কানুর বিয়ে লাগলো। ওই চরকার ঢেউটা একটু কমলে। অনেকের বাড়িতেই তখন আধভাঙা চরকাটা ছাতের সিঁড়িতে কি চিলেকোঠায় আশ্রয় পেয়েছে। শুধু কারুর দেওয়ালে চরকা-কাটা-রত গৃহিণীর বা বধূর ফটোটি ঝুলছে উজ্জ্বল মহিমায়।
তা সে যাই হোক-পারুল-বকুলের কথা তুলেও মাকে নোয়াতে পারে নি। কানু। সুবৰ্ণ বলেছিল, সে ওদের নিজের থেকে ইচ্ছে হয়, প্রেরণা আসে করবে ওরা। আমি হুকুম দিতে যাব কেন? বিশেষ করে আমার যাতে বিশ্বাস আসছে না।
তা হলেই বল উল্টোপাল্টা কিনা?
দু-পাঁচটা ছেলে ঘরে বসে দুটো হাতবোমা বানিয়ে আর পুলিস মেরে দুর্ধর্ষ বৃটিশের গোলাবারুদের শক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলবে এ বিশ্বাস তোমার ছিল, আর এতে তোমর বিশ্বাস নেই?
তা কানুর রাগের মানে অবশ্যই আছে।
সুবৰ্ণর ভুল।
কোনোটাই নিরর্থক নয়। কোনো প্ৰাপ্তিই হঠাৎ আসে না। কাজ চলে নানা চিন্তায় নানা হাতে। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই তো পরামকে পাওয়া যায়।
কিন্তু একবগ্গা সুবৰ্ণ বলে, পরমকে পেতে হলে চরম মূল্য দিতে হয়।
অথচ ওই চরমটা যে কি সেকথা বলে না। হয়তো সে ধারণাও ওর নেই। শুধু একটি বড় কথা বলনেওয়ালা ভাবের ফানুস বৈ তো নয়।
তবে মোটের মাথায় দেখা গিয়েছে সুবর্ণ এতখানি সুবৰ্ণ-সুযোগেও রাজপথে নামে নি। রাজপথের কলকোলাহলের দিকে দর্শকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেছে শুধু।
তবে বিদেশী জিনিস বর্জন!
সে তো বহুকাল আগে থেকেই হয়ে আসছে। ইচ্ছেয়-অনিচ্ছেয় মেনেই নিয়েছে। সবাই সুক্কুর এই জবরদস্তি। হয়তো বা বাগারগি কেলেঙ্কারির ভয়েই। ঘরে পরে কাউকেই তো বেয়াং করে না সুবর্ণ!
এ পাড়ায় বাড়ি করবার সময় থেকেই পাশের বাড়ির পরিমলবাবুদের সঙ্গে ভাব। পরিমলবাবুর স্ত্রী সর্বদা আগবাড়িয়ে এসে নতুন-আসা পড়াশীদের সুবিধে-অসুবিধে দেখেছেন। বলতে গেলে আত্মীয়ের মতন হয়ে গেছেন। তবু একদিন পরিমলবাবুর স্ত্রী যখন বেড়াতে এসে বলেছিলেন, দেশী দেশলাই দেখেছি বকুলের মা? দেখে আর বাঁচি না। জ্বলবোর আগেই নিভছে। একটা উনুন জ্বালাতে একটা দেশলাই লাগবে। বিলিতির সঙ্গে আর পাল্লা দিতে হয় না বাবা কিছুর।
তখন সুবৰ্ণ ফস করে বিলিতি দেশলাই কাঠির মত জ্বলে উঠে বলেছিল এসব গল্প আমার কাছে করবেন না দিদি, আমার শুনতে খারাপ লাগে।
পরিমলবাবুর স্ত্রী মানুষ ভাল, তবে মাটির মানুষ তো নয়! অতএব হয়ে গিয়েছিল বিচ্ছেদ।
অনেকদিন লেগেছিল মনের সেই মালিন্য ঘুচিতে। বোধ করি ছেলেমেয়েদের কারো বিয়ে উপলক্ষেই আবার আসা-যাওয়ার পথে পুনর্মিল। তাছাড়া পরিমলবাবুর ছেলে সুনির্মল তো কোনোদিনই ওসব মনোমালিন্যের ধার ধারে নি। ঘরের ছেলের মত এসেছে, বসেছে, খেয়েছে।
সেই আসা-যাওয়ার অন্তরালে—
কিন্তু সেকথা থাক।
২.২০ সুবৰ্ণর অগাধ সমুদ্রের এক অঞ্জলি জল
সুবৰ্ণর অগাধ সমুদ্রের এক অঞ্জলি জল, অগাধ স্মৃতিকথার একমুঠো কথা এবার আলোর মুখ দেখবে। তাই সুবৰ্ণলতা মর্মরিত হচ্ছে। তাই সুবর্ণ তাকিয়ে দেখছে না তার অন্তঃপুরে লোকাঁচারিবিধির সমস্ত অনুশাসনগুলি নির্ভুল পালিত হচ্ছে কিনা।
এখন সুবর্ণ অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে কাটিয়ে তার সেই প্রথম কবিতার দিনটির কাহিনীখানি অক্ষরের বন্ধনে বন্দী করে নিয়ে একবার মামীশাশুড়ীর বাড়ি যাবার জন্যে স্পন্দিত হচ্ছিল।…
তাই ছেলেকে ডেকে বলছিল, সুবল, একখানা গাড়ি ডেকে এনে দিতে পারবে?
