বলি কোন প্ৰাণে হিমালয় ভাঙবে তুমি? তাছাড়া আর সকলেই বা কোন স্বস্তিতে সঙ্গে নেবে। তোমাকে? যে জায়গায় যোচ্ছ সেখানে তো খবর আনাগোনার পথও নেই! তবে?
তার মানে তুমি বিধবা হয়েও শাড়ি চুড়ি পরে ঘুরবে সবাইয়ের সঙ্গে, সব কিছু ছোঁবে নাড়বে!
হলেই হলো! আহ্লাদ?
দাদা আর একবার অসহিষ্ণু গলায় প্রায় ধমক দিয়ে গেলেন, কি হলো? সুবৰ্ণ, তুমি কি আমায় দোষের ভাগী করতে চাও? বেশ তো—এদের তো এখনো যাত্রার ঘণ্টাতিনেক দেরি রয়েছে, গিয়ে দেখো কি অবস্থা—
অবস্থা আমার জানা হয়ে গেছে দাদা—, বলে আস্তে গিয়ে গাড়িতে ওঠে সুবৰ্ণ! জয়াবতীকে সঙ্গে আসতে দেয় না।
কেন, এই শুভযাত্রার মুখে একটা কলেরা রোগীকে দেখতে যাবে কেন জয়াবতী? তাছাড়া বিপদের ভয়ও তো আছে। শুধু এক নিজেরই নয়, অন্য পাঁচজনেরও।
গাড়িতে ওঠবার সময়ও জয়াবতী আর একবার মৃদু প্রশ্ন করেন, ভেদবমি তুই দেখে এসেছিলি?
সুবর্ণ ওঁর চোখের দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে দেখে বলেছিল, এসেছিলুম!
জয়াবতী কপালে হাত ঠেকান।
গাড়ি ছেড়ে দেয়।
কে জানে রোগীরও এতক্ষণে নাড়ী ছেড়ে গেছে কিনা?
সুবৰ্ণ চলে যাওয়ার পর অবিরত সুবৰ্ণর সমালোচনাই চলতে থাকে এবং একবাক্যে স্থির হয় এরকম হৃদয়হীন আর আক্কেলহীন মেয়েমানুষ পৃথিবীতে আর দুটি নেই।
খবর দিতে এসেছিল সুবর্ণর ঝি। সে বার বার কপালে হাত ঠেকাচ্ছিল। আর বলছিল, হে মা কালী, গিয়ে যেন বাবুকে ভাল দেখি—
তবে তার বলার ধরনে মনে হয়েছিল, গিয়ে ভাল তো দুরস্থান, বাবুকে জ্যান্ত দেখার আশাও সে করছে না!
সুবৰ্ণর সঙ্গে কথা কইবার চেষ্টা করলো সে অনেকবার, বাবুর রোগের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেষ্টা করলো বারিকয়েক এবং শেষ অবধি বিরক্ত হয়ে বললো, আমি মা পথেই নেমে পড়বো। ছেলে।পুলে নিয়ে ঘর করি, মা ওলাবিবি বুঝবেন সেটা।
তথাপি সুবর্ণ নির্বাক নিস্তব্ধ।
স্তব্ধতা ভাঙলো বাড়ি এসে দোতলায় উঠে।
যেখানে বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছিল প্ৰবোধ, আর বকুল বাদে অন্য মেয়েছেলেরা দরজার বাইরে আশেপাশে ঘুরছিল।
ডাক্তারের নিষেধে ঘরে ঢোকে নি কেউ, অপেক্ষা করছিল। কখন সুবৰ্ণলতা এসে পড়ে, কলেরা রুগী বলে ভয় খেলে যার চলবে না, ভয় খাওয়াটা যার পক্ষে ঘোরতর নিন্দনীয়।
গাড়ি থেকে নামা দেখেই সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, কেউ কিছু বলল না। শুধু দেখল মা উঠে গেল নীরবে।
হ্যাঁ, একেবারে নীরবে।
ঘরে ঢুকে রোগীর মুখোমুখি দাঁড়ালো সুবর্ণ, নীরবতা ভাঙলো, স্থির গলায় প্রশ্ন করলো, ক আউন্স ক্যাস্টর অয়েল খেয়েছিলে?
