তবে কি বলতে এসেছেন ও বই উনি ছাপতে পারবেন না?
পড়ে কি বিরক্ত হয়েছেন?
অবাক হয়েছেন সুবর্ণর নির্লজ্জতায়?
কিন্তু সেই নির্লজ্জতার বিস্ময়ে আমন গলা ছেড়ে বাদ-বিতণ্ডা করবেন?
কার সঙ্গে করছেন?
একটা হিন্দুস্থানীর গলা না?
গাড়োয়ান? পয়সা নিয়ে কচকচি করছেন?
আর বেশিক্ষণ ভাবতে হয় না।
ছাপাখানার মালিক জগন্নাথচন্দ্রের হেঁড়ে গলা আকাশে ওঠে, সুবল, কই রে সুবল! এই যে বৌমা, তুমিই এসে গেছ। তোমার বই এনে দিলাম। পাঁচশ কপি ছাপিয়েছি, বুঝেছ? প্রথম বই, বিয়ের পদ্যর মত বিলোবে তো চাট্টি! বেশি থাকাই ভাল। মুটে ব্যাটা কি কম শয়তান! ওই কখানা বই এপাড়া-ওপাড়া করতে কিনা ছ। পয়সা চায়। চার পয়সার বেশি হওয়া উচিত? বল তো বৌমা? রাগ করে দুআনিটাই ছুঁড়ে দিলাম। বলি, নে ব্যাটা, পান খেগে যা।
এই বাক্যস্রোতের মাঝখানে বকুল এসে নীরবে জ্যাঠাকে প্ৰণাম করে, তাদের জগু জ্যাঠামশাইয়ের এমন অসময়ে আবির্ভাবের কারণ ঠিক অনুধাবন করতে পারে না। সঙ্গে ওগুলোই বা কি?
তা জগু কাউকে বেশিক্ষণ অন্ধকারে ফেলে রাখেন না। সহৰ্ষে বলেন, এই যে তোমাদের মার বই হয়ে গেছে। নাও এখন বন্ধুবান্ধবকে বিলোও। সার্থক মা তোমাদের, লোকের কাছে বলতে কইতে মুখ উজ্জ্বল। ছাপাখানার লোকেরা তো শুনে তাজ্জব।
বলা বাহুল্য, বকুল এর বিন্দু-বিসর্গও বুঝতে পারে না।
মার বই! সেটা আবার কি জিনিস!
তাই অবাক হয়ে মার মুখের দিকে তাকায়।
বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে সুবৰ্ণও।
বই ছাপা হয়ে গেছে!
ছাপা এত শীগগির হয়!
নতুন পরিচ্ছেদটা আর দেয়া গেল না তাহলে? না যাক। কিন্তু কোথায় বই? ওই ঝুড়িটায়? যে বুড়িটা সিঁড়ির তলায় বসানো রয়েছে?
পুরনো খবরের কাগজে মোড়া দড়িবাঁধা স্তুপীকৃত কতকগুলো প্যাকেটিভর্তি মস্ত ঝুড়িটা জগন্নাথচন্দ্ৰ এবার টেনে সামনে নিয়ে আসেন।
একটা অপ্ৰত্যাশিত স্তব্ধতায় আবহাওয়াটা যেন নিথর হয়ে গেছে।
মোটা বুদ্ধি জগন্নাথও যেন টের পান, কোথায় একটা সুর কেটে গেছে। ভাদ্রবৌ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে পুলক প্রকাশ করবে না। সত্যি, তবু ভাবে-ভঙ্গীতে তো বোঝা যাবে!
যেদিন সুবর্ণ খাতাখানা নিয়ে ছাপার কথা বলতে গিয়েছিল, সেদিনও কিছু আর ভদ্রবৌয়ের রীতি পুরোপুরি রক্ষিত হয় নি। আহ্লাদের একটি প্রতিমূর্তি দেখিয়েছিল মানুষটাকে।
আর এখন?
যেন হঠাৎ সাপে কেটেছে।
ঘোমটা তো দীর্ঘ নয় ও-বাড়ির বৌদের মত, মুখ দেখতেই পাওয়া যায়।
অপ্ৰতিভের মত এদিক-ওদিক তাকান জগন্নাথ, তারপর শুকনো-শুকনো গলায় বলেন, বাবা বাড়ি নেই?
