প্ৰবোধ হঠাৎ প্ৰায় ধমকে ওঠে, ও আবার কি রকম পড়া হচ্ছে? কী ভাষা ওসব?
বাংলা ভাষাই। যা লেখা আছে তাই পড়ছি। আরো নমুনা আছে দেখুন না। কৌতুকের হাসিতে চঞ্চল দ্রুতকণ্ঠে পড়তে থাকে ভানু, আমার মন আচে বুদ্দি আচে, মস্তিষ্ক আচে, আত্মা আচে, কিন্তু কেহ আমার সত্মাকে শীকার করে না। আমি যে—
খুক খুক করে একটা হাসির শব্দ শোনা যায়। বৌয়েরা হাসছে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে। ভানুর ভঙ্গীতেও যে হাসির খোরাক!
কিন্তু হঠাৎ একটা বিপর্যয় ঘটে যায়।
একটা অপ্ৰত্যাশিত ঘটনা ঘটে।
কোথায় ছিল সুবৰ্ণলতা, অকস্মাৎ ক্রুদ্ধ ব্যাখীর মত এসে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বিয়ে-হয়ে-যাওয়া মস্ত বড় ছেলের ওপর।
ব্যাঘ্রীর মতই একটা গো গো শব্দ শোনা যায় সুবৰ্ণলতার গলা থেকে! বইখানা কেড়ে নিয়ে কুচিকুচি করছে।
বহুকাল আগের মত আবার একদিন ছাদে আগুন জুললো। সুবৰ্ণলতার গোলাপী রঙের বাড়ির ছাদে।… না, যত উদভ্ৰান্তই হোক সে, তদণ্ডেই বাড়ির যেখানে-সেখানে আগুন জেলে একটা অগ্নিকাণ্ড করে বসে নি।
ধীরে-সুস্থে সময় নিয়ে জ্বলিয়েছে আগুন, অনেক সময় নিয়ে।
পয়সায় দুখানা বর্ণপরিচয় এর কাগজে ছাপা, তেমনি মলাটেই বাধাই, পাঁচশোখানা বই পুড়ে ছাই হতে এতক্ষণ লাগলো? না, সেগুলো বেশী সময় নেয় নি। সময় নিয়ে আর চোখ-জ্বালানো ধোঁয়া উদগিরণ করে যেগুলো পুড়লো, সেগুলো হচ্ছে অনেক কালের হলদে হয়ে যাওয়া পাতা, আর বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কালিতে লেখা অনেকগুলো খাতা! সদ্য কেনা নতুন চকচকে মলাটের খাতা! খাতার রাশি!
ধ্বংস হয়ে গেল। আজীবনের সঞ্চয়, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল চিরকালের গোপন ভালবাসার ধনগুলি। সুবৰ্ণলতার আর কোনো খাতা রইল না।
যে খাতাগুলি দীর্ঘকালের সঙ্গী ছিল, তিলে তিলে ভরে উঠেছিল বহু সুখ-দুঃখের অনুভূতির সম্বলে! লোকচক্ষুর অন্তরালে কত সাবধানেই লেখা আর তাদের রাখা! এক-একখানি খাতা সংগ্রহের পিছনেই ছিল কত আগ্রহ, কত ব্যাকুলতা, কত চেষ্টা, আর কত রোমাঞ্চময় গোপনতার ইতিহাস!
হাতে পয়সার অভাব তার কখনই ছিল না একথা সত্যি, উমাশশীর মত বিন্দুর মত দুঃখময় শূন্যহাতের অভিজ্ঞতা কদাচ না, প্ৰবোধের ভালবাসার প্রকাশই ছিল খরচ কোরো বলে কিছু টাকা পয়সা হাতে গুঁজে দেওয়া। কিন্তু দেওয়াটা লোকের চোখের আড়ালে হলেও, সেই খরচটা তো আড়াল দিয়ে হওয়া সম্ভব ছিল না? সুবর্ণ তো আর নিজে দোকানে যাবে না?
কাউকে দিয়ে আনানো?
তা সদর রাস্তার পথ ধরে যে বেরোবে আর ঢুকবে সে মশা-মাছি হয়ে করবে না। সেই কাজটা? প্রথমবার যখন সুবৰ্ণ অবোধ ছিল, অতএব অসতর্কও ছিল, দুলোকে আনতে দিয়েছিল মলাট-বাধানো খাতা একখানা। সহস্ৰ কথার জনক হলো সেই খাতা!
