মাথার যন্ত্রণা?
যে মানুষ ছুঁচ-সুতো নিয়ে সেলাই করছে, তার কিনা কথার শব্দে মাথার যন্ত্রণা?
ভানু বোধ করি এই অসহ্য অপমানে পাথর হয়ে গিয়েই কোনো উত্তর দিতে পারে না, শুধু ওঃ; বলে গাঁটগট করে উঠে চলে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে ভানুর বৌও।
শুধু বকুলই বসে থাকে ঘাড় হেঁট করে।
হয়তো অন্য কিছুই নয়, তাকে উপলক্ষ করে দাদার এই যে অপমানটা ঘটলো, তার প্রতিক্রিয়া কি হবে তাই ভাবতে থাকে দিশেহারা হয়ে।
সুবৰ্ণ হাতের কাজটা ঠেলে রেখে চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎ বলে ওঠে, সুনিৰ্মলকে একবার ডেকে দিতে পারবি?
সুনিৰ্মল!
তাকে ডেকে দেবার আদেশ বকুলকে?
এ আবার কোন রহস্য!
আর বর্তমান প্রসঙ্গে সঙ্গে সুনির্মলের সম্পর্ক কি? এ যে অবোধ্য!
শঙ্কিত দৃষ্টি মেলে মার দিকে তাকায় বকুল। সুবৰ্ণ সেইদিকে এক পলক তাকিয়ে বলে, একটা মাস্টারের জন্যে বলবো ওকে।
মাস্টার!
বকুলের জন্য মাস্টার!
ধারণী দ্বিধা হচ্ছে না কেন?
ছেলের সঙ্গে হার-জিতের খেলায় মা কি এবার বকুলকে হাতিয়ার করবেন? হে ঈশ্বর, দুৰ্মতি কেন হচ্ছে মার? অথচ দাদার থেকে মাও কিছু কম ভীতিকর নয়। তবু ভয় জয় করে বলে ফেলে বকুল, না না, ওসবে দরকার নেই মা-
দরকার আছে কি নেই সে কথা আমি বুঝবো। তুই ডেকে দিবি।
হাতের কাজটা আবার হাতে তুলে নেয়। সুবৰ্ণ।
২.২৩ সুবর্ণর সেই কেদারবন্দরী যাবার
কিন্তু সুবর্ণর সেই কেদারবন্দরী যাবার কি হলো? এটা কি তার ফিরে আসার পরের কাহিনী?
দূর, যাওয়াই হলো না তার ফিরে আসা!
সুবৰ্ণলতার ভাগ্যই যে বাদী, তা তার তীর্থ হবে কোথা থেকে?
বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল যাত্রা করে, দুঘণ্টা পরেই আবার ফিরে আসতে হলো সেই বাড়িতে।
কথা ছিল যারা যারা যাবে, জয়াবতীর বাপের বাড়িতে এসে একত্র হবে, সেখানে থেকেই রওনা। সুবৰ্ণও তাই গিয়েছিল। জয়াবতীর মার কাছে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। তীর্থযাত্রার প্রাক্কালে একবার খাওয়াবেন সবাইকে এই তাঁর বাসনা।
অনেক রাগের আর অনেক নিষেধের পাহাড় ঠেলে বেরিয়ে পড়েছিল সুবর্ণ, মনের মধ্যে অপরিসীম একটা ক্লান্তি ছাড়া আর যেন কিছুই ছিল না। তবু এদের বাড়িতে এসে পৌঁছে যেন বদলে গেল মন।
যাত্রাপথের সঙ্গীরা সবাই আগ্রহে আর উৎসাহে, আনন্দে আর ব্যাকুলতায় যেন জ্বলজ্বল করছে। তার ছোঁয়াচ লাগল সুবর্ণর মনে।
নিজেকে যেন দেখতে পেল অনন্ত আকাশের নিচে, বিরাট মহানের সামনে, অফুরন্ত প্রকৃতির কোলে।
কোলে।
চির-অজানা পৃথিবীর মুখোমুখি হবে সুবর্ণ, চিরকালের স্বপ্নকে প্রত্যক্ষে পাবে!
