পদ্মা গেল পটল গেল। গুগলি হল আঁখি,
আর শালিক গেল ফিঙে গেল আরশোলা হল পাখী!
হেম বাঁড়ুয্যে, ঈশ্বর গুপ্ত তো ছার-তোমার মতে বোধ হয় তোমার ওই রবি ঠাকুর মাইকেলের চেয়েও বড় কবি!
সুবৰ্ণ মাথা তুলে ওই বিদ্রুপমাখা মুখের দিকে তাকায়, আর তারপর হিন্দুনারীর ঐতিহ্য সম্পূর্ণ ধুলিসাৎ করে মুখ ফিরিয়ে বলে, তোমাদের মত মুখ্যুদের কাছে আমি কিছুই বলতে চাই না।
কিন্তু এসব কবেকার কথা?
খাঁচার পাখীর এই ডানা ঝটপটানির কাহিনী!
এসব তো সুবৰ্ণলতার বহু পুরনো কথা।
যেসব কথা খাতায় লিখে গেলে মূল্যহীন, বিবৰ্ণ, একঘেয়ে। তাই খাতায় তোলা হয় না, শুধু স্মৃতি ঘরের চাবিটা খুললেই একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে আসতে চায় অনেকে হুড়মুড়িয়ে একাকার হয়ে।
কিন্তু খাঁচার পাখীর ডানা ঝটপটানোর বাইরের বৃহৎ পৃথিবী তো স্থির হয়ে থাকে না।
খাঁচার পাখী আকাশের দিকে চোখ মেলে আর্তনাদ করে, পাখীর মালিক খাঁচার শিক শক্তি করতে চেষ্টা করে, বৃহৎ পৃথিবী তাকে উপহাস করে এগিয়ে যায়, আকাশকে হাতের মুঠোয় ভরে ফেলবার দুঃসাহসে হাত বাড়ায়.কবিরা শিল্পীরা নিঃশব্দে আপন মনে অচলায়তন ভাঙার কাজ করে চলে, বিচারকের মন সশব্দে প্রতিবাদ তোলে, শিকলদেবীর পূজার বেদীতে শাবল-গাইতির ঘা পড়ে, তার মধ্যে দিয়ে সমাজ মন-অবিরাম ভাঙা-গড়ার পথে দ্রুত ধাবিত হতে থাকে।
তাই সহসা একদিন সচকিত হয়ে দেখা যায় কখন কোন ফাঁকে অবরোধের বীজমুষ্টি যেন শিথিল হয়ে এসেছে, অবগুণ্ঠন হ্রস্ব হয়ে গেছে, রাজরাস্তাটা যে একা পুরুষের কেনা জায়গা নয়, সেটা ওই স্বল্পাবগুষ্ঠিতারা যে বুঝে ফেলেছে, ওদের চোখে-মুখে আচারে-আচরণে তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আর কতকগুলো দুঃসাহসী মেয়ে ইতিমধ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই রাস্তায়। তারা পিকেটিং করছে, মার খাচ্ছে, জেলে যাচ্ছে। আসমুদ্রহিমাচল একটি নামে স্পন্দিত হচ্ছে, একটি কণ্ঠের ডাকে ছুটে আসছে।
সে নাম গান্ধীজী।
সে ডাক একলা চলা রে।
কবির ভাষা প্রেমিকের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে।
দেশপ্রেমিক, মানবপ্ৰেমিক!
দর্জিপাড়ার গলিও বুঝি আর চোখে ঠুলি এঁটে থাকছে না। সেখানেও নাকি ছেলেরা বলছে বিলিতি সাবান মাখা হবে না। আর এবং বিন্দু আর গিরিবালা নাকি বিলিতি নুন আর চিনি বাতিল করে কৰ্কাচ আর দোলো খাচ্ছে, এবং বাজার থেকে বিলিতি কুমড়ো বিলিতি আমড়া আর বিলিতি বেগুন আনা নিষেধ করে দিয়েছে।
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, ইতর-ভদ্র, শিক্ষিত নিরক্ষর সবাই এক কথা কইছে, কেউ আর এখন বলছে না। রাজত্বটা বৃটিশের। সবাই বুঝে ফেলেছে। ওরা অন্যায় করে দখল করে আছে, অতএব ন্যায়ের দখল নিতে হবে। সবাই জেনে গেছে মহাত্মা গান্ধী স্বরাজ এনে দেবেন।
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল। যারা জীবনের জয়গান—এ হয়তো তাদেরই রক্তে ভেজা মাটির ফসর। তারা বীজ পুঁতে রেখে গেছে। এখন এসেছে আর এক মালী তাতে জল দিতে।
ফল?