কেন, কি দরকার, এমন দামী আর শৌখিন খাতা কোন কাজে লাগবে, পয়সা থাকলে ধোপাগয়লার হিসেবও তাহলে চোর আনা ছ। আনার খাতায় ওঠে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেই থেকে সাবধান হয়ে গিয়েছিল সুবৰ্ণ।
গোপনতা সে ভালবাসে না। কিন্তু এমন উদঘাটিত হতেও ভাল লাগে না। তাই ঘরের জানলা থেকে পাশের বাড়ির একটা ছোট ছেলের হাতে সুকৌশলে খাতার পয়সা এবং তার ঘুড়ি-লান্টুর পয়সা চালান করে করে মাঝে মাঝে খাতা আনাতো। বাধানো রুলটানা খাতা।
লোকচক্ষুর অগোচরে আনিয়েছে তাদের মালিক, লোকচক্ষুর অন্তরালেই রেখে দিয়েছে। লালন করেছে হৃদয়ারস দিয়ে, পুষ্ট করেছে জীবন-বেদনার আবেগ দিয়ে।
কতদিন কত নিভৃত ক্ষণে ভালবাসার হাতে হাত বুলিয়েছে তাদের গায়ে, ভালবাসার চোখে তাকিয়েছে। যেন তারা শুধু প্ৰাণতুল্য কোনো বস্তুই নয়, প্ৰাণাধিক কোনো জীবন্ত প্ৰিয়জন।
সেই তাদের অহঙ্কার হলো, আলোর মুখ দেখতে চাইল তারা।
অন্ধকারের জীব তোরা, কিনা আলোর মুখ দেখবার বাসনা? অতএব পেতে হলো সেই দুঃসহ স্পর্ধার শান্তি!
সেই ভালবাসার হাতই তাদের গায়ে আগুন লাগালো, সেই ভালবাসার চোেখই নিষ্পলক বসে বসে দেখল তাদের ভস্ম হয়ে যাওয়া!
ছাতের সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল সুবর্ণ, ভেবেছিল এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী না থাকে।
কিন্তু সিঁড়ির দরজাটায় ছিটিকিনি আলগা ছিল, দরজাটা ধরে টানতেই খুলে গিয়েছিল। তাই রয়ে গেল একজন সাক্ষী।
হঠাৎ স্তব্ধ দুপুরে কাগজ-পোড়া-গন্ধে আশঙ্কিত হয়ে এঘর-ওঘর দেখে ছুটে ছাতে উঠে এসেছিল। সে।
দরজাটা টেনে খুলেছিল, আর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ওখানটায় চিলেকোঠার দেওয়ালের ছায়া পড়েছিল, তাই এই প্ৰচণ্ড রোদের মাঝখানেও সুবর্ণর মুখে আগুনের আভার ঝলক দেখা যাচ্ছিল। সেই আভায় চিরপরিচিত মুখটা যেন অদ্ভুত একটা অপরিচয়ের প্রাচীর নিয়ে স্থির হয়ে ছিল।
কিন্তু ওই অপরিচিত মুখটার প্রত্যেকটি রেখায় রেখায় ও কিসের ইতিহাস আঁকা?
জীবনব্যাপী দুঃসহ সংগ্রামের?
না পরাজিত সৈনিকের হতাশার, ব্যর্থতার, আত্মধিক্কারের?
কে জানে কি!
যে দেখেছিল, তার কি ওই রেখার ভাষা পড়বার ক্ষমতা ছিল?
হয় তো ছিল না। তাই মুহূর্তকাল বিহ্বল বিচলিত দৃষ্টি মেলে দেখেই ভয় পাওয়ার মত ছুটে পালিয়ে এসেছিল সিঁড়ি বেয়ে।
তারপর?
তারপর সেই হত্যাকাণ্ডের দর্শক এক নতুন চেতনার অথৈ সমুদ্রে হাতড়ে বেড়িয়েছে সেই রেখার ভাষার পাঠোদ্ধারের আশায়।
অজ্ঞাতে কখন তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে, মনে মনে উচ্চারণ করেছে সে, চিরদিন তোমাকে ভুল বুঝে এসেছি আমরা, তাই অবিচার করেছি।
তারপর? তারপর এল এক নতুন ঢেউ।
২.২১ ঢেউটা আনলেন জয়াবতী
ঢেউটা আনলেন জয়াবতী।