আনন্দে চোখে জল আসছিল সুবর্ণর।
তা চোখ মুছছিল সবাই।
আর ধরা পড়ার সঙ্গে বলছিল, বাবা বদরীবিশালের কী কৃপা! আমার মত এই অধমকেও করুণা করেছেন—
সুবৰ্ণ চোখ মুছছিল না, সুবৰ্ণর চোখের জল চোখের মধ্যেই টলমল করছিল। সুবর্ণ ওদের গোছগাছ দেখছিল।
যখন তাড়াহুড়ো করে খেতে বসতে যাচ্ছে-তখন—তখন এল সেই ভয়ঙ্কর খবর।
সমস্ত পরিবেশটিার ওপর যেন বজ্রাঘাত হলো। কপালে করাঘাত করলো সবাই!
সুবৰ্ণলতার স্বামীর কলেরা হয়েছে।
কলেরা!
দলের মধ্যে একজন মাত্র সধবা যাচ্ছিল, তারও এই! তা যাওয়া তো আর হতে পারে না তার এ যাত্ৰা!
কিন্তু রোগটা হলো কখন? এত বড় একটা মারাত্মক রোগ! এই ঘণ্টা তিনেক তো এসেছে সুবর্ণ বাড়ি থেকে!
তাতে কি, এ তো তড়িঘড়ি রোগ!
তা ছাড়া সূচনা তো দেখেই এসেছিল সুবর্ণ। যে খবর দিতে এসেছিল, সে বললো সেকথা।
দেখে এসেছিল!
সুচনাটা দেখেই এসেছিল?
সুবৰ্ণর দিকে ধিক্কারের দৃষ্টিতে তাকায় সবাই, দেখে এসেছে, তবু চলে এসেছে! তা ছাড়া বলেও নি। একবার কাউকে?
ধন্যি মেয়েমানুষের প্রাণ তো!
পাছে যাওয়া বন্ধ হয়, তাই স্বামীকে যমের মুখে ফেলে রেখে চলে এসে মুখে তালা-চাবি এঁটে বসে আছে!
বিস্ময়ের সাগরে কুল পায় না কেউ!
জয়ববতীর দাদা শুধু বিস্মিতই হন না, বিরক্তও হন! বলেন, রোগের সূচনা দেখেও তুমি কি করে চলে এলে সুবৰ্ণ?
সুবৰ্ণ মৃদু গলায় বলে, বুঝতে পারি নি, ভাবলাম বদহজম মত হয়েছে—
তথাপি জয়াবতীর দাদা অসন্তুষ্ট গলায় বলেন, সেই ভেবে নিশ্চিন্দি হয়ে চলে এলে তুমি? না না, এ ভারী লজ্জার কথা! এক্ষেত্রে তো তোমার আর তীর্থে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। এখন শীগগির চল, গাড়ি বার করছে।
তথাপি নির্লজ্জ আর হৃদয়হীন সুবর্ণ বলেছিল, ভগবানের নাম করে বেরিয়েছি, আমি আর ফিরবো না দাদা! ছেলেরা তো রয়েছে, বৌমারা রয়েছে—
এবার একযোগে সবাই ছি-ছিক্কার করে ওঠে, এ কী অনাসৃষ্টি কথা! ছেলে-বৌ রয়েছে বলে তুমি স্বামীর কলেরা শুনেও যাবে না? কলেরা রোগীর সেবাটিাই বা করবে কে?…
ভগবান?
আর স্বামীর আগে তোমার ভগবান?
জয়াবতীর মৃদুস্বরে বলেন, বুঝতে পারছি তোর ভাগ্যে নেই। যা এখন তাড়াতাড়ি, দাদা রাগ করছেন। চল যাই তোর সঙ্গে, দেখে আসি একবার— যাত্ৰা স্থগিতের কথা কেউ তোলে না।
অন্য সকলের পক্ষেই এই যাত্রাটা-অলক্ষ্য অপরিহার্য অমোঘ, শুধু সুবৰ্ণলতার যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না!
কই একথা তো কেউ বলল না, সুবৰ্ণ, তোকে ফেলে কি করে যাব, আজ নাই গেলাম, দেখি তোর ভাগ্যে কি লিখেছে। ভগবান!
না, তা কেউ বলল না।
বরং সুবৰ্ণ যে স্বামীর এই আসন্ন মৃত্যুর খবর শুনেও উদভ্ৰান্ত হয়ে ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। না, বরং কথা কাটলো, তীর্থের লোভটিকে আঁকড়ে রইলো, এতে ধিক্কারই দিল।
ছেলেরা আছে, ডাক্তার-কবরেজ দেখাবে, সেরে যাবে,– এ একটা কথা?
