উমাশশী চকিত হয়।
উমাশশী যাবার জন্যে ব্যগ্র হয়।
কলেরাকে ভয় করছে না। উমাশশী, ভয় তার এই পরিস্থিতিটাকে, ভয় তার মেজজাকে। চিরটা দিন যাকে বুঝতে পারল না সে। সেই দুর্বোধ্যকে চিরদিনই ভয় তার। নইলে ইচ্ছে কি করে না মাঝে মাঝে আসে, দুদণ্ড মেজবৌয়ের এই সাজানো-গোছানো চকচকে সংসারটায় এসে বসে! লক্ষ্মী ওখলানো সংসার দেখতেও তো ভাল লাগে।
কিন্তু কি জানি কেন স্বস্তি পায় না।
মনে হয় তার পিঠোপিঠি ওই জাটি যেন সহস্ৰ যোজন দূরে বসে কথা বলছে তার সঙ্গে।
অথচ বলে তো সবই।
ছেলেমেয়েদের খবর কি? নাতিরা কে কোন ক্লাসে পড়ছে? মেয়েদের আর কার কি ছেলেমেয়ে হলো? সবই জিজ্ঞেস করে। আদর-যত্ন করে খাওয়ায় মাখায়, সঙ্গে মিষ্টি বেঁধে দেয়, তবু কে জানে কোথায় ওই দূরত্বটা?
গিরিবালা, বিন্দু, ওরা তো বড়জাকে একেবারেই পৌঁছে না, এক ভিটেয় বাস করেও প্ৰায় কথা বন্ধই। নেহাৎ উমাশশী সেই মরুভূমিটা সহ্য করতে পারে না বলেই যেচে যেচে দুটো কথা কইতে যায়। তবু ওদের সঙ্গেও যেন নেই। এতটা ব্যবধান, ওরা কাছাকাছি না হলেও— কাছেরই মানুষ। তাই উমাশশী। এখানে বসেই ভাবছিল, রোগটা ছেয়াচে বলে আসতে পারলো না বটে, খবরটার জন্যে হাঁ করে আছে ওরা, গিয়েই জানাতে হবে। ভয়ের কারণটা নেই। আর, রোগী সামলেছে একটু।
কদিন কথা নেই, এ একটা বরং সুযোগ এল।
তাই তাড়াতাড়ি বললো, না, আমি চলেই যাই তোমার সঙ্গে। থাকা মানেই তো আবার পৌঁছনোর জন্যে ছেলেদের ব্যস্ত করা! চাঁপা-চন্নন এসে গেছে, মেজবৌ এসে গেছে, আর ভাবনা করি না। উঃ, ভগবানের কী অনন্ত দয়া যে মেজবৌ রওনা দেয় নি!
আজকাল একটু উন্নতি হয়েছে উমাশশীর, ঘোমটা দিয়ে হলেও সকলের সামনে বরের সঙ্গে কথা কয়। সেই সকলরা যে সকলেই তার কনিষ্ঠ, এতদিনে যেন সে খেয়াল হয়েছে উমাশশীর।
তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে বসে উমাশশী। সুবৰ্ণকে একটু বলে গেলে ভাল হতো, কিন্তু পরিস্থিতিটা যে বড় গোলমেলে। এসেই তো শুনেছে চাঁপার মুখে, কী কথা বলেছে সুবর্ণ তার স্বামীকে!
হতে অবিশ্যি পারে। মেজ ঠাকুরপো চিরদিনই তো ওই রকম বৌ-পাগলা, বৌকে একবেলার জন্যে চোখের আড় করতে পারে না। সেই বৌ একেবারে বদরিকাশ্রম যাবার বায়না করে বসেছে দেখেই করে বসছে এই কেলেঙ্কারি কাণ্ড। জানে তো বারণ শোনবার মেয়ে নয়। মেজবৌ!
তবু সত্যিও যদি তাই-ই হয়, বড় বড় ছেলে, ছেলের বৌদের সামনে মানুষটাকে এমন হেয় করবি তুই? তা ছাড়া যে কারণেই হোক, বলতে গেলে প্রায় তো মরতেই বসেছে! নাড়ী ছাড়বার যোগাড়। তাকে এমন লাঞ্ছনা!
ছি ছি, এ কি নির্মায়িকতা?
গাড়িতে উঠে বসে ঘোমটাটা একটু খাটো করে সেই কথাই বলে ফেলে উমাশশী।
সুবোধের দিকে জানলাটা খোলা ছিল, সুবোধ সেই জানলার বাইরে তাকিয়েছিলেন, হঠাৎ সচকিত হয়ে বলেন, কার নির্মায়িকতার কথা বললে?