হ্যাঁ, এই ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর কথাটা বলেছিল সুবৰ্ণ সেই মরণোনুখ লোকটার মুখের উপর। যার জন্যে তার নিজের পেটের মেয়ে চাপা বলেছিল, বুঝতে পারি না মাকে, মানুষ না ককাই! আমাদের ভাগ্যে বাবা এ যাত্রা বেঁচে উঠলেন। তাই, যদি সত্যিই একটা কিছু ঘটে যেত? ওই মুখ তুমি আবার লোকসমাজে দেখাতে কি করে?
তুমি দিয়ে বললেও আড়ালেই বলেছিল। অবশ্য, চন্নন ছিল শ্রোতা। চন্নন বেশি কথা বলে না, সে শুধু মুচকি হেসে বলেছিল, মার আবার মুখ দেখানোর ভয়!
বাপের অসুখ শুনে ছুটে এসেছিল তারা, আর অনেকদিন পরে আসা হয়েছে বলেই দু-চারদিন থেকে গিয়েছিল। থেকে গিয়েছিল অবিশ্যি ঠিক বাবার সেবার্থ নয়, দুই বোন এক হয়েছে বলেই। রাজায় রাজায় দেখা হয় তো বোনে বোনে দেখা হয় না। এই তো পারুলের সঙ্গে কি হলো দেখা? সে তো সেই কোন বিদেশে।
কিন্তু প্ৰবোধচন্দ্রের অসুখের কারণ সম্পর্কে এই নির্লজ্জ সন্দেহ কি একা সুবৰ্ণলতারই হয়েছিল? সুবৰ্ণলতার প্রখর-বুদ্ধি ছেলেদের হয় নি? হয়েছিল বৈকি, তাছাড়া প্ৰমাণপত্ৰই তো ছিল তাদের হাতে। কিন্তু তবু তারা এত নিষ্ঠুর হতে পারে নি, এত নির্লজ্জা! তাই তারা প্ৰবোধের যে যেখানে আছে তাদের তড়িঘড়ি খবর দিয়ে বসেছিল। অবিশ্যি সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছিলখবর দেওয়া উচিত তাই জানালাম, তবে রোগটা ছোঁয়াচে, সেই বুঝে—
তা সেই বুঝটা সুবোধ আর উমাশশী বাদে আর সকলেই বুঝেছিল, বুঝেছিল বিরাজের বাড়ির সবাই, বুঝেছিল প্ৰবোধের জামাইরা, তবে মেয়েরা বোঝে নি, আর বোঝে নি। জগু।
শ্যামাসুন্দরীও। অবশ্য একটু অবুঝ হচ্ছিলেন, জগু নিবৃত্ত করে এলেন মাকে, হাঁউমাউ করে কেঁদে বললেন, যা হবে তা তো বুঝতেই পারছি, শিবের অসাধ্য ব্যাধি, তুমি আশী বছরের বুড়ী সে দৃশ্য তে পারবে?
দেখতে পারবো – একথা আর কে বলতে পারে? অতএব জগু একই কাঁদতে কাঁদতে এসে হাজির হয়েছিলেন।
এসে দেখে বিচারসভা বসে গেছে।
রুগী আছে শুধু বকুলের হেফাজতে, সুবৰ্ণলতাকে ঘিরে বাকি সবাই।
না, কটু কথা বলছে না কেউ কিছু, শুধু এইটুকু বলছে, পারলে তুমি এ কথা বলতে? কি করে পারলে? হৃদয় বলে বস্তুটা কি সত্যিই নেই তোমার?
শ্ৰান্ত সুবৰ্ণলতা একবার শুধু বলেছে, তাই দেখছি, সত্যিই নেই। এত দিনে টের পেলাম সে কথা।
উমাশশী কাঠ হয়ে বসেছিল, সুবোধচন্দ্র বললেন, তুমি এখন যাবে, না থাকবে? আমার তো আবার-
অফিসের দেরির কথাটা আর মুখ ফুটে বলেন না। পেন্সন হয়ে যাবার পর ধরাধরি করে চাকরির মেয়াদ আরো দু বছর বাড়িয়ে নিয়েছেন, কিন্তু কোথাও যেন সূক্ষ্ম একটু লজ্জা আছে সেটার জন্য। তাই পারতপক্ষে অফিসের বেলা কথাটা উচ্চারণ করেন না। সুবোধচন্দ্র। যেন ওটা এলেবেলে, ওটা অন্যের কাছে অবজ্ঞার ব্যাপার।
