তা ছাড়া কেউ তো উদার নয় যে, একের অপরের কাছে ছোট হয়ে যাবার প্রশ্ন আছে। উমাশশীর পয়সা নেই, তাই সে পয়সা খরচে কৃপণ, কিন্তু হৃদয়ে কৃপণ নয়। উমাশশী। তাই উমাশশীকেই ওরা দেখতে পারে না।
তবু উমাশশীই যেচে যেচে আসে। বলে, কি রে সেজবৌ, আজ কি রাধলি?… ওমা, ছোটবৌ তো খাসা মৌরলা মাছ পেয়েছিস!
ওরা গ্রাহ্য করে উত্তর দিলে গল্পটা এগোয়, ওরা অগ্রাহ্য-ভাব দেখালে উমাশশী আস্তে সরে আসে। আজ ভাবছিল মেজবৌয়ের বাড়ির খবর নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ গল্প চালানো যাবে, কিন্তু হঠাৎ মুম্বুকুখন ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে। বারে বারে কানে বাজছে, শুধু এইটাই তোমার চোখে পড়লো বড়বৌ?—
বেশি কথা আর বলল না, রুগী সামলেছে, প্ৰাণের ভয় নেই, শুধু এইটুকুই জানিয়ে দিয়ে আস্তে চলে এল উমাশশী।
তবে আর সাত-সকালে গিলে মারি কেন মনে মনে এই কথাটুকু উচ্চারণ করে বাড়াভাতে একএকখানা গামলা চাপা দিয়ে, দুই জা দুজনের দিকে তাকিয়ে একটু তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বলে, ভাগ্যিটা দেখলে? এ বাবা স্রেফ, মেজদির ভাগ্যের জোরে–নইলে এ হলো শিবের অসাধ্যি ব্যামো!
তা জগুও সেই কথাই বলতে বলতে এসেছিলেন এবং রুগীর বিছানার ধারে বসে পড়ে কেন্দে বলে উঠেছিলেন, কি রে পেবো, মায়ের ছেলে মায়ের কাছে চললি?
প্ৰবোধ কষ্টে বলেছিল, যেতে আর পারলাম। কই? এ হতভাগ্যকে যমেও ছোয় না। তোমাদের ভাদ্রবৌ তো বলে গেল, রোগ না ছল!
গেঙিয়ে গেঙিয়ে বললেও বুঝতে পারা গেল এবং বলা বাহুল্য অবাকই হলেন জগু। মেজবৌমা কি তাহলে সত্যিই মাথা খারাপ রুগী? নচেৎ এই যমের দোরে পৌঁছনো মানুষটাকে এই কথা বলে?
অবিশ্যি মাথা খারাপ হলে কথা নেই, কিন্তু না হলে? নাঃ, মাথাটাই ঠিক নয়, দেখলাম তো—
কিন্তু খানিক পরে সহসা এই রুগীর বাড়িতেই সেই মানুষেরই হা-হা হাসির শব্দ ছাদে গিয়ে ধাক্কা খায়। অ্যা, তাই নাকি? মেজবৌমা বদরীনারায়ণ যাচ্ছিলেন, চলে আসতে হলো! ও, তাহলে আর দেখতে হবে না। কানু, এ স্রেফ আমার মগজওলা ভায়ার কারসাজি! নাঃ, বুদ্ধি একখানা বার করেছে বটে!… কিন্তু ভারি অন্যায়। যাচ্ছিলেন একটা মহাতীর্থে। তাছাড়া নিজেরও বয়েস হয়েছে, যদি হয়ে যেত একটা কিছু? তখন তুমি পরিবারের হিল্লী দিল্লী যাওয়া বন্ধ করতে আসতে? যাক গে, ছলই হোক আর সত্যই হোক, ভায়া পাটুকে গেছে খুব। এখন স্রেফ জলবার্লি! পুরো তিনটে দিন। স্রেফ জলবার্লি। বকুল রে, বাবা ভাত খেতে চাইলেও দিবি না।… যাই, সেই আশীর্বাছুরে বুড়ীটা মরছে। ধড়ফড়িয়ে বলি গে। তাকে।
একে একে সকলকেই ধড়ফড়ানো থেকে রক্ষা করা হলো। শুধু জয়াবতীর বাড়িতে খবর দেবার কিছু নেই। জয়াবতীরা রওনা হয়ে গেছে। হয়তো এখন তাদের বিশ্বাস আর ভক্তির গলা থেকে উচ্চারিত হচ্ছে, জয় বাবা বদরীনারায়ণ! জয় বাবা বন্দরীবিশাল কি জয়!। পাণ্ডাঠাকুরের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিশে হয়তো উদাত্ত হয়ে আকাশে উঠছে সেই স্বর।
কে জানে সুবৰ্ণলতার ওই ভক্তির ঘরটায় ফাঁকি ছিল কিনা। নইলে তার কণ্ঠস্বরাটুকু আকাশে ওঠবার সুযোগ পেল না কেন?