তা এই রকমই কথা সুবর্ণর।
সুবল, একটা গাড়ি ডেকে এনে দে না বলে এনে দিতে পারবে?
মা-ছেলের সহজ সম্বন্ধের ধারার মধ্যে যেন দূরত্বের পাথর পড়ে আছে চাই চাই, তাই জলটা বয়ে যায় ঘোরাপথে।
কে জানে এই পাথরটা কার রাখা?
মায়ের না ছেলের?
সুবলিও তো বলল না, কী আশ্চৰ্য, পারব না কেন? যাবে কোথায়? চল পৌঁছে দিচ্ছি গিয়ে।
সুবল শুধু যান্ত্রিক গলায় উচ্চারণ করলো, কখন দরকার?
সুবৰ্ণলতা আহত দৃষ্টিতে তাকায়।
সুবৰ্ণলতা যেন বড় অপমান বোধ করে।
সুবৰ্ণলতা তো জানে, ওর এই ছোট ছেলেটার ভিতরে হৃদয় আছে। তবে সুবৰ্ণলতার বেলায় কেন সে হৃদয়ের এতটা কার্পণ্য? যেন চেষ্টা করে হৃদয়টাকে শক্ত মুঠোয় আটকে রাখে সুবৰ্ণলতার ছোট ছেলে। কিছুতেই যাতে না অসতর্কে একটু স্থলিত হয়ে পড়ে।
আশ্চর্য!
মা বলে কতদিন ডাকে নি সুবল?
ইচ্ছে করে না। এই কাঠিন্যের সামনে এসে কোনো আবেদন করতে। তবু একআধ-সময় উপায়ও তো থাকে না। একা একটা ভাড়াটে গাড়ি করে এবাড়ি-ওবাড়ি করার সাহসটাই তো অসমসাহসিকতা। তবু সে সাহস দেখায় সুবর্ণ, দুটো শ্বশুরবাড়ি একাই যাওয়া-আসা করে। তাই বলে পথে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ি ধরে নিয়ে যাওয়া তো চলে না? সেটা যেন সাহস নয়, অসভ্যতা। অন্তত সুবর্ণর মাপকাঠিতে।
সুবল না হোক, অন্য ছেলেরা এই নিয়ে শোনাতে ছাড়ে না। বলে, আর গাড়ি ডেকে দেওয়ার ফার্স কেন বাবা? বেশ তো স্বাধীন হয়েছ, যাও না, বেরিয়ে পড়ে ডেকে নাও গে না একখানা।
বলে আরো বৌদের কাছে তীক্ষ্ণ হুল খেয়ে।
বৌদের একা এক পা বেরোবার হুকুম নেই; অথচ শাশুড়ী দিব্বি—
তা সুবল কিছু শোনাল না। শুধু বললো, কখন দরকার?
সুবৰ্ণও অতএব সেই যান্ত্রিক গলাতেই উত্তর দেয়, এখনই দরকার। তা নইলে বলতে আসবো কেন? বি আসে নি এখনো—
কথা শেষ হয় না, হঠাৎ বুকটা ধড়াস করে ওঠে সুবর্ণর।
নিচে ও কার গলা?
জগু বাঁটুঠাকুরের না?
কেন?
এমন অসময়ে কেন উনি?