মেজবৌয়ের কথাই বলছি-
হঠাৎ সুবোধ স্বভাব-বহির্ভূত তীব্র হন। সুবোধের প্রৌঢ় চোখে যেন দপ করে একটা আগুনের শিখা জ্বলে ওঠে, বলে ওঠেন, মেজবৌমার কথা? মেজবৌমার নির্মায়িকতার কথা? মেয়েমানুষ হয়েও তুমি শুধু ওই দিকটাই দেখতে পেলে বড়বৌ? পেবো লক্ষ্মীছাড়ার নিষ্ঠুরতা তোমার চোখে পড়ল না? অবস্থার গতিকে আমি তোমায় কখনো কোনো তীৰ্থ-ধর্ম করাতে পারি নি, আমার বলা শোভা পায় না, তবু পেবোর অবস্থা ছিল বলেই বলছি, অবস্থা সত্ত্বেও তুই মানুষটাকে কোনদিন আকাশ-বাতাসের মুখ দেখতে দিলি না! নিজের স্বার্থে খাঁচায় পুরে রেখে দিয়েছিস, লজ্জা করল না। তোর এই বুড়ো বয়সে এই কেলেঙ্কারিটা করতে? স্বামী হয়ে তুই ওর এত বড় একটা তীর্থযাত্রার সুযোগ পণ্ড করলি? সুযোগ বার বার আসে? বেঁটা যে চিরদিন আকাশ বাতাসের কাঙাল, তা জানিস না তুই? আর তাও যদি না হয়, হিন্দু বাঙালীর মেয়ে তো বটে! বদরীনারায়ণ যাত্রা করছিল, কত বড় আশাভঙ্গ হলো তার, সেটা তুমি বুঝতে পারলে না বড়বৌ?
একসঙ্গে এত কথা কইতে সুবোধকে জীবনেও কখনো দেখেছে। কিনা উমাশশী সন্দেহ, তাই সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে স্বামীর মুখের দিকে, আর বোধ করি কথাগুলো অনুধাবন করতে চেষ্টা করে। সুবোধও বোধ হয় এই আবেগ প্রকাশ করে ফেলে লজ্জিত হলেন, তাই এবার শান্ত গলায় বলেন, মেজবৌমা মানুষটা আলাদা ধাতুর, ওঁকে তোমরা কেউ বুঝলে না। আর পেবোটা হচ্ছে— চুপ করে যান।
তা কেউ যদি সকলের দুর্বোধ্য হয় তো সে দোষ কার? তার, না। সকলের?
বিন্দু আর গিরিবালা নে থো করে রান্না সেরে তাড়াতাড়ি হাঁড়ির ভাত চুকিয়ে নিচ্ছিল, কে জানে কখন কি খবর আসে! মল্লিকা নেই, কদিনের জন্যে শ্বশুরবাড়ি গেছে, শাশুড়ীর অসুখ শুনে। কাজেই চক্ষুলজ্জা করবার মত কেউ নেই। নইলে যা কটুকটে মেয়ে, খুড়ীদের এখন ভাতের কাঁসি নিয়ে বসা দেখলে কটুকটু করে কথা শোনাত। নেই বাঁচা গেছে।
অতএব দুজনে ছেলে।পুলেকে ভাত দিয়েই একই রান্নাঘরের দুই প্ৰান্তে দু কাসি ভাত বেড়ে নিয়ে বলাবলি করছিল, যা হবে তা তো দেখাই যাচ্ছে, তবে মেজদির এবার কি হবে তাই ভাবনা। চিরটা দিন তো ওই একটা মানুষের ওপর দাপট করে তেজ-আসপদ্দার ওপরই চালিয়ে এলেন, এখন পড়তে হবে ছেলে-বোয়ের হাতে!
এরা দুজনে যে পরস্পরের প্রাণের সখী তা নয়, দুজনের আলাদা অবস্থা, আলাদা কেন্দ্র। পাড়াপড়াশীর সঙ্গে দুজনের গলায় গলায় ভোব (যেটা মুক্তকেশীর আমলে সম্ভবপর ছিল না) হলেও সেই পড়াশীরা ভিন্ন ভিন্ন দলের, এবং সেখানেই নিশ্চিন্ত হয়ে পরস্পরের সমালোচনা করে বাঁচে। তবু একেবারে কথা বন্ধ, মুখ দেখাদেখি বন্ধটা নেই, বরং মিলই আছে। ক্ষুদ্রতার সঙ্গে ক্ষুদ্রতার, সঙ্কীর্ণতার সঙ্গে সঙ্কীর্ণতার, স্বার্থবোধের সঙ্গে স্বার্থবোধের এক ধরনের হৃদ্যতা থাকে, এ সেই হৃদ্যতা। গিরিবালা আছে, তাই বিন্দু একজনকে ঈর্ষা করতে পায়, বিন্দু আছে, তাই গিরিবালা তার অহমিকা বিকাশের একটা ক্ষেত্ৰ পায়— ওদের কাছে তারও মূল্য আছে বৈকি।