খাবে দেশের লোক। খেলো বলে।
সদ্য ফল যে হাতে হাতেই মিলবে। যারা পুলিসের গুতো খাচ্ছে, বুটের ঠোক্কর খাচ্ছে, জেলের ভাত খাচ্ছে, তারা কষ্টের শেষের পুরষ্কার খাবে সেই ফল।
কিন্তু সুবৰ্ণলতার মনের মধ্যে কেন তেমন সাড়া নেই? যে সুবৰ্ণলতা স্বদেশীর নামে টগবগিয়ে ফুটতো, সে কেন স্বরাজের ব্যাপারে এমন মিইয়ে আছে?
দেশে যখন নিত্য-নতুন ঢেউ আসছে, যখন কুলভাঙা প্লাবন আসছে, প্ৰবোধের তো তখন সর্বদা সশঙ্কিত অবস্থা। আর বুঝি রাখা যাবে না। ওকে গৃহ-কোটরে। হঠাৎ কোনদিন শুনবে, মেয়ে দুটোকে নিয়ে পিকেটিং করতে বেরিয়ে গেছে সুবৰ্ণলতা লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিয়ে।
কিন্তু কই? তেমন উন্মাদনা কই?
কানু যেদিন একটা চরকা কিনে বললো, মা, বাজে গাল-গল্পে দিন না কাটিয়ে এবার প্রতিটি মিনিট সুতো কাটতে হবে, এই চরকা-কাটা সূতোয় কাপড় বুনিয়ে পরতে হবে সবাইকে, সেদিন তো কই সুবর্ণ ওই নতুন জিনিসটার ওপর ঝাঁপিয়ে এসে পড়ল না? বলল না, তোকে দু হাত তুলে আশীৰ্বাদ করি। কানু, আমার মনের মত কাজ করলি তুই!
না, সে কথা বলল না। সুবর্ণ, শুধু একটু হেসে বললো, গাল-গল্প আবার কে করছে রে এত?
আহা গাল-গল্প না হোক, নাটক-নভেল পাঠা! একই কথা! মোট কথা সময়ের অপচয়। আর অপচয় করা চলবে না।
চলবে না বুঝি? আরও একটু হেসেছিল সুবৰ্ণ, তবে চরকাঁটাই চালা। তোদেরই এখন সামনে সময়। আমার তো এখন সময়ের সম্বল সব পেছনে ফেলে চলে আসা জীবন।
চমৎকার! কত কত আশী-নব্ববুই বছরের বুড়ো-বুড়ী চরকা কাটছে তা জানো? রাস্তায়-চলমানুষ পর্যন্ত তাকলি কাটতে কাটতে চলেছে!
তা চলতেই পারে। যখন যা ফ্যাশান ওঠে!
ফ্যাশান! একে ফ্যাশন বলছে তুমি?
কানু স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।
এমন কি কানুর বাবাও।
সুবৰ্ণর মুখে এ কথা অভাবনীয় বৈকি।
সাধে কি প্ৰবোধ এই অদ্ভুত উল্টো-পাল্টা-কে নিয়ে গোলকধাঁধায় ঘুরে মরলো চিরদিন?
কানু মাকে অনেক ধিক্কার দিয়েছিল।
বলেছিল, স্বরাজ অমনি আসবে না। তার জন্য ক্লেশ চাই, দুঃখ চাই।
মুক্তকেশীর নাতি, প্ৰবোধের বংশধর বলেছিল। এ কথা উত্তেজিত গলায়।
অতএব বলতেই হবে দেশের মজা নদীতে বান ডেকেছিল। তথাপি সুবর্ণ উত্তেজিত হয় নি। সুবৰ্ণ আবার হেসে উঠে বলেছিল, তা তোর এই সুতো কাটার মধ্যে ক্লেশই বা কই? দুঃখই বা কই? আর গোরস্তঘরের মেয়েমানুষের অবসরই বা কই?
কানু আরও জ্বলেছিল।
আর একবার নাটক-নভেলের খোঁটা দিয়েছিল, সুবৰ্ণলতার দু-দুটো বড় হয়ে ওঠা মেয়ে কি রাজকাৰ্য করে তার হিসেব চেয়েছিল। হ্যাঁ, দুটো মেয়ের কথাই তুলেছিল কানু—তখনো পারুর ঘরবসত হয় নি, আর কানুর বিয়ে হয় নি।
