর কটকে বদলি হয়েছে, তাই সেখানেই দু-একদিন থেকে একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। বললেন, এত বড় খবরটা চেপে বসে আছিস সুরি? ধন্যি বটে! এই সময় কখনো একা থাকে?
সুরাজের বরের বদলির কাজ, সুরাজ মেমসাহেবের মত স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। চাকর, ঠাকুর, আর্দলী, বেহারা সকলের সঙ্গে কথা বলে, বর এতটুকু এদিক-ওদিক করলে পলকে প্ৰলয় করে।
অবশ্যই সে প্ৰলয় মুক্তকেশীর মত নয়, প্ৰণয়েরই পরিচয় ঘোষণা মাত্ৰ। ভঙ্গীটা অতএব সভ্য মার্জিত।
সুরাজকে দেখলে বোঝাবার জো নেই একদা সে এ সংসারের মেয়ে ছিল।
সুরাজ সর্বদা টাইট জ্যাকেটবডি পরে থাকে। সুরাজ এক-গা গহনা পর্যাকে সেকেলে বলে হাসে, সুরাজ মাথায় সোনার চিরুনি বসিয়ে খোঁপা বঁধতে নারাজ, সুরাজ নাকি স্বামীর কর্মস্থলে জুতো পায়ে দেয়।
সুরাজ কদাচুই আসে।
শেষ এসেছিল বিরাজের বিয়ের সময়, গোলমাল দেখে বরকে চিঠি লিখে মেয়াদের আগেই সরে পড়েছিল
এবার যে এল সেটা ইচ্ছেয় নয়, নিতান্তই মায়ের নির্বন্ধতিশয্যে! বরও বলল, সত্যিই বটে, এতদিন পরে যখন আবার ইচ্ছে মার কাছে থাকলেই হয়তো ভাল। কলকাতা শহর।–
একটি ছেলে সুরাজের, দশ বছর পরে আবার এই ঘটনা।
মুক্তকেশীর কি শুধুই মাতৃস্নেহ?
তার উপর বাড়তি আরও কিছু ছিল না?
তাঁর এই ষোল আনা স্বাধীন মেমসাহেব মেয়েটিকে আত্মজনের সামনে দেখাবার বাসনাও ছিল না কি?
এর আগে যখন এসেছে, তখন এত সুখ-স্বাধীনতা ছিল না, শাশুড়ীমাপী ছিল বেঁচে, এখন সে বালাইও গেছে। মেয়েকে তাই বুকে করে নিয়ে এলেন মুক্তকেশী। আর জনে জনে ধরে ধরে শোনাতে লাগলেন, এত বড় ঘটনা, আমি মা, আমাকে জানায় নি!
সুরাজ লজ্জা পেয়ে বলে, কী একেবার ঘটনা! মা যেন কী! আর দেখছি না বুঝি এ ঘটনা?
মুক্তকেশী বলে ওঠেন, দেখব না কেন? নিয়তই দেখছি। হাঁস-মুরগীর মত রাতদিন প্যাঁক প্যাঁক করে বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে, দেখছি না? তার সঙ্গে আর তোর তুলনা করিস না মা!
সুরাজ লজ্জা পেয়ে চুপ করে।
কিন্তু সুরাজ এ সংসারে হাঁপিয়ে ওঠে। একদা যে এইখানেই থেকেছে সে, সে কথা যেন তার নিজেরও বিশ্বাস হয় না।
সুরাজের দাদারা কী স্কুল, কী অমার্জিত, কী সেকেলে! সুরাজের বৌদিরা যেন ঝি-চাকরানীর পর্যন্নুর রাজের ভাইপো-ভাইঝিগুলো যেন গোয়ালের গরু-ছাগল!
আশ্চর্য!
ভালভাবে থাকতে ইচ্ছে হয় না। এদের?
সেই কথাই জিজ্ঞেস করে সে।
বলে, সংসারে খরচ তো কম হতে দেখি না, অথচ সৌষ্ঠবের বালাই নেই কেন বল তো তোমাদের?