জয়াবতীর ননদ, অতএব সুবর্ণরও সম্পর্কিত ননদ সেই কথাই বলাবলি করে, কেবলই তো হিমালয় দেখবো, হিমালয় দেখবো চিন্তা দেখলাম, বাবার নাম তো একবারও শুনলাম না।… ঠাকুর অন্তৰ্যামী, দেখছেন সব।
আশ্চৰ্য, ওই কথাই বলে লোকে।
ভয়ঙ্কর এই ভুল কথাটা।
কোটি কল্পকাল ধরে বলে আসছে।
হয়তো বা আরো কোটি কল্পকাল ধরে বলবে। যারা উল্টো কথা বলতে চাইবে, তারা সমাজে পতিত হবে।
২.২৪ চিরদিনের উল্টো-পাল্টা সুবৰ্ণতা
কিন্তু চিরদিনের উল্টো-পাল্টা সুবৰ্ণতা কি সেদিন উল্টো কথা বলেছিল? না ওই কোটি কল্পকালের কথাটাই একবার উচ্চারণ করেছিল?
কে জানে!, তারপরও তো আবার দেখা যাচ্ছে সুবৰ্ণলতা দুঃসহ স্পর্ধায় তার ষোল বছরের আইবুড়ো মেয়েকে বলছে, সুনিমিলকে একবার ডেকে দে তো!
যে ছেলেটা নাকি বাইশ বছরের।…
প্রবোধের নিজের আর সাহস হয় নি, এবার ছেলেকে এসে ধরেছিল, কিন্তু ছেলে মুখের ভঙ্গীতে একটা তাচ্ছিল্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে মুখের ওপর জবাব দিল, আমার দ্বারা হবে-টবে না। আমার কী দরকার? যে যার নিজের ছাগল ল্যাজে কাটবে, আমি বাধা দেবার কে?
তা ও যদি পাগল হয়, সবাইকে তাই হতে হবে?
হবে। পাগলের কাজীর মধ্যে থাকতে হলেই হবে তাই!
ঠিক আছে আমি পরিমলবাবুকেই বলছি গিয়ে।
কী বলবেন?
আগে বলত না, ইদানীং ব্যাপকে আপনি বলছে ভানু।
বলব। আবার কি! প্ৰবোধ ক্রুদ্ধ। গলায় বলে, বলব, তোমার ওই জোয়ান ছেলের এসে এসে আর আমার ওই ধাড়ি ধিঙ্গী মেয়েকে পড়াতে হবে না।
পরিমলবাবু যদি বলেন, নিজের মেয়েকে না সামলে আমায় বলতে এসেছি কেন?
কথাটা প্ৰণিধানযোগ্য, তাই প্ৰবোধ গুম হয়ে যায়, তারপর আবার বলে ওঠে, ঠিক আছে, ওই ছেলেটাকেই শাসিয়ে দিচ্ছি।
ভানু যেন একটা মজা দেখছে এইভাবে বলে, দিতে পারেন। তবে সেখানেও অপমানিত হবার ভয় আছে! এযুগের ছেলে, ওদের গুরু-লঘু জ্ঞানটা ঠিক তো আপনাদের হিসেবমত নয়!
প্ৰবোধের একটা কথা মুখে এসেছিল, সামলে নিয়ে বলে, তবে ওই হারামজাদা মেয়েকেই শায়েস্তা করছি আমি, রোসো। সুনিৰ্মলদার কাছে পড়া করছেন! পড়ে আমার গুষ্টির মাথা উদ্ধার করবেন! কী করবো–শাখের করাতের নিচে পড়ে আছি আমি, নিজের সংসারে চোর, তা নইলে—
তা নইলে কি হতো তা আর বলে না, চলে যায়।