বকুল আস্তে বলে, না, পাশের বাড়ি দাবা খেলতে গেছেন।
অন্যদিন হলে নিৰ্ঘাত জগন্নাথ সঙ্গে সঙ্গে হেঁকে বলে উঠতেন, গেছে তো জানি। চিরকেলে নেশা। কথায় আছে, তাস দাবা পাশা, তিন সর্বনাশা। আর ভায়া আমার ওই তিনটিতেই ড়ুবে আছেন।
কিন্তু আজ আর জগন্নাথের বাকস্মৃতি হয় না, আচ্ছা আমি এখন যাচ্ছি, আমি এখন যাচ্ছি। চটিটা পায়ে গলান।
আর এতক্ষণে সুবৰ্ণ মাথায় ঘোমটা টানে। আঁচলটা গলায় দিয়ে আস্তে পায়ের কাছে একটি প্ৰণাম করে।
থাক থাক, হয়েছে হয়েছে—, বলে চলে যান জগু।
আর পথে বেরিয়ে ভাবতে ভাবতে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছান-আর কিছু নয়, অতি আহ্লাদ। কথাতেই আছে, অল্প সুখে হাস্যমুখে নানা কথা কয়, বেশি সুখে চোখে জল—চুপ করে রায়।
আর বকুলটা?
ও বেচারা হকচকিয়ে গেছে আর কি!
বোঝাই যাচ্ছে বাড়িতে কিছু জানান নি বৌমা।
আহ্লাদে নিশ্চিন্ততায় এবার জোরে জোরে পা ফেলেন জগু, ওঃ, প্ৰবোধচন্দ্র এসে চোখ কপালে তুলবেন! সাতপুরুষে কেউ কখনো বই লেখে নি, লিখল। কিনা ঘরের বৌ!
মাকে গিয়ে বলতে হবে, বুঝলে মা, আহ্লাদে তোমার মেজবৌমার আর মুখ দিয়ে কথা সরে না!
তা প্ৰবোধচন্দ্রের প্রথমটা চোখ কপালে উঠেছিল বৈকি।
তারপরই বাড়িতে উঠলো হাসির হুল্লোড়।
ছেলেরা বোধ করি এমন হৈ-চৈ করে হাসাহাসি করে নি। বহুকাল। বাবা বলে ডেকে কথাই বা কয় কবে?
বাবা, মার বই! জগু জ্যাঠামশাইয়ের ছাপাখানার মাল! দেখো দেখো! উঃ!
প্ৰবোধ আকাশ থেকে পড়ে, মার বই! তার মানে?
তার মানে? হচ্ছে, আমরা তো কেউ কখনো মার কিছু করলাম না, তাই মা নিজেই হাল ধরেছিলেন, চুপি চুপি জগু জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি গিয়ে ছাপতে দিয়ে এসেছিলেন। সেই বই ছেপে এসেছে।
প্ৰবোধ মেয়েদের মত গালে হাত দিয়ে বলে ওঠে, বলিস কি রে ভানু, এ যে সত্যি সেই কলাপাতে না এগোতে গ্ৰন্থ লেখা সাধ! তোদের গর্ভধারিণীর একেবারে গ্রন্থকার হবার বাসনা!
হুঁ। ভানু হেসে ফর ফর করে বইয়ের পাতাগুলো উড়িয়ে দিয়ে বলে, আহা, গ্ৰন্থই বটে। গ্রন্থের নমুনাটি লোককে দেখাবার মত!
তা হাস্যটা নেহাৎ অপরাধ নয়। ভানুর, সুবৰ্ণলতার স্মৃতিকথার নমুনা দেখলে কে-ই বা না হেসে থাকতে পারতো!
মোটা বুদ্ধি জগন্নাথচন্দ্ৰ পয়সায় দুখানা বর্ণপরিচয়ের কাগজে বই ছেপে দিয়েছেন সুবৰ্ণলতার, ভাঙা টাইপ আর পুরু কালি দিয়ে। অবশ্য সেটা ঠিক জগুরা দোষ নয়, জগুর ছাপাখানার দোষ। অথবা সুবৰ্ণলতার ভাগ্যেরই দোষ।
বই দেখে পর্যন্ত বুঝি সুবৰ্ণ তার ভাগ্যের স্বরূপটা স্পষ্ট করে দেখতে পেয়েছে। নাঃ, আর কোনো সংশয় নেই, আর কারো দোষ নেই, সবটাই সুবৰ্ণলতার ভাগ্যের দোষ!
শুধুই কাগজ? শুধুই মুদ্রাযন্ত্রের প্রমাদ?
মুদ্রাকরের প্রমাদ নেই?
যা নাকি ছুরির মত বুকে এসে বিধছে!
রসিয়ে রসিয়ে আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আগেই পড়া হয়ে গিয়েছিল, আর একবার পড়া হতে থাকে বাপের সামনে, শুনুন বাবা, শুনে যান। এই অপূর্ব প্রেস, আর এই অপূর্ব প্রুফরীডার নিয়ে ব্যবসা চালান জগু জ্যাঠামশাই। নাম-ধাম কিছু নেই বইয়ের, বই ছাপা হয়েছে নাম হয়নি। প্রথমেই শুরু শুনুন, ভূমিকা— আমি একটি নিরুপায় রঙ্গনাড়ি, আমার একমাত্র পরিচয় আমি একটি অন্ধপুরির মেজবৌ! আমার-
